মা হোক প্রকৃতির মতো

সুবর্ণা বড়ুয়া | সোমবার , ৩ নভেম্বর, ২০২৫ at ৮:২৯ পূর্বাহ্ণ

ডিসেম্বর মাস। চূড়ান্ত প্রান্তিক মূল্যায়ন শেষ, তাই স্কুলে শিক্ষার্থীদের আনাগোনা একেবারেই কম বললেই চলে। শিক্ষকরা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন নিয়ে তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছে বলা যেতে পারে। রেজাল্ট সিট তৈরি করা, নতুন শ্রেণিতে উন্নিত শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরী, বই বিতরণ রেজিস্ট্রার তৈরি এসব নিয়েই ব্যস্ত আমরা। যথারীতি অন্যান্য দিনের মতোই বাইরে পায়চারি করছিলাম। আমি প্রকৃতি প্রেমি তাই প্রকৃতি আমাকে টানে, আনমনে তাকিয়ে থাকি অনন্তের দিকে। সবুজ গালিচার মতো দেখাচ্ছিলো ধানিজমিগুলো। স্কুলের মাঠের মাঝখানটায় শিশুগাছটি যেন মায়ের মতো মমতাময় ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছে আমাদের এই বিদ্যালয়টিকে। মেঠোপথের দুধারে সারি সারি ভেষজ গাছের পাতাগুলোতে বাতাসের দোল খাওয়া দেখতে আমার চমৎকার লাগে। স্কুল ভবনের সাথে লাগোয়া বাগানবিলাসের সৌন্দর্য টাও আমাকে আপ্লূত করে রাখে সারাক্ষণ। থোকা থোকা টগর আর জবা ফুলে রঙিন প্রজাতির নেচে নেচে ঘুরে বেড়ানোও অলৌকিক এক মায়াময় দৃশ্যের অবতারণা করে। গোটা পৃথিবীর সৌন্দর্যটা আমাকে যেন বিভোর করে রাখে। হঠাৎ অনুভব করলাম, ছোট্ট দুটো হাত আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে রেখেছে। আমি আঁতকে উঠলাম। পেছন ফিরে দেখলাম মায়াভরা একটা মুখ। ছল ছল চোখে বলল, ‘আম্মু তুমি আসো না কেন বাড়িতে?’ বলেই আবারো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো। আমি কিছু বুঝে ওটার আগেই শিশুটিকে জড়িয়ে ধরলাম বুকে। তারপর শিশুটিকে আদর করে শান্ত করলাম, চোখের নোনাজল আমার ওড়না দিয়ে মুছিয়ে দিলাম। তাকে এটাওটা বলে শান্ত্বনা দিলাম। বললাম, ‘আমি তোমার বাড়ি যাবো’। ছেলেটির সাথে আসা ফুফুটি আমাকে ইশারায় কাছে ডাকলো। আমি কাছে যেতেই আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘মেডাম, কিছু মনে করবেন না, আরাফাতের মা দেখতে অনেকটা আপনার মতোই, অনেক সুন্দরী! সে আপনাকে ওর হারিয়ে যাওয়া আম্মু ভেবে ফেলেছে।’ আমি অস্ফুটে বললাম ‘হারিয়ে গেছে মানে?’ আরাফাতের ফুফু বলল, ‘আরাফাতের আব্বু বিদেশে থাকে, এই সুযোগে এক যুবকের সাথে আরাফাতের আম্মুর সম্পর্ক গড়ে উঠে। একদিন হঠাৎ এই ছোট্ট আরাফাতকে ফেলে তার আম্মু ঐ যুবকের সাথে পালিয়ে যায়।’ এই কথাটা শুনে আমার বুকের যেন একটা অদৃশ্য আঁচড় অনুভব করলাম। এতো সুন্দর ফুটফুটে মায়াবী ছেলেকে ফেলে ‘মা’টি চলে যেতে পারলো কী করে? জীবন খুবই বিচিত্র, নাটকের চেয়েও নাটকীয়! এইবার কথাটা আমার কাছে খাঁটি সত্য হয়ে ধরা দিলো। শিশুটি মায়ের মুখটি কখনো ভুলতে পারবে? সে যখন বড় হবে কোন নারীর প্রতি তার সম্মান আর শ্রদ্ধা বোধটুকু আর থাকবে? সমাজে স্বাভাবিক ভাবে তার বেড়ে ওঠাটা কি স্বাভাবিক গতি পাবে? লোকের কটাক্ষ আর মায়ের ফেলে যাওয়াটা কি তার জীবনে রেখাপাত করবে না? এইরকম অনেক প্রশ্নই উঁকি দিচ্ছিল আমার মনে। সেই দিনের ছোট্ট আরাফাত এখন আমার স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে এখন বড় হচ্ছে তার সৎ মায়ের কাছে। আরাফাতের ভুল করে আমাকে আম্মু ডাকটি আমার স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল করে করে তার চোখের জলের মতোই। আমি আর আমার সকল সহকর্মীরা তাকে ভালোবাসে আদর করে, খবরাখবর নেয়। আরাফাত তার হারিয়ে যাওয়া মায়ের মমতা না পেলেও একজন ভালো মনের মানুষ হোক, আলোকিত মানুষ হোক, এই শুভকামনা সবসময়ই থাকবে। এইরকম আরও কত আরাফাত যে আমাদের সমাজে আছে তার কোন হিসেবও নেই। তবে মা হয়ে অনুভব করি, প্রতিটি মা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুন্দর ভবিষ্যৎ এর কথা ভাবলে মনে হয় আমাদের সমাজ মা জাতির প্রতি আঙুল তুলতে দ্বিধাবোধ করতো! জয় হোক মায়ের মমতার! মা হোক প্রকৃতির মতো শুদ্ধ আর পরিপাটি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমধ্যবিত্তরা আজ চরম দুর্ভোগে
পরবর্তী নিবন্ধসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি : লটারি নাকি ভর্তি পরীক্ষা?