কিশোর কবিতায় শিশু–কিশোরদের মনোজগৎ, তাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নময় জগতকে ফুটিয়ে তোলা হয়। চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা ও তার সৌন্দর্য তুলে ধরারও চেষ্টা থাকে লেখকের এবং সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় শিক্ষামূলক বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়, যাতে শিশুরা সহজেই শিখতে পারে। আবার দেখা যায় দেশ ও জাতির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং ইতিহাস নিয়েও কিশোর কবিতা রচনা করা হয়। তার সাথে যুক্ত হয় দেশের মুক্তি সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন এবং জনগণের অধিকারের মতো বিষয়গুলো। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী– তিনি শিশু–কিশোরদের ভাবনাকে কবিতার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসেন এবং তার আগেকার সাহিত্যে শিক্ষামূলক দিকের উপর বেশি জোর দেওয়া হতো।
আজ এমন একটি কিশোর কবিতার বই ‘স্বপ্নে আঁকা কিশোরবেলার দিন’–এর কবিতাগুলো নিয়ে লেখকের ভাবনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
চমৎকার শিরোনাম এবং অসাধারণ প্রচ্ছদ সম্বলিত এই বইটির লেখক মারজিয়া খানম সিদ্দিকা। উল্লেখ্য এটি তাঁর দ্বিতীয় কিশোর কবিতাগ্রন্থ। পাশাপাশি তাঁর রয়েছে কবিতা এবং গল্পের বই।
‘স্বপ্নে আঁকা কিশোরবেলার দিন’ বইটিতে মোট ২০ টি কিশোর কবিতা স্থান করে নিয়েছে। প্রথম কবিতায় ফুটে উঠেছে কিশোরী মেঘ বালিকার স্বপ্ন জগতে হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে।
‘মেঘবালিকা হাওয়ায় ভেসে চলে অচিন পুরে / এখান থেকে ওখানে যায় নিত্য নতুন সুরে….’। আবার শেষ অংশে লিখেছেন – ‘উদাস মনে ছবি আঁকি মেঘ বালিকা আমি / হতাম যদি ছবির মতো কোথায় গিয়ে থামি’।
মিষ্টি একটি কবিতা ‘মন–ময়ূরীর নাচন’ এর দু‘টি লাইন – মন ময়ূরীর নাচন দেখে রাঙা সকাল জাগে / বন্ধুরে তুই চল না সাথে আমি সবার আগে….। ‘রাজহংসীর ছানা’ কবিতায় রাজহংসীর বর্ণনা অসাধারণভাবে তুলে ধরছেন – কমলা ঠোঁটে ধূসর কালো/ পালক ঝেড়ে ডাকে/ প্যাক প্যাক প্যাক দৌড়ে পালায়/এ ছবি মন আঁকে।
এরপর শিরোনামের কবিতা ‘স্বপ্নে আঁকা কিশোরবেলার দিন’ এই কবিতায় ভীষণ চমৎকার ভাবে প্রকাশ পেয়েছে কিশোরবেলার দিনগুলো যেমন কবি লিখছেন – ঘুমের ঘোরে স্বপন মাঝে/ নীল আকাশে উড়ি/মনের রঙে রাঙা হয়ে/ ওড়াই ইচ্ছেঘুড়ি। আর একটি কবিতায় উঠে এসেছে গাঁয়ের বধূ এর মিষ্টিমধুর ছবি… বড়ো আদর মায়াময়ী/ কালো চোখ ডেকে/ সর্ষেফুলের ঝাপটা যেন/ সারা অঙ্গে মেখে। বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ এর চিত্র ফুটে উঠেছে ‘বৈশাখি দিন’ কবিতায়। ‘বৈশাখে আজ কী কারুকাজ / আলপনায় দেশ আঁকি/সাজে সৌরভ করি গৌরব /রঙিন বেশে থাকি’।
বুলবুলি তাঁর মিষ্টি কন্ঠের জন্য সকলের কাছে পরিচিত পাখি। ‘গানের পাখি বুলবুলি’ কবিতায় দুটি লাইন – ‘তোমার কণ্ঠে প্রাণ ফিরে পায় ফুলের অলিগলি/ গানের পাখি ভালোবাসি মনের কথা বলি’।
ঋতু বৈচিত্র্যের দেশ বাংলাদেশ। ছয় ঋতুর সমাহারে সমৃদ্ধ আমাদের দেশ। বিভিন্ন ঋতুতে নানা আয়োজনে মনমাতানো পরিবেশ মুগ্ধতা ছড়ায়। ‘দুপুর রোদে’ কবিতায় ঋতু বৈচিত্র্যকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন কবি। তিনি লিখছেন – কার্তিক আর অগ্রহায়ণ / দুটো মাসে মিলে/ বর্ণিল রূপ বিকশিত / ছড়ায় বিলে ঝিলে।
কিশোর মনের রঙিন ক্যানভাস জুড়ে নীল আকাশ সোনালী সূর্য গভীর রেখাপাত করে তাই ‘রাঙা সূর্য’ কবিতায় কবি লিখছেন– লালরঙা মুখ রঙিন সূর্য / দিগন্তে যায় ঢলে/ নিবিড় কালো মালাখানি/ পরায় ধরার গলে।
আবার কবির কিশোরমন ডুব দিলো হেমন্তের সকালে ‘মনকাড়া হেমন্ত’ কবিতার কয়েকটি লাইন যেমন– ডিঙি নৌকা হেসে আকুল/ শুকনো খালের পাড়ে/ স্নিগ্ধ সাজে হেমন্ত তার/ সবারই মন কাড়ে।
