বাংলা সাহিত্যে কবি কামিনী রায় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘পাছে লোকে কিছু বলে’–তে মানুষের মনোজগতের এক গভীর দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছিলেন। কবিতার শুরুতেই তিনি লিখেছেন– ‘করিতে পারি না কাজ সদা ভয় সদা লাজ’। আরও বলেন– ‘সংশয়ে সংকল্প সদা টলে– পাছে লোকে কিছু বলে।’
লোকলজ্জা ও সমাজের ভয়ে ভালো কাজ করতে না পারা, সিদ্ধান্তহীনতায় সংকল্প টলে যাওয়া, সমালোচনার আশঙ্কায় নিজেকে আড়ালে রাখা–এই মানসিক বন্দিত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে তোলে এবং মহৎ কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অবাক ব্যাপার, এক শতাব্দীরও বেশি আগে উচ্চারিত এই কবিতার বেদনাবোধ আজও আমাদের সমাজে একই রকম সত্য ও প্রাসঙ্গিক।
আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের নিয়ে ভাবি–কিন্তু একটু গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়, সেই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আমরা নিজেরা নই। সেখানে বসে আছে এক অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক-‘মানুষ’। আমি যদি এটা বলি, মানুষ কী ভাববে? আমি যদি ওটা করি, মানুষ কী বলবে? এই প্রশ্নটিই ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের অঘোষিত শাসক হয়ে ওঠে। আশ্চর্য এই যে, ‘মানুষ’ নামের এই সত্তার কোনো নির্দিষ্ট মুখ নেই, কোনো স্থায়ী পরিচয় নেই–তবু তার বিচারকে আমরা বাস্তবের চেয়েও বেশি সত্য বলে মেনে নিই।
আমরা এই সমাজে এমন এক ধাঁচে বড় হই, যেন শৈশব থেকেই আমাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়-‘মানুষ কী বলবে’–এই বাক্যটি। শিশুটি যদি অবলীলায় সত্য কথা বলে ফেলে, বড়রা তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দেন-‘এসব কথা বাইরের লোককে বলা যায় না।’ যদি সে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করে, বলা হয়-‘এত খামখেয়ালি হলে মানুষ হাসবে।’ এইভাবেই ধীরে ধীরে শিশুকে শেখানো হয়–নিজের অনুভূতি গোপন করতে, সত্য চাপা দিতে, সামাজিক মুখোশ পরে থাকতে। এখান থেকেই জন্ম নেয় আত্মপ্রবঞ্চনা–যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই প্রতারণা করতে শেখে।
এই আত্মপ্রবঞ্চনা কেবল ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বয়ে চলে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি–সব মিলিয়ে এমন এক কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে ব্যক্তি নয়, বরং লোকদেখানো শালীনতাই মুখ্য হয়ে ওঠে। সমাজ ঠিক করে দেয় কোন পোশাক ভদ্র, কোন পেশা সম্মানজনক, কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কাকে বিয়ে করা উচিত, কখন সন্তান নেওয়া উচিত। ব্যক্তি স্বাধীনতা সেখানে গৌণ; মুখ্য হয়ে ওঠে সমাজ–স্বীকৃত সংস্কার।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়–এই সমাজ আসলে কে? যাদের নিয়ে আমরা এত ভয় পাই, এত হিসাব করি, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের জীবনের নিতান্তই পার্শ্বচরিত্র। আমাদের দুঃখ, ব্যথা, দ্বিধা বোঝার মতো সময় বা সংবেদনশীলতা তাদের নেই। অথচ তাদের সম্ভাব্য মন্তব্যের আশঙ্কায় আমরা নিজের ইচ্ছাকে গলা টিপে মেরে ফেলি। যাদের কথা ভেবে আমরা নিজের জীবন ক্ষতবিক্ষত করি, তারা হয়তো আমাদের কথা এক মুহূর্তও ভাবে না।
