মৌরীর ঈদ আনন্দ

ইসমাইল জসীম | বুধবার , ১ এপ্রিল, ২০২৬ at ৬:৩৩ পূর্বাহ্ণ

গ্রামের সরু কাঁচা পথটি বিকেলের ম্লান আলোয় ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। দূরে বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো নেমে পড়ে মাঠের ঘাসে। সেই পথের ধারে দাঁড়িয়ে মৌরী মাঝে মাঝে তার শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে করে। অভাব ছিল তখন তাদের সংসারের নিত্যসঙ্গী। টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট্ট ঘর, দেয়ালের ফাঁক দিয়ে কখনো বাতাস ঢুকত, কখনো বর্ষার পানি। মৌরীর বাবা ছিলেন দিনমজুর মানুষ। কখনো কাজ আছে, কখনো নেই। তবু সেই ঘরেই ছিল মায়া, ভালোবাসা আর স্বপ্ন।

মৌরী ছোট হলেও অনেক কিছু বুঝত। স্কুলে পড়াশোনা চালানোও সহজ ছিল না। কখনো স্কুলের স্যার তাকে বই কিনে দিয়েছেন, কখনো পাশের বাড়ির খালা পুরোনো খাতা দিয়েছেন। কিম্ব কারো জাকাতের টাকায় তার স্কুলের ফি দেয়া হতো।

কিন্তু ঈদ এলেই তার মনটা একটু ভারী হয়ে উঠত। ঈদের সকাল মানেই গ্রামের সব ছেলেমেয়ের উচ্ছ্বাস। কেউ নতুন পাঞ্জাবি পরে, কেউ রঙিন ফ্রক পরে মসজিদের দিকে ছুটে যায়। নতুন জুতার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পথঘাট।

আর মৌরী? সে পরত আগের বছরের পুরোনো জামা, কখনো আবার কারো দেওয়া ব্যবহৃত কাপড়। তবু সে হাসিমুখেই থাকত।

একবার ঈদের সকালে মা তার মাথায় তেল দিয়ে চুল বেঁধে দিতে দিতে বলেছিলেন,

মন খারাপ করিস না মা। আল্লাহ মানুষকে সবসময় একই অবস্থায় রাখেন না।’

মায়ের কথাটা তখন মৌরীর মনে গেঁথে গিয়েছিল। মৌরীর বাবাও এ আর্থিক অনটনের সংসারে নিজেকে অযোগ্য বাবা মনে করতো। সন্তানের মুখে হাসি ফুটাতে না পেলে নিজেকে অপরাধী ভাবতো। চোখের পানি ফেলতো গোপনে। অনেক চেষ্টা আর ধারদেনা করে মৌরীর বাবা বিদেশে কাজের সুযোগ করে নিলো। বিদায়ের দিন গ্রামের মানুষ তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। কেউ দোয়া করছিল, কেউ সাহস দিচ্ছিল।

বিদেশের জীবন ছিল কঠিন, কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগল। নিয়মিত টাকা পাঠাতে শুরু করলেন তিনি। দুই বছর পর যখন বাবা ছুটিতে দেশে ফিরলেন, তখন যেন তাদের ঘরে নতুন আলো জ্বলে উঠল। টিনের ঘরের জায়গায় ছোট্ট একটি পাকা ঘর হলো। ঘরের সামনে ছোট্ট ফুলের বাগানও করা হলো।

কিন্তু সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটল মৌরীর মনে।

সে কখনো ভুলতে পারেনি তার সেই অভাবের দিনগুলো ঈদের সকালে অন্যদের নতুন জামা দেখে বুকের ভেতর যে নিঃশব্দ কষ্ট জেগে উঠত।

রমজান মাসের শেষদিকে এক সন্ধ্যায় ইফতারের পর মৌরী বাবার পাশে এসে বসল।

বাইরে তখন মাগরিবের আজান ভেসে আসছে, বাতাসে হালকা শীতলতা।

মৌরী ধীরে বলল,

বাবা, একটা কথা বলব?’

বাবা স্নেহভরা চোখে তাকালেন,

বল মা।’

মৌরী একটু থেমে বলল,

ছোটবেলায় ঈদে আমি তো নতুন জামা খুব কমই পেয়েছি। তখন খুব কষ্ট লাগত। এখন আল্লাহ আমাদের ভালো রেখেছেন। আমি ভাবছি এবার ঈদে আমার বন্ধুদের নতুন জামা দেব।’

কথাটা শুনে বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর মৃদু হাসলেন।

মৌরী, মানুষের বড় হওয়া শুধু বয়সে হয় না মনে হয়। আজ তুই সত্যিই বড় হয়ে গেছিস।’

পরদিন সকালেই বাবা আর মৌরী বাজারে গেল।

ঈদের বাজার তখন উৎসবের রঙে ভরা। দোকানের সামনে ঝুলছে নানা রঙের পাঞ্জাবি, ফ্রক, শার্ট আর ছোট ছোট জুতা। চারদিকে মানুষের ভিড়, হাসি আর কোলাহল।

মৌরী খুব মন দিয়ে বেছে বেছে জামা কিনতে লাগল।

কখনো একটি নীল ফ্রক হাতে নিয়ে বলছে,

বাবা, এটা ওই ছোট মেয়েটার জন্য সুন্দর হবে না?’

কখনো ছোট্ট একটি পাঞ্জাবি দেখে বলছে,

এইটা ওই ছেলেটার জন্য ভালো হবে।’

এভাবে তারা অনেকগুলো জামা, পাঞ্জাবি আর টুপি কিনল।

ঈদের আগের দিন বিকেলে তাদের বাড়ির উঠোনে গ্রামের অনেক সুবিধাবঞ্চিত শিশুকিশোর জড়ো হলো। কেউ লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ আবার কৌতূহলী চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে।

মৌরী তাদের সামনে দাঁড়িয়ে কোমল কণ্ঠে বলল,

তোমরা সবাই আজ নতুন জামা পাবে। ঈদের দিন সবাই খুশি থাকবে এইটাই আমার ইচ্ছা।’

একটি ছোট্ট ছেলে অবাক হয়ে বলল,

আমাদেরও নতুন জামা?’

মৌরী হেসে মাথা নাড়ল।

তারপর একে একে সবাইকে নতুন জামা দিতে লাগল সে। উঠোন ভরে উঠল হাসি আর আনন্দে।

একটি ছোট মেয়ে গোলাপি ফ্রকটি হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,

আপু, আমি জীবনে প্রথম এত সুন্দর জামা পেলাম!’

কথাটা শুনে মৌরীর বুকটা হঠাৎ ভরে উঠল। মনে পড়ে গেল তার নিজের ছোটবেলার ঈদের সকালগুলো।

সন্ধ্যার আকাশে তখন ঈদের চাঁদ উঠেছে। নরম আলোয় চারদিক যেন শান্ত হয়ে এসেছে।

বাবা ধীরে মৌরীর কাঁধে হাত রেখে বললেন,

আজ তুই আমাকে সবচেয়ে বড় ঈদের আনন্দ দিলি।’

পূর্ববর্তী নিবন্ধগর্ব -অহংকার
পরবর্তী নিবন্ধহাটহাজারীতে ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা