এগার বছরের শিশুকন্যা মোহনাকে নির্যাতনের ভয়ঙ্কর দৃশ্য ও ঘটনা সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে সারা বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের সংবাদ প্রচারের ফলেই একজন অসহায় শিশুর জীবন নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এমনিতেই এই দেশটাতে এখন আর জীবনের কোনো মূল্য নেই, নেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। সেখানে হতদরিদ্র সামান্য দোকান শ্রমিকের মাতৃহারা অনাথ কন্যা শিশুকে মানসিক অত্যাচার করে মেরে ফেললে কিইবা এমন আসে যায়? তাও সেই অত্যাচার যদি দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পরিবারে সংঘটিত হয়। যাদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলার সাহস পাবে না। এমনটাই হয়তো সেই পরিবারটি ভেবেছিল। কিন্তু এই প্রথম দেশের সরকারি বিমান সংস্থার সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গৃহীত হলো শিশু গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের অভিযোগে। এত অনিয়ম অনাচারের মধ্যেও এই প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক। আশা করবো, শিশু মোহনাকে এই পাশবিক অত্যাচারের উপযুক্ত বিচার যেন হয়। যদিও এদেশে ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ বলে একটি প্রবাদ বহুল প্রচলিত।
এত গৌরচন্দ্রিকার নেপথ্যের কারণ শিশু মোহনাকে নির্যাতন যা ইতোমধ্যে আমরা সবাই অবগত হয়েছি। ভেবে দেখুন একজন পিতা কতটা অপরাগ হলে তার বুকের ধনকে পরের বাড়িতে কাজ করতে পাঠান। আরও সে মেয়েটি তিন বছর বয়সে মাতৃহারা। একটু সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে সে আশায় এ ধরনের শিশুদের অসহায় অভিভাবকেরা বাচ্চাদেরকে কাজে দেন। যদিও এটা নিঃসন্দেহে অমানবিক। শিশুশ্রম সারাবিশ্বে অনেক আগে থেকেই নিষিদ্ধ। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে, যেখানে মানবতা প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত, শিশুশ্রম অবারিতভাবে প্রচলিত। যেহেতু অতি অল্প মজুরি বা বিনা মজুরিতে শিশুদেরকে ইচ্ছেমতো খাটিয়ে নেয়া যায় এবং তাদের ভরণপোষণেও ব্যয় কম, তাই গৃহপরিচর্যাসহ বিভিন্ন কাজকর্মে শিশুদের নিয়োগ দিতে আগ্রহী হন অনেকে। যে শিশুটিকে দেখাশোনার প্রয়োজন, উল্টে সে শিশুটিকেই নিয়োগ করা হয় অন্য শিশুদের দেখাশোনার কাজের অছিলায় এবং তাকে দিয়ে ঘর গেরস্থালির প্রায় সকল কাজ করিয়ে নেবার চেষ্টা করা হয়। শারীরিক সক্ষমতার অভাবে শিশুটি এতসব কাজ করে উঠতে না পারলে তার উপর অমানবিক নির্যাতন নেমে আসে যা হয়ে ওঠে নৃশংস এবং অনেক ক্ষেত্রে তা মৃত্যু ডেকে আনে। বলা বাহুল্য এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে সারাদেশে যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রকাশ্য আসে না। যদি কোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারে এ ঘটনা ঘটতো তবে ঘটনাটিকে গড়পড়তা বলে ধরে নেয়া যেত। কিন্তু ঘটনাটি ঘটেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি পরিবারে। যে পরিবারের কর্তা দেশের সরকারি বিমান সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অর্থাৎ এক