মানুষের অস্তিত্ব কেবল দৃশ্যমান দেহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের ভেতরে রয়েছে এক অদৃশ্য আত্মা যার মূল উৎস নূর, যার প্রকৃতি ঊর্ধ্বমুখী, এবং যার চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নৈকট্য। সভ্যতার ইতিহাসে যত অগ্রগতি ঘটেছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে মানবজাতির প্রকৃত সংকট বস্তুগত নয়; বরং তা আত্মিক। এই আত্মিক সত্যের সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও গভীর প্রকাশ ঘটেছে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা ও মিরাজের ঘটনায় যা কেবল নবুয়তের এক অনন্য মুজিযা নয়, বরং মানব আত্মার সম্ভাবনা ও গন্তব্যের এক চিরন্তন ঘোষণা। মিরাজ আমাদের জানিয়ে দেয়, মানুষ কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় তার প্রত্যাবর্তন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইসরা ও মিরাজের ঘটনা গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ ধারণার প্রতিফলন পাওয়া যায়।
দুঃখের বছর ও উত্তরণের প্রস্তুতি : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মিরাজ সংঘটিত হয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়ের পরপরই। উম্মহাতুল মুমিনীন খাদিজা (রা.) এর ইন্তেকাল নবীজিকে ব্যক্তিগতভাবে ভেঙে দিয়েছিল। অভিভাবক ও রক্ষাকবচ দাদা আবু তালিব এর মৃত্যু সামাজিকভাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একা করে দিয়েছিল। তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে যে নির্যাতন ও অপমান তিনি সহ্য করেছিলেন, তা মানব ইতিহাসে এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়।
এই সময়টিকে সীরাতগ্রন্থগুলো আমুল হুযন দুঃখের বছর নামে চিহ্নিত করেছে। বাহ্যিক বিচারে এটি ছিল দুর্বলতা ও ব্যর্থতার সময়। কিন্তু আল্লাহর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় এই দুঃখই ছিল আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যম, এই কষ্টই ছিল সম্মানের প্রস্তুতি। যা আল্লাহ পাকের সাথে মিরাজের ( সাক্ষাতের ) মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হয়।
মিরাজ আমাদের শেখায় আল্লাহ যাকে উচ্চ মর্যাদা দিতে চান, তার আত্মাকে তিনি আগে পরীক্ষার আগুনে পরিশুদ্ধ করেন।
সিদরাতুল মুনতাহা সেই সীমারেখা, যেখানে সৃষ্টি শেষ হয়। সেখানে পৌঁছে জিবরাইল (আ.) থেমে যান। ফেরেশতার জন্যও যার পরে অগ্রসর হওয়ার অনুমতি নেই, সেখানে আল্লাহর হাবিব এগিয়ে যান। এই দৃশ্য মানবজাতির জন্য এক গভীর তৎপর্যময় যে মানুষ, যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণে পূর্ণ হয়, তবে সে মর্যাদায় ফেরেশতাকেও অতিক্রম করতে পারে।
আর এ আত্মসমর্পণের পদ্ধতির শিক্ষার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মিরাজের রাতের সবচেয়ে বিস্ময়কর উপহার হলো সালাত। আল্লাহর নির্দেশিত সালাত আদায় কোনো সাধারণ ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর সাথে সরাসরি সংযোগের ভাষা। সালাত আদায়ের পদ্ধতিতে প্রতিটি তাকবির যেন এক ধাপ ঊর্ধ্বে ওঠা, প্রতিটি সিজদা যেন আত্মার সর্বোচ্চ বিনয়।
