‘মা’ একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ এই শব্দের ভেতরেই নিহিত আছে মানব সভ্যতার সবচেয়ে গভীর অনুভব ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। মায়ের ত্যাগ, শ্রম ও আত্মবিসর্জনের কোনো পরিমাপ নেই, কোনো প্রতিদানও নেই। গর্ভধারণের প্রথম মুহূর্ত থেকেই মা নিজের সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের নিরাপত্তা ও সুস্থতার কথা ভাবেন। তখনো তিনি জানেন না তাঁর গর্ভে বেড়ে ওঠা সন্তানটি কেমন হবে, তবু প্রকৃতির নিয়মে ও মমতার টানে নয় মাস ধরে আগলে রাখেন এক অনাগত জীবনের স্বপ্ন।
ভ্রূণ থেকে সারাজীবন মা সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন অবিচ্ছিন্নভাবে। এমন শুভ কামনার কোনো শর্ত নেয়, কোনো প্রত্যাশারও নেয় শুধু মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা। মায়ের মন চাই, তাঁর প্রতিটি সন্তান ফুলে ফলে সুশোভিত সুখী, সমৃদ্ধ, আনন্দময় জীবনের অধিকারী হোক। জ্ঞানে গুণে আলোকিত হোক।
তাই মায়ের মৃত্যু কেবল একজন অভিভাবককে হারানো নয়, এটি এক জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষকে হারানোর নিদারুণ কষ্ট। যিনি প্রাণের চেয়েও প্রিয়, যাঁর সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো সম্পর্কের তুলনা চলে না, তাঁকে হারানোর বিরহ ব্যথা সন্তানের হৃদয়ে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
সন্তানের ভালো–মন্দ সবার আগে যিনি অনুভব করেন, তিনি একমাত্র মা। মা প্রতিটি মানুষের জীবনে এক অমূল্য আশীর্বাদ। অথচ বাস্তবতা হল, ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা’ আমরা অনেকেই বুঝি না। কর্মব্যস্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা, তথাকথিত নাগরিক সভ্যতা ও অতি আধুনিকতায় মাতাপিতার প্রতি দায়িত্ববোধ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। অথচ যাঁদের মা জীবিত আছেন, তাঁদের কাছে মা শুধু জন্মদাত্রী নন, তিনি এক জীবন্ত স্রষ্টা। তাঁর সেবাযত্ন ও শুশ্রূষা করা কোনো করুণা নয়, এটি নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। প্রতিটি ধর্ম ও দর্শনেই মাতাপিতার সেবাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। ইসলামে বলা হয়েছে, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। সনাতন ধর্মে মাতাপিতার সেবাকে ব্রহ্মসাধনার সমতুল্য বলা হয়েছে। বৌদ্ধ দর্শনে কৃতজ্ঞতা প্রসূত মাতাপিতার স্থান সর্বাগ্রে। এই শিক্ষাগুলো কেবল ধর্মীয় বাণী নয়, এগুলো মানবসভ্যতার মৌলিক নীতিনৈতিকতার প্রধান ভিত্তি।
মাকে হারানোর এক বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ, মায়াময় উপস্থিতি আজও ভুলতে পাচ্ছি না। পরিবার ও প্রিয়জনদের মাঝে থেকেও মনে হয়, হৃদয়ের গভীরে এক গভীর শূন্যতা। মায়ের শাড়ির আঁচল, শরীরের গন্ধ, সেই উষ্ণ আশ্রয় সবকিছুর স্মৃতি ক্ষণে ক্ষণে হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে তোলে।
‘মা’ শব্দের গভীরতা হয়তো যথাযথভাবে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়, একমাত্র অনুভবে উপলব্ধি করা যায়। তবু জীবনের চরম অভিজ্ঞতায় পরম সত্য ‘মা ছাড়া জীবনের সব স্বাদ অপূর্ণ’। তাই এই লেখার মাধ্যমে শুধু মমতাময়ী মাতৃদেবীকে স্মরণ করছি না, যে সকল মায়েরা জীবিত আছেন তাঁদের প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসাসহ সেবাযত্ন ও শুশ্রূষার যেন কমতি না হয়। মাথার উপর আশীর্বাদের ছায়াটা যেন সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকে সেই বিনীত আহবান করছি। বিশ্বের সকল মায়ের প্রতি সকৃতজ্ঞ হৃদয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা। রবী ঠাকুরের গানের কথায় শেষ করছি, ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে– জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়ে বক্ষে ধরিব জড়ায়ে’।