নম্বর কর্তা। স্বভাবতই আশা করা যায় যে, কর্তাটি এবং তার পরিবার শিক্ষিত, সভ্যভব্য হবেন। কিন্তু এই কর্তার সগোচরে তার স্ত্রী এবং তাদের অন্য দু’জন বয়স্ক পরিচারিকা মিলে মেয়েটির হাত পা পাটার বাটনি দিয়ে থেঁতলে, সারা শরীরে গরম খুন্তি ছ্যাঁকা দিয়ে, টেনে টেনে মাথার চুল তুলে ফেলে নৃশংস অত্যাচারের মাধ্যমে অসহায় শিশুটিকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে। বাবার আকুতি মিনতির পর সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে মেয়েকে ফেরত দেবার পর জোর চেষ্টা চালিয়েছে পুরো ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে। এমডি জনাব শফিকুর রহমানের চাকুরির চুক্তি বাতিল করে তাকে পদচ্যুত করা হয়েছে। এখন তিনি সস্ত্রীক আটক। শিশু মোহনার সামান্য দোকান কর্মচারী হতদরিদ্র পিতা এবং মোহনা নিজে এই অন্যায় অত্যাচারের বিচার চেয়েছে। পরবর্তী ব্যবস্থা কিভাবে গ্রহণ করা হবে তা দেখার অপেক্ষায় আছি আমরা। হয়তো প্রভাব খাটিয়ে একটা সমঝোতা কিংবা ধামাচাপার চেষ্টা চলতে পারে। চেষ্টা চলতে পারে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের আশা করবো এসব যেন না হয়।
এই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা সামাজিক মাধ্যমে জানার পর কয়েক দশক আগে দেখা একটি চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ে গেল। মৃনাল সেন পরিচালিত ‘খারিজ’। ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিটি রমাপদ চৌধুরীর লেখা একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। উপন্যাস এবং চলচ্চিত্র দুটোই সে সময় রীতিমতো আলোড়ন তুলেছিল তার আখ্যানের কারণে। এ–ছবি মানবিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দর্শকদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল বিবেকের আয়নার সমুখে। তিন সদস্যের একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ও তাদের বাড়ির ‘কাজের ছেলে’ শিশু–পালানের আকস্মিক মৃত্যু এবং তৎপরবর্তী উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে চরম এক মানবিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন মৃণাল সেন, যেটি বিশ্ব চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রেখেছে।
১৯৮০ সালের প্রেক্ষাপটে ছবিটি রচিত। সে বছর কলকাতায় তুমুল শীত পড়েছিল। পালান নামের চাকর ছেলেটির বাবুদের ফ্ল্যাটে ঘুমানোর অধিকার ছিল না। সে অন্য একটি ফ্ল্যাটের আরেক শিশু চাকরের সঙ্গে বাড়ির সিঁড়ির নিচের খোপে ঘুমাতো। ইচ্ছে করেই চাকর বললাম। কারণ–গৃহকর্মী, গৃহপরিচারক, গৃহসেবক, গৃহসহায়ক এসব গালভরা আদুরে নামে যতই এদের সম্বোধন করা হোক না কেন, এরা আসলে কাজের ছেলে, কাজের লোক, বাসার চাকর। সব শ্রেণির গৃহমালিকেরা আমরা এদের ক্রীতদাসদাসীর মতোই জ্ঞান করি। এবং এদের ওপর জুলুম চালিয়ে, এদের গৃহসেবাকে অস্বীকার কওে আমরা এক ধরনের গোপন পুলক অনুভব করি মানুষের আদিম প্রবৃত্তির ইতর বিশেষ এখনও হয়নি।
