পাহাড় আমাকে টানে সবসময়েই । তবে এবারের টানটা ছিল খানিকটা ভিন্ন। ইট–পাথরের যান্ত্রিকতা পেছনে ফেলে, কুয়াশার চাদর সরিয়ে দিতে দিতে আমরা কয়েকজন বন্ধু যখন বান্দরবানের সর্পিল পথ ধরলাম, তখনো জানতাম না সামনের দু’টি দিন আমাদের জন্য কী মায়াবী আবেশ নিয়ে অপেক্ষা করছে। কবি লিখেছিলেন-“গিরি–শৃঙ্গ–মুকুট ধবল, মেঘের মিতালী চলে…’। সেই মেঘের দেশে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম বন্ধুত্বের গান আর কবিতার ভেলায় চড়ে।
৩১ডিসেম্বর, কুয়াশার চাদর মোড়ানো এক সকালে আমাদের বন্ধুদের দলটি যখন চট্টগ্রাম শহর থেকে মাইক্রোবাসে চড়ে বান্দরবানের সর্পিল পথ ধরলাম, লক্ষ্য ছিল একটাই– বছরের শেষ সূর্যাস্ত আর নতুন বছরের প্রথম সূর্যটাকে পাহাড়ের বিশালতায় বরণ করে নেওয়া। পাহাড় মানেই এক আদিম টান, যেখানে গেলে নাগরিক ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায়। কবি গেয়েছিলেন-“আকাশ আমায় ভরলো আলোয়, আকাশ আমি ভরবো গানে…”। আমার উদ্দেশ্যও ছিল ঠিক তা–ই।
দুপুরের তপ্ত রোদ গায়ে মেখেই আমরা পৌঁছালাম পাহাড়ের দেশে। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের ভোজ সেরে আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল নীলাচল। সেখান থেকে মেঘেদের লুকোচুরি দেখতে দেখতেই, ফটোসেশান করতে–করতে আমাদের সাথে যোগ দিল দুই পাহাড়ি বন্ধু–উদ্দেন্ধু আর সুচিত্রা। তাদের সেই চিরাচরিত পাহাড়ের মতো শান্ত এবং আন্তরিক আতিথেয়তায় আমাদের ভ্রমণের আমেজ পাল্টে গেল। তাদের দুজনের হাসিমুখ আর সঙ্গ যেন পাহাড়ের রুক্ষতাকেও মায়াবী করে তুলল।
নীলাচল থেকে উদ্দেন্ধু আর সুচিত্রার সাথে আমরা চললাম তং রিসোর্টের দিকে। পাহাড়ের অনেক ভেতরে এই রিসোর্টটি যেন এক রূপকথার রাজ্য। চারপাশে পাইন আর নাম না জানা গাছের সারি দেখে মনে হচ্ছিল আমরা দার্জিলিংয়ের কোনো নির্জন কোণে দাঁড়িয়ে আছি।
ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এলো। তং রিসোর্টে বসে নানারকম নাস্তা আর আড্ডায় যখন মজেছি, তখনই প্রকৃতির এক অদ্ভুত জাদু দেখলাম।
আকাশে তখন বিশাল এক রূপালি চাঁদ, অথচ চারপাশ ঢেকে গেছে বৃষ্টির মতো ঝরতে থাকা ঘন কুয়াশায়। জ্যোৎস্না আর কুয়াশার সেই মিতালীতে রাস্তাঘাট ভিজে একাকার। মনে হচ্ছিল আকাশ আর মাটি একাকার হয়ে গেছে কোনো এক অলৌকিক প্রেমে। সেই মুহূর্তে বন্ধুদের কারো কণ্ঠে সুর মেলালো–
‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো…ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধ সুধা ঢালো।’
চা খাওয়ার নেশায় আমরা বসলাম বাহাদুর পার্কে। সেখানে গিয়েই এতো ভালো লাগলো যে, পাহাড়ি মেয়েরা নানারকম পিঠাপুলি বানাচ্ছে, পেঁয়াজু, ছোলাসহ নানান খাবার রেখেছেন। আমি পিঠার লোভ সামলাতে না পেরে কয়েকটা নিলাম, টুকরো টুকরো করে ভাগাভাগি করে খেলাম সকলেই। অসাধারণ সব। শীতও আমাদের ঠেকাতে পারেনি খোলা চত্বর থেকে।