মানবজাতির জন্য যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এ সালাত যা জমিনে পালন করা ফরজ হয়েছে, আর পালনের হুকুম নির্ধারিত হয়েছে আসমানে। এই বাস্তবতা সালাতের মর্যাদা ও তাৎপর্যকে স্পষ্ট করে দেয়। সালাত কেবল কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক ভঙ্গির সমষ্টি নয়; এটি আত্মার আল্লাহমুখী সংলাপ। তাকবিরের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার সমস্ত ভার নামিয়ে রাখে, কিরআতের মাধ্যমে সে তার রবের সাথে কথা বলে, আর সিজদার মাধ্যমে আত্মা তার সর্বোচ্চ বিনয় প্রকাশ করে। এই কারণেই সালাতকে বলা হয় মুমিনের মিরাজ।
আধুনিক সভ্যতা ও আত্মিক সংকট : আজকের মানুষ প্রযুক্তির শিখরে পৌঁছেছে। সে মহাকাশ জয় করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে, সভ্যতার গতি বহুগুণ বাড়িয়েছে। অথচ একই সঙ্গে সে আত্মিকভাবে হয়ে পড়েছে শূন্য, ক্লান্ত ও বিচ্ছিন্ন। উদ্বেগ, অবসাদ ও অর্থহীনতার অনুভূতি আজ বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। তার বুক যখন ভরা শূন্যতা, তার চোখ যখন ভরা ক্লান্তি, সালাতই সেই একমাত্র আশ্রয়, যেখানে আত্মা বলে উঠতে পারে -‘হে রব, আমি ফিরে এসেছি।’
ক্লান্ত সভ্যতার জন্য মিরাজের বার্তা হচ্ছে ‘আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে আলো বেশি কিন্তু দিশা কম। শব্দ আছে, কিন্তু নীরবতা নেই; তথ্য আছে, কিন্তু তাসবিহ নেই’।
এই বাস্তবতায় মিরাজ আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় উন্নতি মানে কেবল বাহ্যিক অগ্রগতি নয়; বরং আত্মিক ভারসাম্য। সম্মান মানে কেবল ক্ষমতা নয়; বরং আল্লাহর কাছে বিনয়। শান্তি আসে অর্জনের মাধ্যমে নয়; বরং তা আসে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।
মিরাজ হচ্ছে আত্মার প্রতি এক নীরব আহ্বান। মিরাজ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এটি কোনো অতীতের কাহিনি নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য এক জীবন্ত আহ্বান। এটি ডাকছে তাদের যারা বাহ্যিকভাবে সফল, কিন্তু ভেতরে শূন্য; যারা ব্যস্ত, কিন্তু শান্ত নয়; যারা আলোয় ঘেরা, কিন্তু দিশাহীন। এই আহ্বান উচ্চৈঃস্বরে নয়। এটি নীরব, গভীর এবং ব্যক্তিগত ফিরে এসো। আসমানের দরজা এখনো খোলা। আত্মা যতক্ষণ আল্লাহকে খুঁজে না পায়, ততক্ষণ কোনো অর্জনই তাকে শান্তি দিতে পারে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের সেই মহিমান্বিত সফর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবীতে থেকেও আসমানের সাথে সম্পর্ক রাখা সম্ভব, আর সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বাস্তব ও স্থায়ী রূপ হলো সালাত। এই সত্যটিকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ভাষায় ঘোষণা করেছেন-‘বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়।’ (সহিহ মুসলিম) এই হাদিস যেন মিরাজের সারকথা। যেখানে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টির সীমা অতিক্রম করে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছেছিলেন, সেখানে উম্মতকে দেওয়া হয়েছে এক সহজ কিন্তু গভীর পথ সিজদা। আকাশে উঠে নয়, বরং মাটিতে নত হয়েই মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে কাছে পৌঁছে যায়।
আমাদের প্রার্থনা– হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে দুনিয়ার ভার থেকে মুক্ত করো। আমাদের ইবাদতকে অভ্যাস নয়, উপলব্ধি বানাও। আমাদের সিজদাকে দায়িত্ব নয়, আশ্রয় বানাও। আমাদের এমন হৃদয় দাও, যা তোমার দিকে ফিরে আস্তেবারবার, বিনয়ে। আমাদের জীবনকে করো তোমার সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত, আর আমাদের মৃত্যুকে করো তোমার সাক্ষাতের সুসংবাদ।
লেখক: প্রাবন্ধিক।












