মায়া নিকেতন

সুসেন কান্তি দাশ | বুধবার , ২ আগস্ট, ২০২৩ at ৬:২৬ পূর্বাহ্ণ

বিড়াল ছানার মিউ মিউ একটানা সুর ভেসে আসে। তখন গভীর রাত। জেনি মাকে ডেকে তুললো। কী’রে, এতো রাতে ঘুম ভাঙালি কেনো? জবাবে সে কোমল কণ্ঠে বললো, বিড়াল ছানার সুর বেদনায় ভরে উঠেছে, চলোনা, বাইরে গিয়ে দেখে আসি।

মা বেড সুইচ অন করলো। ধীরে জানালা খুললেন। আকাশে চোখ রেখে চাঁদ তারা দেখা যায় না। এ সময় গুঢ়ুম করে মেঘ কেঁপে উঠলো।

: মা, জানালায় চোখ রেখে দেখো, বিড়াল ছানা কোথায়?

: বাইরে ঘন অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না, তবে বাড়ির খুব কাছাকাছি মনে হয়।

: মা, দু’এক ফোঁটা করে বৃষ্টি পড়ছে, চলো না, মা দেখে আসি!

: তবে চল, টর্চটা হাতে নে।

দরজা খুলে বাইরে বেরোলো মা ও মেয়ে। বাইরে আলো নেই। টর্চের আলো জ্বালিয়ে তারা বেরোতে যাবে। এ সময় চোখ পড়ে বাইরে চালার নিচে। একটি কালো রঙের মা বিড়াল একটি ছোট্ট বিড়াল ছানাকে মুখে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেনি সেদিকে হাত উঁচিয়ে বললো, ওই দেখো মা! মা টর্চের আলো সেদিকে রাখতেই কালো বিড়াল মুখ থেকে ছানাকে রেখে মেয়াঁ, মেয়াঁও বলে দুবার ডেকে আবার ছানাটি মুখে তুলে নেয়। বিড়াল ছানার চোখ দুটি বন্ধ। সেই আগের মতো করে একটা মিউ মিউ সুরে ডেকে চলেছে। জেনি কালো বিড়ালের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করলো। মাকে বললো, মা, কালো বিড়াল বলছে, তার শিশু খুব অসুস্থ। তার সেবা দরকার। মা দেখে, বিড়াল ছানার বয়স বড়জোর দুই সপ্তাহ হবে।

: মা, চলো, এদের মায়া নিকেতনে নিয়ে যাই।

: চল্‌ তবে।

জেনি স্নেহমাখা কণ্ঠে কালো বিড়ালকে বলে, “আয়! আয় আমার পিছু পিছু আয়, কালো বিড়াল বিড়াল ছানাকে মুখে চেপে ভালোভাবে হাঁটতে পারছে না। জেনি কাছে গিয়ে এদের দুহাতে বুকে টেনে নেয়। কালো বিড়াল পরম নির্ভরতায় জেনির বুকে মাথা রাখে।

জেনিদের বাড়ির কাছেই বাগানবাড়ি। তার একপাশে টিনের ঘেরা ছনের ছাউনি আবৃত একটি বড় ঘর। ঘরের সামনে বড় করে লেখা আছে “মায়া নিকেতন”। ঘরে টোকা দিতেই একজন মাঝবয়সী লোক চোখ মুছতে মুছতে দরজা খুলে দেয়। এসময় বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়।

: হরিকাকা, আমাদের মায়ানিকেতনে দুজন অতিথি এসেছে এদের খেতে দাও! আর সেবা যত্ন করো। কালো বিড়াল ও বিড়াল ছানাকে দেখিয়ে জেনি বললো।

: আজ্ঞে, ঠিক আছে, আমি এদের জন্য দুধ গরম করে নিয়ে আসছি:-বলে মাঝবয়সী লোকটি ভেতরের রুমে দুধ আনতে গেলো।

এসময় ভেতর কক্ষে কয়েকটি কুকুর মৃদু স্বরে ঘেউ ঘেউ করে উঠে। জেনি এদের উদ্দেশ্যে বললো, মিঠু, কালো, বনু তোমরা এখনো ঘুমাও নি কেনো, তাড়াতাড়ি ঘুমাও বলছি।

