মোগলদের হাত ধরে বাংলায় বৈচিত্র্যময় ইফতার সামগ্রীর আগমন

গাজী মোহাম্মদ নুরউদ্দিন | বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ at ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

এ অঞ্চলে রোজার মাসকে উৎসবের আমেজ দিয়েছে মোগলরা। পবিত্র রমজানকে স্বাগত জানানো থেকে শুরু করে ইফতারের দস্তরখানকে বিভিন্ন স্বাদের বৈচিত্র্যময় খাবার দিয়ে ভরিয়ে তোলার রেওয়াজটা তাদের হাতে তৈরি, যা দিল্লি, লক্ষ্নৌ ও হায়দরাবাদ হয়ে বাংলায় পৌঁছেছে। আদতে মোগলদের শাহি বাবুর্চিখানা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের রাজাবাদশাহদের চেয়ে ‘বহুত উমদা’ ছিল। কেবল সম্রাট শাহজাহানের খাস বাবুর্চিই শতাধিক কিসিমের পোলাও রান্না করতে জানতেন।

আওরঙ্গজেব ও বাহাদুর শাহ জাফরের সময় এসে ইফতারির মাধ্যমে সাধারণ লোকজন দরবারি খাবারের স্বাদ চেখে দেখার সুযোগ পায়। ধারণা করা হয়, তখন থেকেই মোগল মহলের নানা শাহি খাবার ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তা না হলে সিরিয়া ও লেবাননের হারিসা মোগলদের রান্নাঘরে ঢুকে ভারতীয় মসলার ঘ্রাণে বিলীন হয়ে হালিম নাম ধারণ করত না; আর হায়দরাবাদ হয়ে তা ঢাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার মওকাও পেত না।

মোগলদের শেষ সময়ে এসে জালেবি বা জিলাপির মতো বনেদি খাবারও সাধারণ মানুষের ইফতারের থালায় উঠে আসে। শিরমাল কিংবা শিরবেরেঞ্জ হয়ে ওঠে ঢাকাইয়া মুসলমানদের ইফতার ও সাহ্‌রির প্রিয় আইটেম।

কেমন ছিল মোগল আমলের রোজা বা ইফতারের আয়োজন? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে রাজকর্মচারী ও ব্রিটিশ লেখকদের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

মির্জা নাথান বা হেকিম হাবিবুর রহমানের বর্ণনায় ইফতারে মোগল ও বাংলার নবাবদের যেসব খানাপিনার কথা জানা যায়, তার মধ্যে ছিল শরবত, নান, কাবাব, বিরিয়ানি, কোফতা, কোরমা, হালিম, জিলাপি, নিমকপারা ও সমুচার মতো কিছু ভাজাপোড়া।

নানের মধ্যে বিখ্যাত ছিল নানে তাফতান, যা বিভিন্ন ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি হতো। সুগন্ধিও থাকত এসব নানে। মোগলদের হাত ধরে আগ্রা থেকে ঢাকায় আসে বিখ্যাত শিরমাল। সুজি দিয়ে তৈরি করা খাবারটি এ অঞ্চলের ইফতার ও সাহ্‌রিতে অল্প দিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মোগলরা অবশ্য এটা কাবাব দিয়েই খেত। কখনো কখনো এসব রুটির সঙ্গে যোগ হতো নানখাতাই। তবে আমজনতা চাপটি আর সাধারণ রুটিতেই সেরে ফেলতেন তাঁদের রোজাখোলাই।

সালমা ইউসুফ হুসাইনের দ্য মোগল ফিস্ট: রেসিপিস ফ্রম দ্য কিচেন অব এম্পারার ও আনিস আহমেদের ঢাকাই আসলি বইয়ে মোগল হেঁশেলের নানা কিসিমের কাবাবের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল পারসান্দের শিক কাবাব। ভালো গোশতের দশবারো টুকরা দিয়ে কয়লার আগুনে পোড়া এই কাবাব যে কারোরই জিবে জল আনতে সক্ষম। কাবাবটি পরবর্তী সময়ে সুলতানি কাবাব নামেও পরিচিতি পায়।

মোগলদের আমলে না হলেও তাদের কাছাকাছি সময়ে রোজার মাসে ঢাকায় আরেকটি খাবারের খুব কদর ছিল মোরগ মোসাল্লাম। মোরগে প্রয়োজনীয় মসলা দেওয়ার পর সেদ্ধ ডিম ভেতরে পুরে সুতা পেঁচিয়ে শিকে গেঁথে খাবারটি ফোঁটা ফোঁটা ঘি দিয়ে সরাসরি আগুনের শিকায় সেঁকা হতো। তারপর পুরোটাই রাখা হতো ইফতারির বরতনে। এ ছাড়া শামি কাবাব, হান্ডি কাবাব, টিক্কা কাবাব, তাশ কাবাবের মতো নানা ধরনের কাবাব যুক্ত হয় এই সিলসিলায়।

মোগল বাবুর্চিখানায় শত রকমের বিরিয়ানি রান্নার খোঁজ পাওয়া গেলেও ইফতারে তাঁরা সাধারণত কোন ধরনের বিরিয়ানি খেতেন, তার সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে ঢাকার নবাবেরা যে রমজানে সিন্ধি বিরিয়ানি, লক্ষ্‌েণৗয়ি বিরিয়ানি, তেহারি ও মোরগুপোলাও খেতেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