যা হোক ফিরে আসি মৃনাল সেনের খারিজে। শিশু চাকর পালান কেবল একটি চাদর গায়ে দিয়ে ঘুমাতো। সেই রাতের হাঁড় কাপানো শীতে সে পাতলা চাদরটি গায়ে দিয়ে সিঁড়ির খোপে ঘুমাতে পারছিল না। তাই সে ওপরে উঠে এসে বাবুদের রান্নাঘরে ঘুমাতে যায়। উষ্ণতার লোভে (আশায় শব্দটি লিখলাম না) সে গ্যাসের উনুনটা জ্বালিয়ে রাখে মৃদুভাবে, বাবুদের রান্নাঘরটি মূল ফ্ল্যাটের বাইরে এবং সেখানে কোনো ভেন্টিলেটর ছিল না। রান্নার সময় দরজা খোলা থাকতো। কলকাতার পুরোনো ফ্ল্যাটবাড়িগুলো এই রকমের ছিল। পালান দরজাটা বন্ধ করে দেয়ায় গ্যাস নির্গমন হতে না পারায় রান্নাঘরে সাফোকেশনের সৃষ্টি হয়। ফলে পালান মারা যায়। স্বভাবতই এনিয়ে বাড়িতে এবং পাড়ায় যথেষ্ট আলোড়ন ঝড় ওঠে। পুলিশ আসে এবং যথারীতি প্রভাবশালীদের চাপাচাপিতে ব্যাপারটিতে ধামাচাপা পড়ে। পালানের বাবা গ্রাম থেকে এসে ছেলের লাশ শ্মশানে পুড়িয়ে আবার গ্রামে ফিরে যায়। প্রতিবাদ করতে পারে না অসহায় হতদরিদ্র পিতা। ছেলের হত্যাকান্ডকে নিজের ভাগ্যদোষ বলে মেনে নয়। যাবার সময় বাবুদের শিশুটিকে আশীর্বাদ করে যায়, যে শিশুটি প্রায় তার পালানেরই সমবয়সী।
তবে মোহনার ক্ষেত্রে ঘটনার শেষটি একটু ভিন্ন রকমের হয়েছে। মোহনা মরতে প্রাণে বেঁচে গেছে কয়েকমাসের নৃশংস নির্যাতন সহ্য করে। তার বাবা মোস্তফা মিয়া এই নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন নানা প্রলোভন ও চাপকে তিনি অস্বীকার করার সাহস দেখাতে পেরেছেন। আর্থিকভাবে অসহায় এই পিতার কাছে সন্তান বাৎসল্য জয়ী হয়েছে। মোহনার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, তার শারীরিক সুস্থতার জন্য দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু সে ট্রমায় থাকবে অনেকদিন। চিকিৎসা জনিত ব্যয় নির্বাহের জন্যে তার দরিদ্র পিতার সহায়তায় সরকার ও আমাদের এগিয়ে আসা বাঞ্ছনীয়। দায়ী ব্যক্তির কাছ থেকে যথাযথ জরিমানা আদায় করেও এ দুরাবস্থার সুরাহা করা উচিত। আশা করি দায়ী ব্যক্তিদের যথাযথ বিচার ও শাস্তি হবে। মোহনার বাবারও একটি সুষ্ঠু কর্মসংস্থান করে দিলে উপকৃত হবে পরিবারটি। মোহনা সুস্থ হওয়ার পর তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করাও জরুরি। তার মা শাহিদা বেগম যখন মারা যান তখন তার বয়স মাত্র তিন বছর। মোহনাকে যেন আর গৃহকর্মীর কাজ করতে না হয়। পঞ্চগড় জেলা সদরের আড়িপাশা গ্রামে তার বাবাকে একটা বাসস্থানের সুব্যবস্থা করে দেয়া যায়। এসব উদ্যোগের ব্যবস্থা সরকারি কিংবা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা মানবাধিকার সংস্থা থেকে করাটা তেমন কঠিন কিছুই নয়।
৩০ জানুয়ারি ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কয়েকজন সুহৃদ সাংবাদিক ও সচেতন মানুষের উদ্যোগে মোহনাকে উদ্ধার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেয়। সবকিছুই দ্রুত সময়ের মধ্যে হয়েছে যা খারিজের পালানের ভাগ্যে জোটেনি। নিঃসন্দেহে তা মঙ্গলজনক। পালান ও মোহনার মতো হাজার হাজার পালান ও মোহনা সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে যারা প্রতিনিয়ত নিগ্রহের শিকার। এর নিরসনে জনসচেতনতা গড়ে তোলা, তত্ত্বাবধান করা, পুনর্বাসন করা এসব কাজ উন্নয়ন কর্মীদের দায়িত্বে পড়ে। আমাদের আন্তরিক প্রত্যাশা–আর কোনো নতুন পালান ও মোহনা যেন নিগৃহীত না হয়–সামান্যতম অনুগ্রহ যেন তাদের ভাগ্যে জোটে . . .