এবার শীতের শিউলি ঝরানো ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন – “শিউলি ফুলের ঘ্রাণের টানে” কবিতায় যেমন সেখানে তিনি লিখছেন– শিউলি ফুলের ঘ্রাণের টানে/ একসাথে হই মিলে/ দু’চোখে রঙ লেগে আছে/ শাপলা ভরা বিলে।
কিশোরদের জানার আগ্রহ ও কৌতূহলকে কেন্দ্র করে কবিতা লেখা হয়, শুধু শিক্ষা দেওয়া নয়, কিশোর কবিতায় সাহিত্যিক রস সৃষ্টি এবং কল্পনার জগৎ তৈরি করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
‘বৃষ্টির হাসি’– কবিতায় কবির ভাবনায় উঠে এসেছে বৃষ্টি দিনের আনন্দ। এই কবিতার কয়েকটি লাইন এরকম – বৃষ্টি ঝরে ঝিরিঝিরি ঝুমকো তালে তালে/ মনে মনে সারাটাদিন কাটাই মেঘের পালে।
‘দুজন মিলে’ কবিতায় কিশোর বেলার বন্ধুত্বের দারুণ ছবি ফুটে উঠেছে যেমন– প্রাণের বন্ধু প্রাণের দোসর খেলবি নাকি সাথে/ হৃদয় কাঙাল হলো আমার হৃদয় মালা গাঁথে।
কবি আবার ফিরে আসলেন দেশের কথায়। ‘স্বদেশ আমার মা’ কবিতায় লিখছেন – ফুল ফোটে আর পাখি ডাকে আঙিনারই পরে/ গরু মহিষ সকাল বেলা খোলা মাঠে চরে/এই আমাদের জন্মভূমি আমার প্রিয় দেশ/ জীবন মরণ এদেশ আমার ভালো লাগে বেশ।
মা আমাদের সবার জীবনের অন্যতম একজন। মা সন্তানের সাথে মায়ের অবিচ্ছেদ্য মমতাময় সম্পর্কে চিত্র ফুটে উঠেছে ‘মায়ের ছোঁয়ায়’ কবিতায়। এই কবিতার কয়েকটি লাইন – তোমার মুখে ভূতের গল্পে/ ভয় লুকিয়ে বুকে/আদর মাখা হাতের ছোঁয়ায়/ খাবার দিতে মুখে। আবার ‘সবুজ প্রাণের দল’ কবিতায় পেলাম প্রকৃতি নীল আকাশ ফুল পাখির আলাপন। তিনি লিখছেন– নীলাকাশে ভাসছে মেঘে/খুশি সবুজ প্রাণ/ ফুলের সাথে পাখির সাথে/ গাইছে হরেক গান।
কিশোর বেলায় নাগরদোলায় চড়া একটি মহা আনন্দের বিষয়। গ্রাম্য মেলার নাগরদোলা এখনো কিশোর মনে দারুণ প্রভাব ফেলে। ‘স্বপ্নের নাগরদোলা’ কবিতায় কবি লিখছেন– আমরা ক‘জন কিশোর বালক/নাগরদোলায় চেপে/হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে / চলি মেপে মেপে। বাংলাদেশের গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলে ছোটো খাল সেখানে লোকজন পারাপারের জন্য থাকে বাঁশের সাঁকো। কিশোর মন সাঁকো পারাপারে আনন্দ খুঁজে নিতে চায়। ‘সাঁকো’ কবিতার ক‘টি লাইন এরকম– পারাপারের সাঁকো হয়ে কাটাই সারাদিন / আমার বুকে পা– টি রেখে বাজাও আপন বীণ।
‘রাঙামাটির পাহাড়ে’ কবিতায় কিশোর মনে পাহাড় ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কবি। যেমন ু গ্রাম ছাড়া ঐ পথটি বেয়ে পাহাড়চূড়ায় উঠি/ মন ভোলানো গানটি গেয়ে হেসে লুটোপুটি/ঝিলিক তুলে শাপলা ফোটা ঝিলের জলে ভাসে/আমার দেশে এমন রূপে রাঙামাটি হাসে। বইটির একেবারে শেষ কবিতা ‘গৌরবের লাল সবুজ’ কবিতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ লাল সবুজ পতাকা সবুজ প্রকৃতির মায়াবী ছবি তুলে এনেছেন কবি। তিনি লিখছেন – লাল সবুজের পতাকাটি উড়ছে মাঠে – বনে/ গৌরবে আজ দেশের মাটি ধন্য সকল মনে/ দেশের জন্য প্রাণ দিয়ে হয় দেশের ধ্রুবতারা/ ভালোবেসে অকাতরে শহীদ হলো তারা।
গ্রন্থভুক্ত ২০ টি কবিতা আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে এগিয়ে গেছে। আবহমান বাংলার প্রতিটি কিশোর কিশোরীর মনের কল্পনার রঙধনু আনন্দ বেদনা দেশের প্রতি মায়ের প্রতি ভালোবাসাকে ছন্দের তালে তালে অপূর্ব মনোভাব প্রকাশ করেছেন কবি শিশুসাহিত্যিক গল্পকার মারজিয়া খানম সিদ্দিকা। আশা রাখছি রুচি স্নিগ্ধ পাঠকমহল এবং শিশু – কিশোররা তাঁর লেখা কবিতাগুলো পাঠ করে উপকৃত হবেন প্রীতি লাভ করবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে কবিকে অভিনন্দন শুভেচ্ছা জানাই এবং বইটির বহল পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি। এটি সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন – খ্যাতিমান চিত্র শিল্পী উত্তম সেন। ভেতরের অলংকরণ– নাটু বিকাশ বড়ুয়া। প্রকাশক – শৈলী প্রকাশন।
লেখক: কবি, গল্পকার।