জেনির কথা শুনে কুকুরগুলি থেমে গেলো। এরা জেনিকে খুব ভালোবাসে। তার আদেশ মেনে চলে। যেমন করে মায়ের আদেশ মান্য করে তার সন্তানরা, ঠিক তেমনি।

হরিকাকা দুটি পৃথক বাটিতে দুধ নিয়ে এলো। কালো বিড়াল ছুটে এসে চুক চুক করে কিছুটা দুধ খেলো। বিড়াল ছানা খেলোনা, কালো বিড়াল এগিয়ে গিয়ে তার ছানাকে নিয়ে এলো। জেনি শিশুদের দুধ খাবার একটি বাট এনে তাতে দুধ নিয়ে ছানাকে খেতে দেয়। ছানাটি এবার একটু একটু করে দুধ খেতে থাকে।

জেনি পথের পাশের অবুঝ প্রাণীদের খুব ভালোবাসে। প্রতিদিন ব্যাগে করে কুকুরদের জন্য খাবার রাখে। পথে যেনো ক্ষুধার্ত কুকুরকে দেখতে পেলে খেতে দেয়। শুধু কুকুর নয়, বাগানে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি ডানা ভেঙে পড়ে গেলে জেনি তাকে তুলে আনে। সাধ্যমতো সেবা দেয়। তার এমন কাজকে উৎসাহিত করে তার মা।

বাগানবাড়িতে ঘুরে বাতাসে ঝরে পড়া পাখির বাসা থেকে কখনো ছানাকেও তুলে আনে জেনি। অনেক মমতায় এদের সেবা যত্ন করে। তবে সুস্থ হয়ে উঠলে আবার ছেড়ে দেয়।

পাখিরা সুস্থভাবে উড়ে যেতে দেখে জেনি খুব আনন্দ পায়। পথের পাশের কুকুরগুলিকে দুমুঠো খেতে দেখলে জেনির মন ভরে উঠে।

বনের পাখি শিকারিদের জেনি মোটেও পছন্দ করে না। পাখিদেরও স্বাধীনতা থাকবে, অবুঝ পশুদেরও অবাধে ঘুরে বেড়ানোতে কোনো বাধা থাকবে নাএটাই জেনির চাওয়া। এটাই জেনির ভালোলাগা।

জেনিদের বাড়ির কাছে বিদ্যালয়। প্রতিদিন ভোরের বেলা ঘণ্টা শুনে জেনি স্কুলে যায়। ক্লাস শেষে ঘরে ফিরে। হাত মুখ ধুয়ে মায়া নিকেতনে ফিরে আসে।

মায়া নিকেতনের অবুঝ প্রাণীরা জেনির ফেরার অপেক্ষায় থাকে। এরমধ্যে হরিকাকা এখানকার প্রাণীদের গোসল করিয়ে দেয়। খাবার খেতে দেয়। প্রতিদিন বিকেল বেলা গঞ্জ থেকে একজন পল্লী ডাক্তার আসে। এদের চিকিৎসা দেয়। মূলতঃ এই মায়া নিকেতন অসুস্থ পশুদের সেবার জন্য গড়া। রোগ সেরে গেলে এদের বনে ছেড়ে দেয়া হয়।

একদিন সন্ধ্যা বেলা। ঝড় আর বৃষ্টির ধারায় জেনির মায়া নিকেতন কেঁপে ওঠে। চালে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে। টিনের বেড়া দুমড়ে মুচড়ে পড়ে। হরিকাকা আর জেনির চিৎকার বেশিদূর পৌঁছায় না। ভেতরে কুকুরবিড়ালখরগোশ লাফিয়ে, নিজের মতো চিৎকার করে চলেছে। বাইরে জল জমে গেছে। অবুঝ প্রাণীদের দুরবস্থার কথা ভেবে জেনি বাইরে এসে সশব্দে প্রতিবেশিদের সহায়তা কামনা করে। এ সময় ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে গ্রামবাসী এগিয়ে এলো।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজাতির জনক
পরবর্তী নিবন্ধঅনন্য শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি