মৌনতার সূতোয় বোনা একটি রঙিন চাদর

শৈবাল চৌধূরী | সোমবার , ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

কৈশোর বয়স থেকে স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখার অভ্যাস ছিল। এজন্যে মার খেতাম দু’বার। বাড়িতে ও স্কুলে। তবে আজ ভাবি, লাভ হয়েছে অনেক। দেশি বিদেশি প্রচুর ছবি দেখার সুযোগ পেয়েছি, যার মধ্যে অনেক ছবির প্রিন্ট এখন আর নেই। ১৯৭৬ সালের শুরুতে দেখলাম সূর্যকন্যা নামের ছবিটি। ছবির পরিচালক, বিদেশি দুই অভিনেত্রী ও গায়ক গায়িকার বিষয়ে সে সময়কার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পত্রিকা চিত্রালীতে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম এর আগে। বাসায় লুকিয়ে পত্রিকাটি পড়তাম এক আত্মীয়ের কাছ থেকে এনে এবং সে জন্যেও অনেক গালমন্দ শুনতে হতো। যা হোক ছবিটি দেখে সে বয়সেই (দশম শ্রেণিতে পড়ছি তখন) এক ভিন্ন রকমের অভিজ্ঞতার স্বাদ পেলাম। কলকাতার দুই অভিনেত্রী জয়শ্রী রায় এবং রাজশ্রী বসুর ভিন্ন আঙ্গিকের অভিনয়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামল মিত্রের কন্ঠের ফজল শাহাবুদ্দিনের লেখা এবং সত্য সাহার সুরে অসাধারণ দুটি গান এবং সর্বোপরি সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের একটি কাহিনীর নতুন ধরনের চিত্রায়ন দেখে কিশোর বয়সেই একটি ঘোর লেগে গিয়েছিল। বাড়িতে বড়রাও ছবিটি দেখে যথেষ্ট আপ্লুত, সেটা সকলের কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, যদিও তাদের সঙ্গে কিছু শেয়ার করা সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু ছোট বড় সবার কাছেই একটা বিস্ময় ছিল কমন। সে বিস্ময় ছিল এ ছবির অন্যতম নায়িকা জয়শ্রী। বাংলাদেশের সেসময়ের নায়িকা বা অভিনেত্রীদের তুলনা এই অভিনেত্রীর সৌন্দর্য, অভিনয়, উচ্চারণ, সংলাপ বলার ধরণ, পোশাক, সাজসজ্জা সবকিছু রীতিমত পরিশীলিত আধুনিক এক কথায় অভিনব।

ঘোর কাটতে না কাটতে ১৯৭৭ সালে মুক্তি পেল আলমগীর কবির পরিচালিত ‘সীমানা পেরিয়ে’। ছবির প্রেক্ষাপট ১৯৭০এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। দক্ষিণ বাংলাদেশের দশ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এ মহাবিপর্যয়ে। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের জনগণের মনে তার দগদগে স্মৃতি। ছবিটি দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। কিন্তু এই বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে একটি সিনেমা হতে পারে এ অভিজ্ঞতা এদেশের দর্শকের কাছে রীতিমত অবাক করার বিষয়। আরও অবাক করার ব্যাপার ছিল জয়শ্রী কবিরের অসাধারণ অভিনয় ও তাঁর অপার সৌন্দর্য। জয়শ্রী অভিনীত টিনা চরিত্রের বেশ কয়েকটি শেড ছিল। হাই সোসাইটির বিদেশে পড়াশোনা করা মেয়ে, নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত, নাটক নিয়ে উচ্চতর পড়া শোনার জন্য বিদেশে যাবেন, গ্রামে বেড়াতে গিয়ে ঘূূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে নির্জন দ্বীপে আটকে পড়ার পর মাটি ও সাধারণ মানুষ থেকে যোজন দূরে থাকা মেয়েটির মাটি ও জেলে যুবার সংস্পর্শে এসে ক্রমাগত বিবর্তিত হওয়া, সব মিলে বহুমাত্রিক একটি চরিত্র। এছাড়া জয়শ্রী একজন রাখাইন কন্যার চরিত্রেও অভিনয় করেন। এ চরিত্রে তাঁর একটি রাখাইন নৃত্যের দৃশ্যও ছিল। ছিল টিনা চরিত্রে অসামান্য একটি গান ও রবীন্দ্র সংগীত ও রবীন্দ্র নৃত্যের দৃশ্য। পশ্চিমা নৃত্যের একটি দৃশ্যও ছিল টিনা চরিত্রে। রবীন্দ্র সংগীতটি জয়শ্রী কবির স্বকন্ঠে গেয়েছিলেন। ছবিটি ছিল রঙিন। অনবদ্য চিত্রগ্রহণ করেছিলেন এম. . মোবিন। জয়শ্রীর অসামান্য রূপচ্ছটা তুলে ধরেছিলেন এম এ সোবিন তাঁর ক্যামেরায় ছবিটি দেখে এসে আমার বাবা একটা কথা বলেছিলেন, ‘জয়শ্রী হলেন প্যারাগন অব বিউটি।’ কথাটির মর্মার্থ পরে বোধগম্য হয়েছে। বহুমাত্রিক টিনা চরিত্র ও রাখাইন চরিত্রে স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় উপহার দিয়েছিলেন জয়শ্রী। সূর্যকন্যা ও সীমানা পেরিয়ে ছবির চরিত্রে যে সাহসিকতা, অভিব্যক্তি ও প্রকাশ ভঙ্গিমার প্রয়োজন, তা সে সময়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীদের মধ্যে বিরল ছিল। বিশেষ করে সূর্যকন্যা ছবির ক্রিশ্চান তরুণী মনিকার চরিত্রে। এ চরিত্রে তাঁর কস্টিউম ও শয্যাদৃশ্যে অংশগ্রহণ এবং তৎপরবর্তী প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ কেবল সে সময় নয় আজকের বাংলাদেশেও রীতিমতো দুঃসাহসিক। ছবিটি ছিল হান্ড্রেড পারসেন্ট আরবানাইজড। এরকম আরবানাইজড আরেকটি ছবি হয় ১৯৮০ সালে। ‘ঘুড্ডি’ সালাউদ্দিন জাকীর পরিচালনায় ভিন্ন কলাকুশলী নিয়ে।

