একাত্তর সালে ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম থাকতেন সার্কিট হাউজ রোডে। তাঁর ঠিক পাশের বাসাতেই থাকতেন ডঃ কামাল হোসেন। পঁচিশে মার্চ রাতে ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদ গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় দেখা করতে। সেখানে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় পাকিস্তানিদের আক্রমণ যে আসন্ন সে বিষয়টা উঠে আসে। পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আর নিরাপদে থাকার জন্য শেখ মুজিব সবাইকে গা ঢাকা দিতে বলেন। ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদ দুইজনই শেখ মুজিবকেও বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন। তাঁদের সেই পরামর্শ শেখ মুজিব গ্রহণ করেন নাই। তাঁর যুক্তি ছিলো, তাঁকে না পেলে পাকিস্তান আর্মি পুরো ঢাকা শহর জ্বালিয়ে দেবে।
ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম ধানমন্ডি থেকে বাসায় ফিরে আসেন। স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ডঃ কামালকে সঙ্গী করে তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় যান। তাঁদের আগমনের কথা শুনে তাজউদ্দীন আহমদ একটা রাইফেল নিয়ে বের হয়ে আসেন। পাকিস্তানিদের সাথে সশস্ত্র যুদ্ধ হতে পারে, এই বিবেচনা থেকে তিনি ওই রাইফেল জোগাড় করেছিলেন। শুধু রাইফেল জোগাড়ই না, এটা চালানোর প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন তিনি। ওই রাইফেল নিয়ে পালাতে গেলে পথে ঝামেলা হবে, এটা বুঝিয়ে রাইফেল ছাড়াই তাঁকে নিয়ে বের হয়ে আসেন সবাই।
পথে ডঃ কামাল তাঁদের ছেড়ে যান পরের দিন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সবাই মিলিত হবেন এই পরিকল্পনা করে। ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম আর তাজউদ্দীন আহমদ আশ্রয় নেন ভিন্ন এক বাড়িতে। ওই রাতে ডঃ কামাল হোসেন পাকিস্তানিদের হাতে ধরা পড়েন। ফলে, তিনি আর আসতে পারেন নাই তাঁদের পূর্ব নির্ধারিত মিলনস্থলে।
পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকা শহরে থাকাটা অনিরাপদ বিবেচনা করেন তাঁরা। সিদ্ধান্ত নেন ঢাকা শহর থেকে বের হয়ে যেতে হবে। রায়ের বাজার দিয়ে নদী পার হয়ে ঢাকা থেকে বের হয়ে পড়েন তাঁরা। শুরুতে যান ফরিদপুর। সেখান থেকে মাগুরাতে পৌঁছান তাঁরা। ওখানে আওয়ামী লীগের নেতা সোহরাব হোসেনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। মাগুরার মহকুমা প্রশাসক ছিলেন তখন কামাল সিদ্দিকী। এর মাঝে তাঁরা জানতে পারেন, মাহবুব আলম, যিনি পরবর্তীতে পুলিশ সুপার হয়েছিলেন, ঝিনাইদহে কন্ট্রোল রুম খুলে সেখান থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাচ্ছেন। তাঁরা তখন ঝিনাইদহে। মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক ছিলেন তওফিক এলাহী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার মহকুমা প্রশাসক এবং কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ছিলেন অবাঙালি। চুয়াডাঙ্গার মহকুমা প্রশাসককে হত্যা করে সেটার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলো বাঙালি সেনারা। তখনই পরিকল্পনা করা হয় কুষ্টিয়া অবরোধের।
তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম চলে আসেন চুয়াডাঙ্গায়। চুয়াডাঙ্গায় তখন ইপিআরের নেতৃত্বে ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। ইনি পরবর্তীতে ৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কুষ্টিয়া দখল করতে ইপিআর বাহিনীকে পাঠানো হয় কুষ্টিয়া। কুষ্টিয়াতে পাকিস্তান সেনা এবং মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনতার মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা দখল করে নেয় কুষ্টিয়া।
কুষ্টিয়া দখল সম্পন্ন হবার পর ভারতে যাবার পরিকল্পনা করা হয়। তবে, পলায়নি মনোবৃত্তি নিয়ে নয়, স্বাধীন দেশের সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্য মর্যাদা নিয়ে তাঁরা সেখানে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। সীমান্ত থেকে কিছু দূরে একটা জঙ্গলের মাঝে খালের ওপর একটা ব্রিটিশ যুগের তৈরি কালভার্ট ছিলো। সেই কালভার্টের ওপর অপেক্ষা করতে থাকেন তাঁরা। অন্যদিকে তওফিক এলাহী এবং মাহবুব আলম প্রবেশ করেন ভারতে, সীমান্ত ফাঁড়ির খোঁজে।
অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পর কিছু সশস্ত্র আগন্তুক এসে দাঁড়ায় তাঁদের পাশে। এরা ছিলো বিএসএফের সদস্য। তারা এসে হাতের অস্ত্র উঁচু করে সামরিক কায়দায় তাদের অভিবাদন করে। অফিসারটি জানায়, তাঁদেরকে তিনি যথোপযুক্ত সম্মান দিয়ে ছাউনিতে নিয়ে যেতে এসেছেন।
