মুক্তিযুদ্ধের একজন অংশীদার আমিও

বিচিত্রা সেন | শনিবার , ২৮ মার্চ, ২০২৬ at ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির অহংকার। এ অহংকার হার না মানার অহংকার। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো ইতিহাস নয়। এ যুদ্ধ ধারাবাহিক আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ। পাল আমল থেকে সেন আমল,শাহী আমল থেকে বৃটিশ আমল বাঙালি বরাবরই স্বাধীন থাকতে চেয়েছে। ঈসা খানপ্রতাপাদিত্য, তিতুমীরবাঘা যতীন, সূর্য সেনক্ষুদিরাম, প্রীতিলতাকল্পনা দত্ত, সালামজব্বার এক একটি থোকা থোকা নাম বাংলা মায়ের। তাঁদেরই মুক্তিপিয়াসী আন্দোলনের ধারাবাহিক পথ ধরে এ বাংলার বুকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাব। তাঁর নেতৃত্বে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় বাঙালির অনন্তকালের গৌরব। এই যুদ্ধে যেহেতু আমি আমার বাবা, কাকা, দুই মামাকে হারিয়েছি, সেহেতু আমিও যুদ্ধের একজন অংশীদার। আমার সাহিত্যে তাই মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বারংবার। তারই কিছু অংশ আজ আমি আমার এই লেখায় তুলে ধরবো।

২০২০ সালে গ্রন্থকুটির থেকে প্রকাশিত ‘মুক্তির সংগ্রাম’ গল্পে ৭ মার্চকে ঘিরে বাঙালির প্রবল আগ্রহ ও উত্তেজনা ফুটে উঠেছে। গল্পে তা এসেছে এভাবে– ‘অন্য সবার মতো গনি মিয়াও উন্মুখ। তাই সশরীরে সে রেসকোর্স ময়দানে হাজির থাকতে চায়। সঙ্গীদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বাস স্টেশনে এসে পড়ে গনি মিয়া। কিন্তু বাস স্টেশনে বাস কই? পিঁপড়ের মতো কিলবিল করছে হাজার হাজার মানুষ। এত মানুষের ভিড়ে মুড়ির টিন মার্কা কয়েকটা বাস কী বা করতে পারবে? তাই মালিকপক্ষ ভাঙচুরের ভয়ে বাসই বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু বুকে ক্ষোভের যন্ত্রণা নিয়ে সমুদ্র যখন ফুঁসে ওঠে তখন তাকে রোখে সাধ্য কার? তেমনি অবিচার, অনাচার, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যে বাঙালি ফুঁসে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তাকে লাগাম পরাবে এমন সাধ্য কার আছে?’একই গ্রন্থের ‘মুক্তিসেনা’ গল্পে একদিকে যেমন আছে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের বীরত্বের কাহিনি, তেমনি আছে রাজাকারদের বীভৎস অত্যাচারের চিত্র। মুক্তিযোদ্ধা মিলন যখন মায়ের সাথে দেখা করতে এসে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে তখনকার বর্ণনা -“মুখ থুবড়ে পড়ে মিলন। বুদ্ধিমান বশির রাজাকার আবারও সময় নষ্ট করে না, সাগরেদদের হুকুম দেয়, ‘হালার পোরে জবাই করে দে।’ বিপুল উৎসাহে সাগরেদরা কাজে নেমে পড়ে। একজন মিলনের হাত দুটো চেপে ধরে, আরেকজন জবাইয়ের কাজটা তৃপ্তি সহকারে সারে। তারপর তারা ‘মুক্তি’ খতম করে কল্পিত বেহেশতের দিকে যেন হেঁটে যায়।”

২০২২ সালে গ্রন্থকুটির থেকে প্রকাশিত ‘ওরা ফেরেনি কেউ’ উপন্যাসে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এসেছে বিশদভাবে। এ উপন্যাসের ব্যাপ্তি ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। তিন প্রজন্মের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে এ উপন্যাসে। এর মধ্যে মধ্যম প্রজন্ম আদিত্য নারায়ণ পুরোটাই মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ধাপ এ উপন্যাসে এসেছে নিখুঁতভাবে, জীবন্ত দলিল হয়ে।

২০২৩ সালে ‘দেশ পাবলিকেশন্স’ থেকে প্রকাশিত ‘পদ্মপাতার জল’ গল্পগ্রন্থের ‘মোদের গরব মোদের আশা’ গল্পে ভাষা আন্দোলনের চেতনা এসেছে প্রবলভাবে। স্কুল পরিদর্শক পরিদর্শনে এসে বাংলা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলে স্কুল শিক্ষক রুবা তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর প্রতিবাদের মুখে পরিদর্শক তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। পরে জানা যায় রুবা এক ভাষাশহিদের নাতনি।