জয়শ্রী ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের আবিষ্কার। ১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির মধ্য দিয়ে জয়শ্রীর চলচ্চিত্রাগমন। এরপর কলকাতার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবিতে তাঁর সাবলীল অভিনয় তাঁকে দর্শকদের কাছে সমাদৃত করে তুলেছিল। প্রথম ছবিতেই তিনি ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়ের মতো শক্তিমান অভিনেতার বিপরীতে অভিনয় করেন মহীরুহ সত্যাজিৎ রায়ের পরিচালনায়। ফলে তাঁর সূচনাটাই ছিল বেশ পাকাপোক্ত। কলকাতায় জয়শ্রী অভিনীত অন্যান্য ছবির মধ্যে পিকনিক (১৯৭২), অচেনা অতিথি (১৯৭৩), একদিন সূর্য (১৯৭৪), রোদন ভরা বসন্ত (১৯৭৪), সব্যসাচী (১৯৭৭), অসাধারণ (১৯৭৭) উল্লেখযোগ্য। শেষোক্ত তিনটি ছবিতে তিনি উত্তমকুমারের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন।

তবে একটা কথা বললে বোধয় অত্যুক্তি হবে না, জয়শ্রীর অভিনয়ের প্রকৃত স্ফূরণ ঘটেছিল বাংলাদেশে আলমগীর কবিরের হাতে। আলমগীর কবিরের সূর্যকন্যা (১৯৭৬, সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭), রূপালি সৈকতে (১৯৭৯) এবং মোহনা (১৯৭৯) এই চারটি ছবিতে জয়শ্রীর অভিনয়ের বৈচিত্র্য তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শৈল্পিক একজন অভিনেত্রীতে পরিণত করেছিল। তবে এ মানের ছবি বাংলাদেশে তেমন নির্মিত না হওয়ার কারণে তিনি তাঁর অভিনয় ক্ষমতার প্রকাশ বেশি ঘটাতে সমর্থ হননি। মূলধারার কয়েকটি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন। যেমন ‘শহর থেকে দূরে’ পুরস্কার এবং ‘দেনা পাওনা’। তবে এ তিনটি ছবিতে জয়শ্রী অভিনীত চরিত্রগুলি ছিল ভিন্ন ধরনের। বিশেষ করে নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত দেনা পাওনা ছবিতে তিনি ভাগ্য বিড়ম্বিতা এক অন্ধ নারীর চরিত্রে মর্মস্পর্শী অভিনয় করেছিলেন। তেমনি পুরস্কার ছবির চরিত্রটি ছিল একজন শিক্ষিকার। এ চরিত্রেও তাঁর অভিনয় ছিল বেশ বুদ্ধিদীপ্ত। অভিনেতা বুলবুল আহমেদের সঙ্গেই জয়শ্রীর রসায়ন ছিল যথাযথ ও স্বচ্ছন্দ।

জয়শ্রীর অভিনয় আঙ্গিক ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক। সৌন্দর্য, আভিজাত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিকতার মিশ্রণে তিনি ব্যতিক্রমধর্মী এক অভিনয় রীতি গড়ে তুলেছিলেন যা তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু পরিপূর্ণ ভাবে বিকশিত হওয়ার সময়েই তাঁকে থেমে যেতে হয় ব্যক্তিগত কারণে।

সূর্যকন্যা ছবিতে অভিনয়ের সময়ই জয়শ্রী ও আলমগীর কবির পরস্পরের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন, যা পরিণয়ে পরিণতি পায় ১৯৭৫ সালে। দুজনেই ছিলেন বিবাহিত। তাই পরিবার থেকেই ছিল প্রবল আপত্তি। জয়শ্রী ছিলেন অভিনেতা পরিচালকপ্রযোজক প্রবীর রায়ের স্ত্রী ও এক কন্যার জননী।