ছাউনিতে যাবার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার এসে উপস্থিত হন। এরপরে যা ঘটে তা অনেকটা রোলার কোস্টার রাইডের মতো। তাঁরা কোলকাতা হয়ে দিল্লি যান। সেখানে তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনায় বসেন। এবং পরবর্তী দশ দিনের মধ্যেই প্রবাসী সরকার গঠন থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রও লেখা হয়ে যায়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে মুজিবনগরে সেই সরকার প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে শপথ গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলামই লিখেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই প্রবাসী সরকার যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি যে সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করেছে, তার মধ্যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্যতম। তাঁর ভাষ্যে, “আমেরিকার ইণ্ডিপেনডেন্স বিল অনেক দিন আগে পড়েছিলেন। সেই অরিজিনাল দলিল চোখের সামনে ভাসছে। আর সেই বড় বড় হাতের স্বাক্ষরগুলো। কিন্তু ভাষা বা ফর্ম কিছুই মনে নেই। তবে বেশী কিছু মনে করার চেষ্টা করলাম না। শুধু মনে করলাম কি কি প্রেক্ষিতে আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার অধিকার রয়েছে। এমনি চিন্তা করে ঘোষণাপত্রের একটা খসড়া তৈরী করলাম। স্বাধীনতার ঘোষণায় অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়া হলো।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া রচনার পর তাজউদ্দীন ভাইকে দেখালাম। তিনি পছন্দ করলেন। আমি বললাম, আমরা সকলেই এখন যুদ্ধে অবতীর্ণ। এই দলিলের খসড়াটি কোন একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভাল হতো। তিনি বললেন এই মুহূর্তে কাকে আর পাবেন। যদি সম্ভব হয় কাউকে দেখিয়ে নিন।
ইতিমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্যে সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। আমি তাঁর লেখা কিছু নিবন্ধ পড়েছি বলে মনে হলো। বিএসএফ এর মাধ্যমে রায় চৌধুরীর ঠিকানা জেনে নিলাম। টেলিফোনে তাঁকে যোগাযোগ করি। বললাম তাঁর সাথে দেখা করতে চাই। তিনি রাজী হলেন। বালীগঞ্জে তাঁর বাসা। আমার পরিচয়, ‘রহমত আলী’ নামে। সুব্রত রায় চৌধুরীর বাসায় পৌঁছে তাঁকে আমার প্রণীত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি দেখালাম। খসড়াটি দেখে তিনি আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন। এই খসড়া আমি করেছি কি–না জিজ্ঞাসা করলেন। আমি হ্যাঁ সূচক জবাব দেই। তিনি বলেন, একটা কমা বা সেমিকোলন বদলাবার কোন প্রয়োজন নেই।”
শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই নয়। বাংলাদেশ সরকারের যে মনোগ্রাম আছে, লাল বৃত্তের মাঝে বাংলাদেশের ম্যাপ, সেটা তাঁর নিজের হাতে আঁকা। মুজিবনগর সরকার ওটাকে ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে দেশ মুক্ত হবার পরেও সেই মনোগ্রাম থেকে যায় বাংলাদেশ সরকারের মনোগ্রাম হিসাবে।
ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলামের বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “প্রবাসী সরকার সম্পর্কে এ পর্যন্ত লেখা হয়েছে সবচেয়ে কম। কারণ, সবাই হয়ত ঐ সময়টা ভুলে থাকতে চান। ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম ঐ সময়টিকে স্মরণ করে স্মৃতিচারণ করেছেন সে জন্য তিনি আমাদের ধন্যবাদার্হ। এ কারণে হয়ত তিনি অনেকের বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হবেন, কিন্তু আমাদের বলতে দ্বিধা নেই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার সময় তাঁর স্মৃতিকাহিনী মূল্যবান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হবে।”
মুনতাসীর মামুনের সাথে আমি একমত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপরে লেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা বই এটা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অনন্য দলিল বলা চলে একে। কিন্তু, কোনো এক বিচিত্র কারণে এই বইটার তেমন একটা প্রচার নেই। এই বইয়ের লেখক ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলাম প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে, সেটাই আসল গুরুত্ব নয় এই বইয়ের। পঁচিশে মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর থেকেই তিনি তাজউদ্দীন আহমদের সাথে ছিলেন। ভারতে গিয়েও দুইজন এক বাড়ির এক কক্ষে অবস্থান করতেন। ফলে, তাজউদ্দীন আহমদের সাথে ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে, আমাদের প্রতিরোধ যুদ্ধের ভাবনা–চিন্তা এবং এর প্রেক্ষিতে প্রবাসী সরকার গঠনের যে ইতিহাস সেটা একেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। তাজউদ্দীন আহমদ যেহেতু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো স্মৃতিচারণ করেন নাই, সে কারণে ব্যারিস্টার আমীর–উল ইসলামের ভাষ্যকে সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা মানুষের ভাষ্য হিসাবে গ্রহণ করা যায়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার একেবারে শুরুর অংশটা তাই তাঁর চেয়ে কেউ বেশি ভালোভাবে দেখে নাই।
বাংলাদেশের ইতিহাস যাঁরা পাঠ করতে আগ্রহী, বিশেষ করে আমাদের দেশের জন্মলগ্নটা যাঁরা জানতে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য।













