মায়ের সাথে লন্ড্রীতে কাজ করেও স্কুলে পড়ছে শিশু জীবন দাস

কাজী মোশাররফ হোসেন, কাপ্তাই | রবিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

ছবির এই শিশুটির নাম জীবন দাস। বয়স ১৩। চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজারের টিউলিপ স্কুলের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র। ৩ বছর আগে তার বাবার রুপম দাশের মৃত্যু হয়। জীবনের মায়ের নাম রিনা দাস। স্থানীয় মহাজন বটতল পাড়ায় তাদের বাড়ি। শিশু জীবনের মা রিনা দাসকে ৩ বছর আগে কখনো বাড়ির বাইরে যেতে হয়নি। জীবন দশের বাবা দোভাষী বাজারে একটি লন্ড্রী দিয়েছিলেন। আদরের সন্তানের নামানুসারে লন্ড্রীর নাম রাখেন ‘জীবন লন্ড্রী’। জীবন তাদের একমাত্র সন্তান। তাই ছোট খাট কাজ করে যা আয় হতো তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে যেত। রুপম দাস ও রিনা দাসের ইচ্ছা ছিল জীবনকে লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করবেন। জীবন মানুষ হলে তাদের এই কষ্টের জীবনে হয়ত সুখ শান্তি ফিরে আসবে।

কিন্তু বিধি বাম। ৩ বছর আগে জীবন দাশের বাবা মৃত্যুতে জীবন লন্ড্রী বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় সংসারে টানা পোড়েন। বেড়ে যায় দুঃখ দুর্দশা। উপায় না দেখে মা রিনা দাস জীবন লন্ড্রীর হাল ধরেন। কাপড় স্ত্রী করার অভিজ্ঞতা না থাকলেও বেঁচে থাকার প্রয়োজনে লন্ড্রীর কাজ শিখে নেন তিনি। রিনা দাস প্রতিদিন জীবন লন্ড্রীতে কাপড় আয়রনের কাজ করেন। কাপড় আয়রন করে যা আয় হয় তা দিয়ে মা ছেলেন জীবন কোন মতে চলে যাচ্ছে। অনেক কষ্টের মধ্যে থেকেও রিনা দাস পুত্র জীবন দাসের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেননি। মহাজন পাড়া থেকে ছেলেকে নিয়ে প্রতিদিন পায়ে হেঁটে দোভাষী বাজারের তাঁর কর্মস্থল জীবন লন্ড্রীতে আসেন। সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাঁর লন্ড্রীতে সময় কাটে। পুত্র জীবন প্রয়োজনীয় পাঠ্য বই নিয়ে মায়ের সাথে লন্ড্রীতে আসে। সেখান থেকে প্রতিদিন টিউলিপ স্কুলে যায়। স্কুল শেষে আবার লন্ড্রীতে ফিরে আসে। মায়ের সাথে কাপড় আয়রণের কাজও শিখে নেয় জীবন দাস। অবসর সময় লন্ড্রীতে বসেই জীবন লেখা পড়া করে। কাপড় আয়রনের পাশাপাশি লন্ড্রীর ছোট্ট একটি কোনে রান্না করা হয়। মা আর পুত্র লন্ড্রীতে বসেই খাবার খান। মা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে জীবন কাপড় আয়রন করে। মাকে সহযোগিতা করে।

রাত ৯টার পর লন্ড্রীর ঝাঁপ ফেলে মহাজন পাড়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন মা এবং পুত্র। বাড়ি গিয়ে মা রাতের রান্নার কাজে বসেন। জীবন লেখাপড়া করে। এভাবে গত ৩ বছর ধরে রিনা দাস এবং জীবন দাসের সংসার চলছে। জীবন যে লন্ড্রীতে কাজ করে এটা তার স্কুলের সহপাঠি ও বন্ধুরা সবাই জানে। এই কাজ নিয়ে জীবনের মনে কোন আক্ষেপ নেই। লন্ড্রীর কাজ নিয়ে বন্ধুরাও কখনো কটাক্ষ করেনা।

রিনা দাস বলেন, লন্ড্রীর কাজে বলারমত ইনকাম নেই। যা আয় হয় তা থেকে দোকান ভাড়া বাবদ মাসে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। অবশিষ্ট আয়ে দুইজনের কোনমতে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন শত কষ্টের মধ্যেও জীবনের লেখাপড়া বন্ধ হতে দেবনা। পুত্র জীবনই একদিন হয়তো তাঁদের জীবন যাপন পাল্টে দেবে বলে মনে করেন মা রিনা দাস।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকালুরঘাট সেতুর দ্রুত বাস্তবায়ন, এলাকার সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার আহ্বান
পরবর্তী নিবন্ধচট্টগ্রাম লায়ন্স ফাউন্ডেশনের ৫৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা