যাকাত ইসলামের তৃতীয় ও অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় বিধানই নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, বালেগ ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমানের ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ। সাধারণত সঞ্চিত ও বর্ধনশীল সম্পদের ২.৫% হারে যাকাত আদায় করে নির্দিষ্ট আটটি খাতে বিতরণের বিধান রয়েছে। যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে, ঈমানকে পরিপূর্ণ করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে আল্লাহর রহমত অর্জনের পথ প্রশস্ত করে।
১. প্রচলিত যাকাত ব্যবস্থা: একটি বাস্তবতা ও সংকট : আমাদের দেশে বছরের যেকোনো সময় যাকাত দেওয়া গেলেও পবিত্র রমজান মাসে এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি। তবে দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের যে বৈপ্লবিক ভূমিকা থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন কম দেখা যায়। এর প্রধান কারণ যাকাতের সঠিক ও পরিকল্পিত ব্যবহারের অভাব।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাকাতকে কেবল সওয়াব হাসিলের একটি ‘দান’ হিসেবে দেখা হয়। লোক দেখানো নামমাত্র অর্থ (৫০০, ১০০০ বা ২০০০ টাকা), সামান্য ইফতার সামগ্রী, নিম্নমানের শাড়ি বা লুঙ্গি বিতরণ করা হয়। এই সাময়িক সহযোগিতা দরিদ্র মানুষকে একবেলার আহার দিলেও তাকে স্থায়ীভাবে অভাবমুক্ত করতে পারে না। ফলে তারা প্রতিবছর একইভাবে অন্যের সাহায্যের অপেক্ষায় দ্বারে দ্বারে ঘুরতে বাধ্য হয়।
২. করুণা নয়, এটি দরিদ্রের প্রাপ্য অধিকার : যাকাত কোনো দয়া বা দান নয়, বরং এটি ধনীর সম্পদে দরিদ্রের প্রাপ্য আইনি ও ধর্মীয় অধিকার। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তাদের (ধনীদের) ধন–সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের হক রয়েছে।” (সূরা আয–যারিয়াত: ১৯)।
যাকাত প্রদানের সময় আমাদের মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। যখন আমরা কাউকে যাকাত দিই, তখন আমরা তাকে কোনো করুণা করছি না, বরং তার পাওনা তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি। এই বোধ জাগ্রত হলে যাকাত বিতরণে যে প্রদর্শনপ্রিয়তা বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, তা দূর হবে এবং যাকাতগ্রহীতার আত্মসম্মান অক্ষুণ্ন থাকবে। উল্লেখ্য যে, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে যাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে, যা ইসলামের সুমহান চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
৩. টেকসই দারিদ্র্য বিমোচনে ‘প্রোডাক্টিভ যাকাত’ : যাকাতকে যদি একটি সামাজিক উন্নয়ন তহবিল হিসেবে দেখা হয়, তবে দারিদ্র্য বিমোচন অনেক সহজ হবে। যাকাতের অর্থ এমনভাবে প্রদান করা উচিত যাতে একজন দরিদ্র মানুষ দ্বিতীয়বার কারো কাছে হাত পাততে বাধ্য না হয়। একে আমরা ‘প্রোডাক্টিভ যাকাত’ বা ‘উৎপাদনমুখী যাকাত’ বলতে পারি। এর কয়েকটি কার্যকর উপায় হলো: কর্মসংস্থান সৃষ্টি: একজন ভূমিহীন কৃষককে গরু বা পাওয়ার টিলার কিনে দেওয়া। কারিগরি দক্ষতা ও সরঞ্জাম: একজন বেকার যুবককে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা বা একজন নারীকে সেলাই মেশিন ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনে দিয়ে আয়ের পথ তৈরি করা।
ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি: অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে দোকানের মালামাল বা মূলধন জোগান দেওয়া।
শিক্ষা ও চিকিৎসা: মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা, যাতে সে ভবিষ্যতে পরিবারের অভাব দূর করতে পারে।
৪. সম্মিলিত যাকাত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব : ব্যক্তিগতভাবে যাকাত দেওয়ার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বা সম্মিলিতভাবে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণ অনেক বেশি কার্যকর। সামাজিকভাবে বা নির্ভরযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ করে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া সম্ভব। এর মাধ্যমে যেমন বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়, তেমনি অর্থের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। ইসলামের ইতিহাসে খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনামলে এই সম্মিলিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিদায় নিয়েছিল। যাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য হলো মানবকল্যাণ, ন্যায়বিচার ও সামাজিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। আসুন, আমরা প্রচারমুখী ও গতানুগতিক যাকাত সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিষ্ঠামুখী যাকাত ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাই। আমাদের যাকাত হোক একজনের বেঁচে থাকার স্থায়ী অবলম্বন, কেবল একবেলার আহার নয়। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে যাকাত আদায় ও বিতরণ করি, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
লেখক: শিশুসাহিত্যিক।