এই ‘মানুষ কী বলবে’ সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো–এটি ধীরে ধীরে আমাদের আত্মবিশ্বাসকে ক্ষয় করে দেয়, অথচ আমরা টেরও পাই না। আমরা ভাবতে শুরু করি–আমার অনুভূতি, আমার স্বপ্ন, আমার পছন্দ–এসব তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ শুধু এটুকুই–সমাজ আমাকে গ্রহণ করবে কি না। এই ভাবনাই আমাদের ভেতরে জন্ম দেয় আত্ম–অস্বীকৃতির এক নীরব অভ্যাস, যেখানে নিজেকে প্রশ্ন করার আগেই আমরা সমাজকে সন্তুষ্ট করার হিসাব কষি।
এই ভয় কেবল ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি আমাদের বিবেক, নৈতিকতা ও সৃজনশীলতাকেও দুর্বল করে দেয়। কেউ অন্যায় দেখেও চুপ করে থাকে, কারণ প্রতিবাদ করলে মানুষ কী বলবে। কেউ নেতৃত্ব নিতে চায় না, কারণ সামনে এলে সমালোচনা হবে। কেউ সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে সাহস পায় না, কারণ একা পড়ে যাওয়ার ভয়। এভাবেই একটি সমাজ ধীরে ধীরে নীরব দর্শকের সমাজে পরিণত হয়–যেখানে অন্যায় ঘটে, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে না; অবিচার চলে, কিন্তু প্রতিবাদ হয় না।
উপহাস ও প্রত্যাখ্যানের এই ভয়ে আমরা ছুটি ছদ্ম–সাফল্যের পেছনে। পড়াশোনা করি নিজের আগ্রহে নয়, অন্যের প্রত্যাশায়। চাকরি করি আত্মতৃপ্তির জন্য নয়, সামাজিক পরিচয়ের জন্য। বিয়ে করি ভালোবাসার টানে নয়, পারিবারিক ও সামাজিক চাপে। সন্তান বড় করি লোকদেখানো শিষ্টাচারে। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে হঠাৎ প্রশ্ন জাগে–এই জীবন কি সত্যিই আমার ছিল, নাকি আমি কেবল অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করে গেছি?
সবচে’ দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, যখন কেউ সত্যিকারের নিজেকে খুঁজে পেতে চায় তখন সমাজ তাকে নেতিবাচক আখ্যা দেয়। অথচ এই সমাজই আবার লোকদেখানো সেলিব্রিটি করে সেই মানুষদের যারা সমাজের বাধা উপেক্ষা করে নিজের পথ তৈরি করেছে। সমাজের নির্মমতা আরও গভীরে গেলে স্পষ্ট হয় ক্ষমতার অসম সম্পর্কগুলোতে। যে বাবা–মা নিজের মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত, আত্মনির্ভরশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তারাই আবার ছেলের জন্য চান কম শিক্ষিত বউ–যেন সে প্রশ্ন না করে, সেবা করে, সহ্য করে। যেন তার আত্মসম্মান, অধিকার, নিজের ভালো লাগা–মন্দ লাগার কোনো মূল্য নেই। আবার নিজের সন্তান ভুল করলে বিচার না করেই বলা হয়-‘আমার সন্তান এমন হতে পারে না।’ এই দ্বিচারিতাই সমাজকে করে তোলে বৈষম্যমূলক ও নিষ্ঠুর।
একজন নারী যখন শ্বশুরবাড়িতে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখনও সে অনেক সময় চুপ করে থাকে–লোকলজ্জার ভয়ে, অপবাদের ভয়ে। দিনের পর দিন সে নিজের সঙ্গে, নিজের বিবেকের সঙ্গে প্রতারণা করে যায়। অপমান, গ্লানি, মানসিক টানাপোড়েন–সবই সহ্য করে শুধু এই ভেবে যে, মানুষ কী বলবে। নিজের প্রতি এই নিষ্ঠুরতাকেও সে ভাগ্য ভেবে মেনে নেয়।
