বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তবাসীর আতঙ্ক কাটছে না। মর্টার শেলের গোলা বিস্ফোরণে নোম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রিত রোহিঙ্গা হতাহতের পর গতকাল শনিবার সকালে সীমান্ত এলাকায় ফের মর্টার শেল নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ঘুমধুম ও তুমব্রু সীমান্তে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা গেছে। কখনো কখনো বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছে সীমান্ত অঞ্চল। এতে ঘুমধুম সীমান্তজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকেরা পার্শ্ববর্তী এলাকায় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে গতকাল কোনো গোলা বাংলাদেশের সীমানায় এসে পড়েনি।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। শিক্ষার্থীদের মতোই সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী নাগরিকদের নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসনে জরুরি সভা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়রা জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তের কোনাপাড়া নোম্যান্স ল্যান্ড এলাকায় মিয়ানমারের ছোড়া মর্টার শেল বিস্ফোরণে শুক্রবার মৃত্যু হয় নোম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রিত রোহিঙ্গা মো. ইকবালের। আহত আরও ৫ জন রোহিঙ্গা বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এর আগে সকালে ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবকের পা উড়ে যায়।
ঘুমধুম ইউনিয়নের ঘুমধুম, তমব্রু, বাইশফাঁড়ি, রেজু-আমতলী সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষায় সতর্কাবস্থায় প্রহরায় রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি। সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়েছে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সীমান্তবর্তী এলাকায় চলাচলকারী গাড়ি ও বাসিন্দাদের তল্লাশি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের যত্রতত্র চলাচলে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে ঘুমধুম ইউনিয়নের মানুষ। সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গোলা বর্ষণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কখনো কখনো বিকট শব্দে কাঁপছে ঘুমধুম। সীমান্তবাসীদের অনেকে উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় নিজেদের বাসাবাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে আত্মীয়-স্বজনের বাসাবাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে।
সীমান্তের বাসিন্দাদের দাবি, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর মধ্যে আস্তানা ও ক্যাম্প দখলের যুদ্ধ চলছে। আরাকান আর্মির আস্তানা ধ্বংসে মিয়ানমার বাহিনী যুদ্ধবিমান, ফাইটিং হেলিকপ্টার থেকে গোলা নিক্ষেপ করছে। শুক্রবার তৃতীয় দফায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের মর্টার শেলের তিনটি গোলা এসে পড়েছিল তুমব্রু সীমান্তে। তার আগে যুদ্ধবিমান ও মর্টার শেলের ছোড়া গোলা আরও দু’বার এসে পড়েছিল ঘুমধুম সীমান্তের জনবসতিতে। ভারী অস্ত্রে গুলিও বিভিন্ন সময়ে এসে পড়ছে বাংলাদেশ সীমানায়।
মর্টার শেলটি নিষ্ক্রিয়, নিহতের মরদেহ হস্তান্তর : মর্টার শেলের আঘাতে রোহিঙ্গা নিহত ও কয়েকজন আহত হওয়ার পর তুমব্রুতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গতকাল দুপুরে মর্টার শেলটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। নিহত ইকবালের মরদেহ গতকাল তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনায় সময় মৃত ইকবাল শূন্যরেখায় আশ্রিত ক্যাম্পের ১০ নম্বর সেটে অবস্থান করছিলেন। পাশে একটি অস্থায়ী দোকান ঘর। ৮/১০ জন রোহিঙ্গা গোলাগুলির বিষয়ে কথা বলছিলেন। সেই সময় পরপর দুটি মর্টার শেল এসে পড়ে কোনারপাড়ায়। এর একটি শূন্যরেখায় থাকা কোনারপাড়া তুমব্রু খালের পাড়ে পাথরে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। এতেই ঘটনাস্থলে নিহত হন ইকবাল।
শুক্রবার রাতের ঘটনার পর ঘুমধুমের কোনারপাড়া ও মাঝেরপাড়ার দুই গ্রামের ৬০ পরিবার রাত ১২টার দিকে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছিল। হেডম্যানপাড়ার নারীদের সরিয়ে রাখা হয়। তিন গ্রামের অধিকাংশ মানুষ গতকাল সকালে নিজ বাড়িতে ফিরে এসেছে।
নাইক্ষ্যংছড়ির ইউএনও সালমা ফেরদৌস বলেন, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ঘুমধুম থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক।
পরিবর্তিত কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরীক্ষা : অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সীমান্তবর্তী ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রটি সরিয়ে পার্শ্ববর্তী কঙবাজারের উখিয়া উপজেলার কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় স্থানান্তর করা হয়। গতকাল স্থানান্তরিত পরীক্ষা কেন্দ্রে বাংলা ২য় পত্রের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ঘুমধুম কেন্দ্রের ৪৯৯ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে ঘুমধুম ইউনিয়নের পরীক্ষার্থী ছিল ১৭৫ জন। অন্যরা ছিল কঙবাজারের কুতুপালং-বালুখালী স্কুলের পরীক্ষার্থী। পরীক্ষার্থীদের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য পরীক্ষা কেন্দ্র এলাকায় পর্যাপ্ত পরিবহন রাখা হয়েছিল।
এদিকে উখিয়া থানা পুলিশের পক্ষ থেকে পরীক্ষার্থীদের কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আনার জন্যে দুটি বাস দেয়া হয়। পরীক্ষা শেষে তাদের যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা শেখ মোহাম্মদ আলী। এছাড়া ছাত্রলীগ উখিয়া শাখার পক্ষ থেকে পরীক্ষার্থীদের জন্য দুটি মিনিবাসের ব্যবস্থা করা হয়।
বিডিনিউজ সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে আসা গোলার বিস্ফোরণে রোহিঙ্গাদের হতাহতের ঘটনার পর গতকাল সকালে সীমান্ত এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে পালিয়ে আসা ৬২১টি পরিবারের ৪ হাজার ২০০ রোহিঙ্গা এখনো তুমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়ার শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছে। সকাল থেকেই আশ্রয়শিবির সংলগ্ন মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান বলে জানান তুমব্রু-কোণাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দলনেতা (মাঝি) দিল মোহাম্মদ।










