মিলন চৌধুরীর জীবন ও সৃষ্টি

ড. ইউসুফ ইকবাল | সোমবার , ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:১৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের সৃজনশীল নাট্যচর্চায় নাট্যকার মিলন চৌধুরী (১৯৫০-) স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল। নাটকের রচনা, নির্দেশনা, সুরসংযোজনা, দল গঠনসহ সাংগঠনিক বিবিধ কাজে তিনি প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতাউত্তর নবনাট্যচর্চার উন্মেষ ও বিকাশপর্বের তিনি প্রত্যক্ষ সাক্ষী। নাটকের সমূহ ক্ষেত্রে পরীক্ষানিরীক্ষা, অন্বেষণ, উদ্ভাবন ও উৎকর্ষ সাধনে তিনি অকুণ্ঠচিত্তে সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন। নাটকের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে যে জীবনকে প্রত্যক্ষ করেছেন, তাকেই তিনি নাটকে তুলে ধরছেন। নিজের পরিচয় সম্পর্কে মিলন চৌধুরী বলেন– ‘আমি মঞ্চের মানুষ। মঞ্চই আমার শিল্প চর্চার প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র’। মিলন চৌধুরীর নাট্যভাবনা, নাটকের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা নাট্যাঙ্গনে তাঁর উৎসর্গীকৃত জীবনেরই প্রতিফলন। তাঁর নাটকে সৃষ্ট চরিত্র নাট্যকার মিলন চৌধুরীর নাট্যজীবনেরই যেন বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

মিলন চৌধুরীর জীবন আপাদমস্তক শিল্পে সমর্পিত। শিল্পের মাঝে তিনি অন্বেষণ করেছেন জীবনের স্বাদ। মিলন চৌধুরী একাধারে সৃজনশীল সংগঠক, নিরীক্ষাপ্রবণ নাট্যকার, ক্লান্তিহীন আড্ডারু। তাঁর এই তিনটি সত্তা চট্টগ্রামের নাট্যাঙ্গনের উন্মেষ ও বিকাশপর্বকে বিভিন্নভাবে উর্বর করেছে। নাটক, শিল্পসাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির নানা শাখায় সৃজন, চিন্তন, অনুশীলন এবং বিচরণের মধ্যদিয়ে তিনি পরিপূর্ণভাবে একটি নির্লোভ সমগ্রশিল্পীজীবন অতিবাহিত করেছেন। সত্তর ও আশির দশকে চট্টগ্রামের নাট্য ও শিল্পসাহিত্যের অঙ্গনে মিলন চৌধুরী ছিলেন অনুকরণের অবিকল্প আইকন। দেশবিদেশের সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর পরিস্রুত জ্ঞান চট্টগ্রামের তৎকালীন তরুণদের অত্যন্ত আগ্রহের বিষয় ছিল। সাহিত্যসংস্কৃতির আড্ডায় তিনি ছিলেন মধ্যমণি। তরুণরা তাঁর জ্ঞানের সংস্পর্শে পুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়েছে। তৎকালীন সাহিত্যসংস্কৃতিকর্মীদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়বিশ্বসাহিত্য ও সংগীত নিয়ে তিনি ক্লান্তিহীন কথা বলতে পারতেন। তাঁর স্মৃতি শক্তি ছিল বিষ্ময়করভাবে প্রখর। অজস্র বাংলা, উর্দু, হিন্দি গানের কথা ও সুর এবং গানের গীতিকার ও সুরকারের নাম তাঁর মুখস্থ ছিল। সেসব গেয়ে তিনি আড্ডা মাতিয়ে রাখতেন। প্রচল ভেঙ্গে নতুন স্বর নির্মাণে তিনি তরুণদের উৎসাহ দিতেন। নাটকসহ অন্যান্য শিল্প তিনি চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারতেন। তাঁর শিল্পবিশ্লেষণ ও মন্তব্য গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হতো সমকালীন শিল্পাঙ্গনে।

একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে মিলন চৌধুরী স্বাধীন বাংলা বেতারে, কলকাতার পথেপ্রান্তরে স্বাধীনতার স্বপক্ষে গান গেয়েছেন। ১৯৭২ সালে দেশে এসে তিনি গড়ে তোলেন গণসংগীত দল ‘বঙ্গশ্রী’। ১৯৭৩ সাল থেকে মিলন চৌধুরী নাট্যরচনা ও নাট্যচর্চার সাথে যুক্ত। এসময় তিনি রচনা করেন ‘কৃষ্ণচূড়া নদীর গান’ ‘নরক থেকে বলছি’। ১৯৭৫ সালে গণায়ন নাট্যসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে তিনি গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর রচিত ‘চর্যাপদের হরিণী’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে গণায়ন নাট্যাঙ্গনে অভিষিক্ত হয়। এদলের প্রথম তিনটি নাটকের তিনি নির্দেশক। ১৯৭৮ সালে তিনি গড়ে তোলেন নাট্যদল অঙ্গন থিয়েটার ইউনিট। এপর্যন্ত অঙ্গনের তেরটি নাটকে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। অদ্যাবধি তিনি এদলের সাথে যুক্ত আছেন সক্রিয়ভাবে। নাটকের বিচিত্র কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকলেও মিলন চৌধুরী মূলত নাট্যকার হিসাবে সমধিক পরিচিত। তাঁর রচিত নাটকের সংখ্যা বিশটিরও অধিক। প্রকাশিত নাটকের সংখ্যা সাতটি– ‘চর্যাপদের হরিণী’ ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ (‘কৃষ্ণচূড়া নদীর গান’) ‘একজন পিরামিড’ ‘আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা’ ‘নিবারণের স্বপ্নস্বদেশ’ ‘দায়ভার’ ‘দ্বিতীয় অধ্যায়’। সম্মিলিত প্রতিবাদপ্রতিরোধ চেতনা, সমাজের অসংগতি, ব্যক্তির স্খলন, মনোসংকট, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যবধানজনিত কারণে জনমনে ক্ষোভ ও হতাশা প্রভৃতি তাঁর নাটকের প্রধান উপজীব্য বিষয়। তাঁর প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থ– ‘নাট্যত্রিতয়’ (চর্যা প্রকাশনী, চট্টগ্রাম, ১৯৮৪), ‘আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা’ (চর্যা প্রকাশনী, চট্টগ্রাম, ১৯৮৪)। মিলন চৌধুরীর সাতটি নাটক নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে নাট্যসংকলন ‘নির্বাচিত নাটক’ (এ কে খান ফাউন্ডেশান, চট্টগ্রাম, ২০২৪)। অপ্রকাশিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো– ‘নরক থেকে বলছি’ ‘সম্পর্ক’ ‘নাটক ভাঙ্গার খেলা’ ‘দইজ্জার পুত’ ‘মহেশ’ (শরৎচন্দ্রের গল্প অবলম্বনে) প্রভৃতি।

১৯৭৬ সালে মিলন চৌধুরী পরিপূর্ণ নাট্যকার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। শুরুতেই তিনি নাট্যাঙ্গনে নিয়ে আসেন নাটকের নতুন রূপ ও রীতি। তাঁর নতুন নাট্যভাবনানাটকের রচনা এবং নির্দেশনায় বিশেষ ধরনসমকালীন নাট্যভাবুকদের নিবিড় দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এসময় পরপর মঞ্চস্থ হয় তাঁর দুটি নাটক– ‘চর্যাপদের হরিণী’ এবং ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’। নাটকগুলো রচনা ও মঞ্চায়নের সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের কাল। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর রাজনৈতিক পালাবদলের একালে নাট্যকারকে বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়েছে। এ জন্য তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছে রূপকসাংকেতিকতার। লক্ষ্য করা যায়এ সময়কালে রচিত মিলন চৌধুরীর দুটি নাটকই ক্ষুদ্রাকৃতির রূপকাশ্রিত নাটক। নাটকের আখ্যান বুননেও সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। দুটি নাটকেই সংগীত ও নৃত্যের ব্যবহার এবং রাজা, মন্ত্রী, বিদ্রোহী জনতার রূপকে অপশাসন এবং সম্মিলিত মানুষের রুখে দাঁড়ানোর চিত্র উঠে এসেছে।

১৯৭৬ সালে ১৬ জানুয়ারি মঞ্চস্থ হয় মিলন চৌধুরীর ‘চর্যাপদের হরিণী’। নাটকটি নাট্যকার নির্দেশিত। সমকালে প্রচলিত নাট্যপ্রয়োগরীতির বিপরীতে একটি নতুন মঞ্চনিরীক্ষা হিসাবে নাটকটি নাট্যাঙ্গনের গভীর অভিনিবেশ লাভ করে। এনাটকের আখ্যান বর্ণনা, চরিত্র নির্মাণ ও মঞ্চনির্দেশেও নাট্যকারের নিরীক্ষা মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়। পুরো নাটকে চরিত্রের আগমনে বা দৃশ্যের প্রারম্ভে যুক্ত হয়েছে নাট্যকারের বিশেষ নির্দেশনা। নাট্যকারের এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নাটকটির আখ্যান এবং চরিত্রের রূপকার্থ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এনাটকের চরিত্রগুলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিস্তরের প্রতিনিধি।