একই সালে ‘গ্রন্থকুটির’ থেকে প্রকাশিত ‘জলছবি সংসার’ গল্পগ্রন্থে ‘একটি ভাষণ ও মৃদুলবাবুর আত্মদান’ গল্পে ৭ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ মধ্যবিত্তের রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়া এবং শেষ পর্যন্ত আত্মাহুতি প্রকাশিত হয়েছে। অফিসে গিয়ে মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রাণ হারান মৃদুলবাবু। তবে তার আগে মিলিটারির কাঁধে বসিয়ে দেয় এক মরণকামড়। একই গ্রন্থের ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ গল্পে ভারতের বিহার রাজ্যের অধিবাসী এক বাঙালি বৃদ্ধার বাংলা ভাষার জন্য আকুলতা দেখে ৫২ এর ভাষা আন্দোলনকে স্মরণ করেছে গল্পের নায়িকা।

একই গ্রন্থের ‘সে এক দুঃসহ দিন’ গল্পে অবরুদ্ধ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের দুঃসহ চিত্র ফুটে উঠেছে। শহর থেকে পালাতে গিয়েও এ গল্পের পরিবারটি বাঁচতে পারেনি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মমতা এ গল্পে এসেছে এভাবে– ‘ঠিক তখনি পাড়ে এসে দাঁড়ায় ট্রাকটি। সবাই অবাক হয়ে দেখে সাম্পানের দিকে অস্ত্র তাক করে রাখা মিলিটারির দলকে। ওদের মধ্যে একজন উর্দুতে হুকুম দেয় সবাইকে উঠে আসতে, নাহয় গুলি চালাবে। অনিলবাবু মীরা দেবী এবং তিথিইতির দিকে তাকান। ভয়ে ওদের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে।’ এভাবেই হাটে মাঠে ঘাটে হায়েনার দল চষে বেড়িয়েছিল এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছিল। একই গ্রন্থের আরেকটি গল্প ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’। এ গল্পে গ্রামবাংলায় রাজাকারদের দৌরাত্ম্য প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ মানুষদের ওপর রাজাকাররা যে সীমাহীন অত্যাচার চালিয়েছিল তার চিত্র আছে এ গল্পে। মায়ের জন্য ঔষধ আনতে গিয়ে রাজাকারদের হাতে বন্দী হয় বাদল। বাদল মায়ের অসুখের কথা বলে তাকে ছেড়ে দেবার অনুনয় করলে কুখ্যাত রাজাকার জাকির বলে-‘অ বাজি, তোরে তো আর ছাড়ন যাইতো ন। আঁরে মেজর সাবে হোইয়ে দে, উগ্‌গা মুক্তিযোদ্ধা ধরাই দিত ফাইরলে বোত বড় ধরনর ফুরস্কার দিবো। চল বাজি, তুই অইলি যে আজিয়ার মুক্তিযোদ্ধা।’ এভাবে ওরা সাধারণ তরুণদের মুক্তিযোদ্ধা বলে নির্মমভাবে হত্যা করতো। আর হিন্দু হলে তো ‘ভারতের দালাল’ বলে অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যেতো।

২০২৫ সালে রাদিয়া প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘বুভুক্ষু বিষাদ’ গল্পগ্রন্থের ‘কোথায় যে পাই’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধে বাবা হারানো ছোট্ট মেয়ে অনির কষ্টকে তুলে ধরা হয়েছে। এসব গল্প ছাড়াও পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রবন্ধে এবং ‘শৈলী প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত ‘জাগিয়া উঠিল প্রাণ’ প্রবন্ধগ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ এবং শহিদদের কথা বারবার উঠে এসেছে। এ ধারার কয়েকটি প্রবন্ধ হলো-‘চট্টগ্রামের বধ্যভূমি :সংরক্ষণ করা জরুরি’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও একজন শহিদসন্তানের অনুভূতি’, ‘বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের নারী’, ‘সূর্য সেন: অগ্নিযুগের মহানায়ক’, ‘কেমন আছে ৭১ এর শহিদের স্বজনেরা’, ‘একজন শহিদসন্তানের আকুতি’ প্রভৃতি।

লেখক: কথাসাহিত্যিক; অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধস্বাধীনতার অর্জন ও রক্ষা : আমাদের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার
পরবর্তী নিবন্ধযমজ শিশু