রাতের মায়াবী আবেশ গায়ে মেখে আমরা ফিরলাম বান্দরবান পর্যটনে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক মহেন্দ্রক্ষণ। পুরনো বছরের সমস্ত গ্লানি মুছে ফেলে আমরা বন্ধুরা মিলে মেতে উঠলাম বর্ষবরণের উৎসবে। রাত ১২টা বাজার সাথে সাথেই পাহাড়ের নির্জনতা ভেঙে আমরা গেয়ে উঠলাম জীবনের গান। কেউ আবৃত্তি করল নিজের লেখা কবিতা, কেউ বা সুর তুলল গানে । আমাদের বিশুদা নতুন সাউন্ড সিস্টেম মাইক্রোফোন সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সকলই আনন্দিত হলাম ওটা দেখে। মিলিত সুরে সকলেই শেষ গান গাইলাম।
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
পরদিন সকালে আমরা বের হলাম পাহাড়ের আরও গভীরে। চমৎকার সব রিসোর্ট ঘুরে, মেঘলায় বেরিয়ে যখন আমরা স্বর্ণমন্দিরে (বুদ্ধ ধাতু জাদি) পৌঁছালাম, তখন সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের দুয়ার বন্ধ। কিন্তু বন্ধু সুচিত্রা সাথে থাকায় আমাদের জন্য অসাধ্য সাধন হলো। তার সহযোগিতায় আমরা ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেলাম। মন্দিরের সেই কারুকার্য, শান্ত পরিবেশ আর সোনালি আভা আমাদের মনকে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিল। এতো সুন্দর যা শুধু চোখ আর মনেই ধারণ করা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এক স্বর্গীয় সুষমায় আমরা স্নান করছি।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চমৎকার জায়গায় যা অনেকটা উচুতে। ওখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো আকাশ ছুঁতে যাচ্ছি। এই তো আমাদের নাগালেই!
আড্ডায় ফিরে এল গত দুইদিনের যত খুনসুটি আর আনন্দের স্মৃতি। বন্ধুদের সাথে কাটানো সেই মুহূর্তগুলো ছিল যেন একেকটি মুক্তোর দানা। বিদায়বেলায় আমাদের হৃদয়ে তখন বিষাদ আর প্রশান্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করছিল–
‘পথের সাথি, নমি নমি। পথ যে আমার শেষ হল না, ফুরিয়ে এলে তুমি।’
বান্দরবানের সেই মেঘ, তং রিসোর্টের সেই কুয়াশাভেজা রাত আর উদ্দেন্ধু–সুচিত্রার অমলিন বন্ধুত্ব– এই সবকিছু নিয়ে আমরা ফিরলাম যান্ত্রিক শহরে, কিন্তু হৃদয়ে গেঁথে রইল পাহাড়ের সেই বিশালতা আর বন্ধুত্বের চিরন্তন স্মৃতি।
ফিরতি পথে আমাদের সেই জমজমাট মাইক্রোবাসে তখন পিনপতন নীরবতা, সবার চোখেমুখে কেবল ফেলে আসা পাহাড়ের সেই মায়াবী স্মৃতি। উদ্দেন্ধু আর সুচিত্রার সেই অমলিন হাসি যেন এখনো পাহাড়ের বাঁকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তং রিসোর্টের সেই কুয়াশাভেজা জ্যোৎস্না আর বাহাদুর পার্কের চায়ের আড্ডাগুলো এখন আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছবি।
আমরা শহরমুখী হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের আত্মার একটা অংশ যেন সেই পাহাড়ের ভাঁজেই রয়ে গেল। বিদায়বেলায় মনে পড়ছিল সেই চিরচেনা গানের লাইনগুলো, যা আমাদের এই বন্ধুত্বের আর পাহাড়ের সখ্যতাকে পূর্ণতা দেয়–
‘ও সে চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।
আয় আর–একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।
মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।’
বান্দরবানের সেই পাহাড়, মেঘ আর বন্ধুদের ভালোবাসায় সিক্ত এই সফর হৃদয়ে বেঁচে থাকবে আজীবন। এক পশলা বৃষ্টির মতো, কিংবা পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা এক টুকরো সাদা মেঘের মতোন।