যায় দিন ফাগুনো দিন’ নাটকটি নাট্যকারের নির্দেশনায় ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালবেলায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা মোড়ে উন্মুক্ত মঞ্চায়ন করে গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়। প্রথমদিনেই নগরীর বিভিন্ন সড়কমোড়ে নাটকটির টানা ছয়টি প্রদর্শনী সম্পন্ন হয়। সেদিন এনাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাটকে যুক্ত হয় নতুন এক নাট্যাঙ্গিক ও মঞ্চায়নরীতি। এ রীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মঞ্চহীনতা। যেকোনো স্থানে, রাস্তায় বা মাঠেময়দানে, উন্মূক্ত প্রান্তরে এনাটক মঞ্চায়ন করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন নেই ব্যয়বহুল আয়োজন। আটপৌরে সংলাপ, সাদামাটা সাজ, বক্তব্যে পরিচিত আখ্যান ছিল ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ নাটকের প্রাণ। নাটকটি প্রদর্শনীর অব্যবহিত পর পথনাটক অভিধায় নাট্যাঙ্গিকটি পরিচিতি লাভ করে। স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে পথনাটকের সমৃদ্ধ ধারায় প্রথম স্রষ্টা হিসাবে নাট্যকার মিলন চৌধুরী এবং প্রথম পথনাটক ‘যায় দিন ফাগুনো দিন’ আমাদের গভীর অভিনিবেশ দাবি করে।

মিলন চৌধুরী তৃতীয় নাটক ‘একজন পিরামিড’এ এসে মনোযোগ দিয়েছেন ব্যক্তি মানুষের জীবনসংকটের দিকে। এনাটকের মধ্যদিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ নাটক লেখার সূত্রপাত। ‘একজন পিরামিড’ পর্বে এসে নাট্যকার আলোকসম্পাত করেছেন ব্যক্তির পারিবারিক জীবনে। ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগতে যে দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ বাস্তবতা বিরাজ করে, তার একটি রূপ প্রতিফলিত হয়েছে এনাটকটিতে।

বাংলাদেশের নিখিল নাট্যাঙ্গনে রাজধানী এবং এর বাইরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক আনুকূল্যহীনতা, নাট্যকর্মীর সংকট, দর্শকস্বল্পতা, নাট্যউপযোগী মঞ্চ ও মহড়াকক্ষের অভাবপ্রভৃতি প্রতিকূলতা, বাধাবিপত্তি মেনে নিয়ে ঢাকার বাইরে নাট্যকর্মীরা নাট্যচর্চায় অবিচল। ‘আভ্যন্তরীণ খেলাধুলা’য় নাটকনির্মাণকালীন এসব বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে। দর্শক মঞ্চে যে নাটক দেখে অভিভূত হয়নাটকের আখ্যানের সাথে নিজের জীবনকে মিলিয়ে আবেগাক্রান্ত হয়সে নাটক নির্মাণের পিছনে থাকে অজস্র বিরূপ বাস্তবতা। দর্শক সে বাস্তবতা কখনো দেখে না। দর্শক কেবল প্রদর্শিত নাটকের শিল্পরস উপভোগ করেন।

মিলন চৌধুরীর ‘দায়ভার’ গভীর জীবন ও মানবিক দায়বোধের নাটক। মনুষ্যত্বের বিকাশ ও মানবিক জীবনসাধনার জন্য উচ্চশিক্ষা, বিত্তবৈভব কিংবা সামাজিক প্রতিপত্তিকোনো কিছুর প্রয়োজন হয় না। মানুষ মূলত বড়ো হয় পরার্থপরতায়, মানবিকবোধে, হৃদয়ের ঐশ্বর্যগৌরবে। এটাই মানুষের মূল পরিচয় হওয়া দরকার। তেমনি এক মানবিক মনের অধিকারী ঐশ্বর্যবান এক মানবসন্তানকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে দায়ভারের আখ্যান ।

মিলন চৌধুরী নাটকের চরিত্র হিসাবে নিয়ে এসেছেন নাট্যকার, নির্দেশকসহ তরুণ নাট্যকর্মীদের। চরিত্রগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে লক্ষ্য করা যায়মিলন চৌধুরীর নাট্যভাবনা, নাটকের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও দায়বদ্ধতা এবং নাট্যাঙ্গনে তাঁর উৎসর্গীকৃত জীবনেরই প্রতিফলন রয়েছে চরিত্রগুলোতে। প্রতিটি চরিত্র যেন নাট্যকার মিলন চৌধুরীর নাট্যজীবনেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

মিলন চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাধীনতোত্তর নবনাট্যআন্দোলন তথা গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের উন্মেষপর্বের একজন প্রতিভাবান নাট্যকার। নাটকের সমূহ ক্ষেত্রে তাঁর মেধার প্রকাশ ঘটেছে। নিরন্তর নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে তিনি সমকালীন নাট্যাঙ্গনের বিরূপ বাস্তবতার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেছেন। বাধা অতিক্রম করার জন্য তিনি নাটকের স্বরসংলাপে যুক্ত করেছেন নতুন রূপ ও রীতি। রূপান্তর করেছেন নাটকের পরিবেশনা ভঙ্গি। বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে তিনি নয়ানাট্যসড়কের দ্রষ্টা। এখনো তিনি সক্রিয় নাট্যাঙ্গনেনাট্যাঙ্গনও সক্রিয় তাঁর প্রদর্শিত নাট্যসড়কে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, গবেষক, নাট্যজন

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমার সমুদ্রসত্তা
পরবর্তী নিবন্ধউত্তর মাদার্শা উচ্চ বিদ্যালয়ে পুরস্কার বিতরণ