অন্যদিকে আলমগীর কবির দুই কন্যা অজন্তা ও ইলোরার জনক। তাঁর স্ত্রী মঞ্জুরা কবির ছিলেন সাহিত্যিক অধ্যাপক ড. নিলীমা ইব্রাহিমের কন্যা। জয়শ্রী রায় হয়ে যান জয়শ্রী কবির। মঞ্জুরা দুই কন্যাকে নিয়ে লন্ডনে চলে যান। জয়শ্রী কবির এবার এক পুত্র সন্তানের জননী হন। সেপুত্র লেনি কবির সৌরভ বর্তমানে সিঙ্গাপুরে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বিয়ের কয়েক বছর পর আলমগীর কবির ও জয়শ্রী কবিরের সম্পর্কে চরম অবনতি দেখা দেয় যা বিবাহ বিচ্ছেদে রূপ নেয়। আলমগীর কবির তার পুত্রকে নিয়ে আলাদা হয়ে যান। এর ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন জয়শ্রী। তাঁর ক্যারিয়ারও থেমে যায়। ক্রমশ তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন এবং মানবেতর জীবন যাপন করতে বাধ্য হন। তাঁর এই দুরাবস্থার কথা সেসময় পত্রপত্রিকায় এবং টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার পর কয়েকজন শুভানুধ্যায়ীর উদ্যোগে তাঁর মাদকাসক্তি নিরাময়ের চিকিৎসা শুরু হয় এবং তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে তাঁর মাদকাসক্তির আরো একটি নেপথ্যের কারণ ছিল দাম্পত্য সংঘাত। চিকিৎসার পরে তিনি সুুস্থ হয়ে ওঠেন। পাবনার নগরবাড়ি ঘাটে এক মর্মান্তিক ফেরি দুর্ঘটনায় ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি আলমগীর কবির নিহত হন। লেনিন ফিরে আসেন মায়ের কাছে। এ ঘটনার পর জয়শ্রীর ভাই ঢাকায় এসে জয়শ্রী ও লেনিনকে কলকাতায় নিয়ে যান। এরপর তাঁরা স্থিত হন লন্ডনে। জয়শ্রী ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। কলকাতায় সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন। লন্ডনে দীর্ঘদিন একটি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। বিবিসি বাংলা বিভাগেও যুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে মাদক নিবারণ ও নিরাময় এবং সুস্থ জীবন যাপন বিষয়ক সুন্দর একটি অনুষ্ঠান করতেন সাপ্তাহিক ভিত্তিতে, যার নাম ছিল ‘বাতায়ন’। যে মাদকের কারণে তিনি শেষ হয়ে যেতে পারতেন, তার কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করতেন। একজন মানুষের অদম্য মনোবল, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক সচেতনতার কারণেই এভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়, যা পেরেছিলেন জয়শ্রী।

১৯৫২ সালের ২২ জুন কলকাতায় জয়শ্রী দাশগুপ্তের জন্ম। বাবা অমলেন্দু দাশগুপ্ত ছিলেন শিক্ষা ও সংস্কৃতি অনুরাগী। তাঁদের আদি নিবাস চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়ায়। শৈশব থকে অপার সৌন্দর্যের অধিকারী জয়শ্রী ১৯৬৮ সালে ১৬ বছর বয়সে মিস ক্যালাকাটা নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরেই তাঁর চলচ্চিত্রে পদার্পন সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ১৯৬৯ সালে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবির মধ্যে দিয়ে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭০ সালে। দুই বাংলায় মোট ৪০টির মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন।

কিছুদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। স্ট্রোক হয় দু’বার। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১২ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের সময় রাত ১০ টার দিকে ঘুমের মধ্যে জয়শ্রী প্রয়াত হন। ১৭ জানুয়ারি সকালে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনে। উপস্থিত ছিলেন পুত্র ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন। সকাল ৮.১৫ মিনিটে তাঁর স্মরণে একটি প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সবার উপস্থিতিতে লন্ডনের একটি শশ্মানে তাঁকে সকাল ১০ টায় দাহ করা হয়। তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর দেহভস্ম ভারতে তাঁর আত্মীয়দের মাধ্যমে গঙ্গায় বিসর্জন দেয়া হবে। আলমগীর কবিরের সঙ্গে বিয়ের সময় জয়শ্রী ধর্মান্তরিত হননি। এভাবেই পরিসমাপ্তি ঘটলো ৭৪ বছরের এক বর্ণময়, কর্মময়, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আর আত্মবিশ্বাসী এক জীবনের ক্ষণিক উপস্থিতির আলোকছটায় তাঁকে নিয়ে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় লেখা থাকবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএসো মিলি শেকড়ের টানে, প্রিয় ক্যাম্পাসে
পরবর্তী নিবন্ধবিআইটিআইডিতে ‘প্রাণির কামড় ও জলাতঙ্ক ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক কর্মশালা