১৬৩৯ সালে শাহ সুজার হাত ধরে তিন শ শিয়া পরিবার ঢাকায় আসে। তাদের মাধ্যমেও নানা ধরনের বিরিয়ানি ও পোলাও এ অঞ্চলে প্রবেশ করে বলে জানা যায়। এর মধ্যে খোরাসানি পোলাও ছিল অন্যতম। এই পোলাওয়ের বৈশিষ্ট্য ছিল তার সুঘ্রাণ, এক বাড়িতে এ পোলাও রান্না হলে পুরো মহল্লায় তার সুরভি ছড়িয়ে পড়ত।

দুধ, মধু, কিশমিশ ও মাওয়া দিয়ে রমজান মাসে শির বেরেঞ্জ নামে বিশেষ একটি খাবার তৈরি করা হতো। এটি খাওয়া হতো ইফতার ও সাহ্‌রি দুই বেলাতেই। তবে সেকালে রোজার সময় সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য ছিল শরবতে। একেক ধরনের বাদাম দিয়ে তৈরি হতো একেক ধরনের শরবত। আর এসব শরবতে দেওয়া থাকত জাফরান আর দামি সুগন্ধি।

পয়লা রমজানে মসজিদে ইফতারি পাঠানোর রেওয়াজটা শুরু হয় সতেরো শতকের পরে। মীজানুর রহমানের ঢাকা পুরাণ ও আনিস আহমেদের ঢাকাই আসলি গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, বিশেষত প্রথম রমজান ও ২৭ রমজানে ইফতারির বড় ডালা পাঠানো হতো মসজিদে মসজিদে। আত্মীয়স্বজন ও মেয়ের বাড়িতে ইফতারি দেওয়ার রেওয়াজটা মূলত তখন থেকেই চালু হয়। সে সময় নতুন বরের বাড়িতে ইফতারির ডালা পাঠানো একপ্রকার বাধ্যতামূলকই ছিল।

মোগল ও নবাবেরা মুসাফিরখানা ও বিভিন্ন মসজিদে লোকজনকে বিনা মূল্যে ইফতার করাতেন, যার ঐতিহ্য এখনো দিল্লি জামে মসজিদে টিকে আছে। মুর্শিদাবাদের নবাব এস্টেটে এখনো প্রতিদিন শত শত মানুষকে সাহ্‌রি ও ইফতার করানো হয়।

মোগল ও নবাবদের যুগ শেষ হলেও পুরান ঢাকায় ইফতারের সেই খান্দানি ধারা এখনো রয়ে গেছে। আজ থেকে শতবর্ষ আগের ইফতারের কথা তুললে বলতে হবে পুরান ঢাকার চকবাজারের কথা। চকবাজারকে বলা হতো বাদশাহি বাজার। মোগল আমল থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের নামীদামি বাবুর্চি ও হালইওয়ালারা ঢাকায় এসে ভিড় জমাতে থাকেন। তাঁরা তো একা আসেননি, সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন বিভিন্ন ধরনের নিহারি, হালিম ও কাবাব। ফালুদা ও লাচ্ছি মূলত তখনই জনসাধারণের নাগালে আসে।

ঢাকা পুরাণ বইয়ে মীজানুর রহমান গত শতকের পুরান ঢাকার ইফতারির তালিকায় যেসব খাবারের নাম উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে কাবাবের আধিক্যই বেশি। তখন চকবাজারে ছিল কাবাবের সমাহার। সুতি কাবাব, শামি কাবাব, নার্গিস কাবাব, খিরি কাবাবসহ হরেক রকম সুলভ মূল্যের কাবাব ছিল, যা ধনীগরিব সবারই প্রিয় ছিল। তবে শিশুকিশোরদের কাছে বেশি জনপ্রিয় ছিল কচুরি, খাজলা, গজা, দইবড়া। এসবের সঙ্গে থাকত ডাল পিষে বানানো গরম গরম ফুলুরি।

মোগলদের হাত ধরে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যময় ইফতার ও ইফতারের রীতিরেওয়াজ প্রসঙ্গে কবি শামসুর রাহমান তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘বাড়িতে ইফতারির সরঞ্জামের অভাব ছিল না, কিন্তু চোখ পড়ে থাকত সিতারা মসজিদের বারান্দায়। শুধু মনে হতো, ওই মুড়ি, ফুলুরি, দোভাজা, ছোলা আর বেগুনি মেশানো খাবারটা যেন রূপকথার দেশ থেকে এসেছে, আমাদের রোজকার দেখা ধরাছোঁয়ার বাইরের জিনিস।’

কালের পরিক্রমায় বর্তমানে আমাদের ঘরের মায়েরা তাদের হাতে বানানো স্বাস্থ্যকর ও সুস্বাদু ইফতার সামগ্রী তৈরি করে থাকে। শরবত (লেবু বা দই) ছোলা ভুনা, পিঁয়াজু, বেগুনি,হালিম, রকমারি পিঠা,জিলাপি, ফল, সালাদ, দইচিঁড়া, এবং চিকেন কিমা পরোটার মতো পুষ্টিকর খাবারগুলো সহজেই ঘরে তৈরি করে থাকে। যা সারাদিনের রোজার পর ক্লান্তি দূর করে এবং শরীর ঠাণ্ডা রাখে।অপরদিকে সমাজে খেটেখাওয়া শ্রমজীবী ছিন্নমূল মানুষের ইফতারে থাকে না চাকচিক্য বা আভিজাত্য। সাদামাটা ভাবেই ইফতার সারেন তারা।

লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅনন্য কাব্য ‘চলো স্বপ্ন বুনি’
পরবর্তী নিবন্ধমধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংকটের মধ্যে নিমজ্জিত হচ্ছে!