‘সুন্দরীরা মাধবীরা যাই যাই, হলুদ বসন্ত হিন্দোল বাতাসে, বেড়ায় ভেসে /জগৎ মাতাল করা হাসি ওদের, কিয়দংশ ছিটিয়ে ঝলকে ঝলকে আমার মুখে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করে,/বড়োবেশি সুন্দর কাতর এ’ মানুষটিরে’। সুন্দরকে খুব ভালোবাসি। প্রত্যেকে এরা একেকটা হীরের টুকরো। একেক রং ঢং। হাসি–কাশি, হাঁটা–বসা, কথা–বার্তা সবকিছুতে। সৌন্দর্যের দানা। সুন্দরের কৌটো। রূপের বাতাসা। তবে রক্তের শর্করা বাড়ায় না।
মনব্রতে সবখানে খুঁটিয়ে দেখা আমার চির–অভ্যেস। মাটিতে ছুটতে থাকা ক্ষুদ্র–প্রাণ পিপীলিকা, ভ–ূত্বক আবৃত করা সবুজ দুর্বাঘাস, বাতাসের স্পর্শ, আলোর সপ্রাণ নাচ সকল–ই। কিন্তু বেশি জীবন্ত–আনন্দ মেয়েদের উপস্থিতি। কেননা রূপজ মেয়েরা কেউ টুইংকেল টুইংকেল তারা, কেউ–বা আকাশের চাঁদ, কেউ কাছে দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখি, কেউ–বা করতলে ফোটা ফুল।
পৃথিবীগ্রহে প্রাণীকূলের মধ্যে একমাত্র মানবজাতিই নাকি হাসতে পারে। প্রকৃতপক্ষে হাসে কেবল মেয়েরা। সে হাসির রশ্মিবৃত্ত ঠোঁটের অরোরা পর্যন্ত ঝলকায়। মেয়েরা হাসির সৃষ্টি, ছেলেরা মেলে দৃষ্টি। এই ‘হাসির ফুলের হার’ পুরুষ পেতে চায়। তা হা করে দেখে। এমনভাবে দেখে–কখন কোথায় যে পড়ে যাবে, তাও দেখে না বোঝে না। রূপের পাগল রূপের কাঙাল –তা আমিও। তবে মেয়েরা কিছু হাসে হাসিতে। বাকী হাসি–অকারণ চঞ্চল অভিলাষে, ‘খুব সুন্দর লাগছে’ প্রিয় পুরুষকার থেকে সফল উত্তর আদায়ে।
পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে এসব দেখি, আবিষ্কার করি, মজে থাকি বুঁদ। একটুকু ছোঁয়া লেগে–হেরি বিষ্ময়ে কুসুম–কোমল। তাতে তাৎক্ষণিক সৃষ্ট কবিতার ক’টি লাইন– সোনার কন্যা সাজতে চায় নাচতে চায়, ফেসবুক স্টোরি সেলফিতে লাভ কমেন্ট গুনে পড়ে গভীর গোপন গান গায়, চায় ভালোবাসা বাসতে, চায় ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি-’ প্রশংসা–পাপড়িতে ভিজতে।
এরপরও কারা যেন ভুল বকেন– রমণীর বাসনাবীজে চিররূপতৃষ্ণা, ক্ষমতার মসনদ পিপাসা। তাহলে কান্ডারি হুঁশিয়ার নজরুলের ‘নুরজাহান নুরজাহান’ আর্তগীতি কি স্রেফ কবিকুলের অস্থিরতা রোগ। কাজল টানে কি মেহেদি অঙ্কনলিপিতে নিমেষে এরা অপ্সরি। ‘মায়াবনবিহারিণী হরিণী’। সেই কটাক্ষে পুরুষ হৃৎপিন্ড বাজে। আহারে বিহারে শয়নে স্বপনে, বিপুল বেদনার অনন্ত শূন্যতায়। রাবীন্দ্রিক বচনে যেমনটা-‘যতই দেখি তারে ততই দহি, আপন মনোজ্বালা নীরবে সহি’। তখন মনে হতে পারে–এরকম দহন শিকার পুরুষ জগতে এক অযথা সৃষ্টি।
এই যে সাজবিশ্ব – তার পুরোটা রমণীয় কল্যাণে, নারীর দখলে। নূপুর কিঙ্কিনি, বেণী দোদুল দুলুনি, শাড়ির গহন সৌন্দর্য, চুড়িগয়নার রিনিরিনি আছে বলে বিপনিবিতানের ভিটেতে আলোর রোশনা বাতি জ্বলে। না হয় চড়তো ঘুঘু। শালীনতা সৌন্দর্য শক্তি, অজানা কারণবারি সমুদ্রে সর্বংসহা সংসারজগতের ধারক মাতৃশক্তিকে বড়ো ভালোবাসি। কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র ললিত কণ্ঠমাধুর্য গলায় ঢেলে গাই-‘ প্রভাতে উঠিয়ে ও–মুখ দেখিনু, দিন যাবে আজ ভালো’।
কিন্তু ‘অশ্রুর রসে ভরা দুখের ফলের ভার’ হাতে সহসা কাঁদে যদি কোনো মৃন্ময়ী–চিন্ময়ী, দৃশ্যমানতায় পুুরুষ সিংহহৃদয় ফেটে হয় চৌচির। দেখে অনিমেষ–জীবন রত্নমাল্যে নানাবেশে থাকা তিনি হয়তো মা, বোন, কন্যা, প্রেয়সী, কিংবা ঘরণী রুপে সম্মুখে দণ্ডায়মান।
লেখক: প্রফেসর ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।