এই ভয় দায়িত্বহীনতাকেও উৎসাহিত করে। সমাজের নামে ব্যক্তিগত অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া হয়-‘সবাই তো এমনই করে’, ‘সমাজে এটাই নিয়ম।’ এতে করে অপরাধীর কোনো অনুশোচনা থাকে না; বরং নির্যাতিত মানুষটিই নিজেকে দোষী ভাবতে শুরু করে। ন্যায়–অন্যায়ের জায়গায় তখন মুখ্য হয়ে ওঠে লোকের মতামত।
সমাজে কিছু মানুষ আছে, যারা বিষধর সাপের মতো কথার ছোবলে ছোবলে স্লো পয়জন ছড়ায়। পরচর্চা, কুৎসা, অপবাদ–এইসব দিয়েই তারা নিজেদের শূন্যতা ঢাকতে চায়। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করে মজা পায়।
শিশুদের ক্ষেত্রেও সমাজের এই দ্বিচারিতা স্পষ্ট। ছোটবেলায় স্কুলের অনুষ্ঠানে নাচ–গান–আবৃত্তিতে হাততালি পড়ে, উৎসাহ দেওয়া হয়। সেই হাততালি শিশুর মনে স্বপ্ন বুনে দেয়। কিন্তু বড় হয়ে সে যখন সত্যিকারের শিল্পী বা স্বপ্নদ্রষ্টা হতে চায়, তখনই শুরু হয় নিষেধাজ্ঞা-‘এখন এসব আর করা যাবে না, মানুষ খারাপ বলবে।’ এইভাবেই ছোটবেলা থেকেই বুনে দেওয়া হয় সন্দেহ, সংকোচ আর ভয়ের বীজ। ধীরে ধীরে মরে যায় একটি স্বপ্ন।
নবম শ্রেণিতে একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের আগ্রহ অনুযায়ী গ্রুপ বেছে নিতে চায়, তখনও অনেক পরিবার চাপিয়ে দেয়-‘সায়েন্স না নিলে মান–সম্মান থাকবে না।’ ফলাফল–একজন সাবলীল, কৌতূহলী শিশু ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বিভ্রান্ত, আত্মবিশ্বাসহীন, যান্ত্রিক মানুষ।
সত্যি বলতে কী–যারা নিজের জীবনে ব্যস্ত, তারা অন্যের জীবন নিয়ে মাথা ঘামায় না। পরচর্চার সময় পায় তারাই, যারা নিজের ভেতর শূন্য। আমাদের সমাজের ছেলে–মেয়ে যদি জাপান বা চীনের মানুষের মতো কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও আত্মোন্নয়নে মন দিত, তবে এত হিংসা, দ্বন্দ্ব আর কুৎসা কি থাকত?
সমস্যার শেকড় লুকিয়ে আছে আমাদের ছোট ছোট আচরণে। যখন শিশুকে বলি– ‘এভাবে বললে মানুষ হাসবে’–তখন তাকে নিজের সত্য লুকাতে শিখাই। যখন বলি-‘তোমার ইচ্ছাটা শুনলাম, এবার বাবার ইচ্ছা মানো’–তখন তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কেড়ে নিই। অথচ সন্তানকে জানতে দিতে হবে, বুঝতে দিতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে–তবেই সে স্বাধীন মানুষ হয়ে উঠবে। সমাজ বদলাবে কোনো হঠাৎ বিপ্লবে নয়। বদলাবে ধীরে, সচেতন ও দৃঢ় চর্চায়। পরিবর্তনের শুরুটা হোক আমাদের ঘর থেকে, আমাদের ভাষা থেকে, আমাদের মানসিকতা থেকে। একেকজন মানুষ যখন নিজেকে ভালোবাসতে শেখে, নিজের মতকে সম্মান করে, তখনই সমাজে জন্ম নেয় সত্য, স্বাধীনতা ও সহনশীলতার ভিত। ব্যক্তি থেকেই গড়ে ওঠে জাতি। শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি একটাই– মানুষ কী বলবে কিংবা মানুষ কী ভাববে–তা নয়; বরং আমি কী বলব, আমি কী ভাবব– সেই মানুষের পরিচয় হই আমি নিজেই।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।












