ধরুন সকালে ঘুম ভাঙ্গা থেকে আরম্ভ করে ঘুমুতে যাবার সময় পর্যন্ত, এবং পুরো ঘুমের সময়টাতেও আপনি অনুভব করলেন কেউ আপনার পেছনে লেজের মতন করে একটা দড়ি লাগিয়ে দিলো!
আপনি ঘুম থেকে উঠে অনিয়ন্ত্রিত বেগ নিয়ে শৌচাগারে গেলেন, আপনার দড়িতে টান পড়লো। আপনি তড়িঘড়ি করে দায়সারাভাবে শৌচাগার ব্যবহার করে বের হয়ে আসতে বাধ্য হলেন, আবার স্নানেও সেই একই দশা হলো; গতরে দু‘ফোঁটা পানি ঢালবার আগেই দড়ি ধরে টান পড়লো আপনার! কেবল তাই‘ই নয়, প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে আপনি খুব আয়েশ করে খেতে বসলেন, অমনি আপনার দড়িতে টান পড়ে গেলো, কোনোক্রমে নাকে–মুখে দু‘মুঠো গুজেই দৌড়াতে হবে আপনাকে! তেমনই একটু নিজের পছন্দের কাজটা করতে বসলেন, বইটা পড়তে চাইলেন, কফির মগ হাতে বসন্তের বাতাসে বারান্দায় দাঁড়ালেন, প্রিয় বন্ধুর সাথে বহুদিন পর ফোনালাপে মজলেন; তৎক্ষণাৎ কোমরের দড়িতে টান পড়লো আপনার। এখানেই শেষ নয়, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে আপনি ঘুমুতে গেলেন, চোখ লেগে আসার দেড় থেকে দু‘ঘণ্টার মধ্যেই আপনার দড়িতে টান পড়লো! এভাবেই চললো সারারাত, আপনি ঘুমালেও আপনার মস্তিষ্ক ঠিকই সজাগ থাকলো, কারণ যেকোনো সময় আপনার কোমরের দড়িতে টান পরতে পারে!
এরকম একটা জীবনের কথা ভাবাই যায় না, তাই না?
যেখানে নিজের সময়, নিজের জগৎ, নিজের জীবন আর জীবনের দু‘দণ্ড স্বস্তি বলতে কিচ্ছু নেই ! অথচ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া অন্তর একজন মা‘কে বছরের পর বছর, তার প্রতিটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত ঠিক এভাবেই কাটাতে হয় ! একটা অদৃশ্য দড়ির মতন সন্তান তার মা‘কে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রাখে! মায়ের নিজের বলতে তখন আর কিছুই থাকে না! এমনকি একজন সদ্যোজাত সন্তানের মা নিজ শরীরের স্বত্বাধিকারও হারিয়ে ফেলেন!
আমরা যখন একজন মায়ের ত্যাগের কথা লিখি, কিংবা মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি; তখন মা আমাদের জন্যে ঠিক কতটা কায়িক শ্রম করেছেন, শারীরিকভাবে কতটা খেটেছেন, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেটাই বলি বারবার ! কারণ, একজন মায়েরও যে একটা মানসিক চাহিদা থাকতে পারে, আর সেটা অনায়াসে এতটাই নীরবে তিনি ত্যাগ করেন যে সেই বিষয়টি বরাবরই সকলের অবচেতনেই থেকে যায়! একজন মায়ের ত্যাগ কেবলই রান্না করা আর পছন্দের খাবার নিজে না খেয়ে সন্তানের পাতে তুলে দেয়া নয় কিন্তু! একজন নারী যখন জানতে পারেন তিনি মা হতে চলেছেন, তখন অনাগত সন্তানের কথা ভেবে এবং যখন তিনি মা হোন, তখন দুগ্ধ পান করা সন্তানের সুস্বাস্থ্যের স্বার্থে তার একান্ত পছন্দের বহু খাবার তাকে ত্যাগ করতে হয়! শারীরিক নানাবিধ পরিবর্তনের জন্য তার পছন্দের পোশাক পরা থেকেও বিরত হতে বাধ্য হোন তিনি।
যেই মা বই পড়তে ভালোবাসতেন, যেই মা ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন, কিংবা অবসরটা অন্য কোনো শখের কাজ করে কাটাতেন; মা হওয়া মাত্রই শখগুলো যেন সব তালাবদ্ধ করে আলমারিতে তুলে রাখা হয়! বেশিরভাগ মায়েদের ক্ষেত্রে তালাবদ্ধ সেই আলমারি তাঁর পুরো জীবদ্দশায় আর খোলাই হয় না!
এই যে মুহূর্তেই নিজের মানসিক চাহিদাগুলোকে বিদায় জানিয়ে সন্তানের জন্য আপাদমস্তক একজন যান্ত্রিক মানুষে রূপান্তিত হওয়ার মাধ্যমে একজন মা যেই ত্যাগ স্বীকার করেন, মায়েদের সেই ত্যাগের কথা বরাবরই ঊহ্যই থেকে যায় !
এ কারণে তীব্র সচেতনতা কিংবা কখনো–সখনো দয়াপরবশত মায়েদের ‘শারীরিক যত্নের‘ বিষয়ে খানিকটা আন্তরিক হওয়ার উদ্যোগ নিলেও, মায়েদের ‘মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের‘ বিষয়টি বরাবরই অবহেলিতই রয়ে যায়।
তাই সদ্যোজাত সন্তানের মা থেকে বয়োবৃদ্ধ মা; প্রতিটি মায়ের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া একান্ত জরুরি! ব্যক্তি পর্যায় হতে জাতীয় পর্যায়; সকল ক্ষেত্রেই মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন ও আন্তরিক দৃষ্টিপাত প্রয়োজন।










