সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ছে তথ্যপ্রযুক্তি। বর্তমান সময়ে দুরন্ত প্রতাপ দৃশ্যমান। জানাচ্ছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। যার একটি নাম আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি আর স্রেফ একটি ক্রেজে সীমাবদ্ধ নাই। বরং বহুধা বাড়বাড়ন্ত।
মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কৃত্রিম উপায়ে প্রযুক্তি নির্ভর করে যন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করাই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কম্পিউটার দ্বারা অনুকৃত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। এটি হলো মেশিন দ্বারা প্রদর্শিত বুদ্ধি। এআইয়ের উদ্দেশ্য হিসেবে মানুষের ক্ষমতা অনুকরণ করাকেই তুলে ধরা যায়।
এরইমধ্যে জোরালো হয়েছে এই আলোচনা– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি খুব শিগগিরই মানুষের চিন্তাশক্তিকে ছাপিয়ে যাবে? সমপ্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মঞ্চে এমনই এক ভবিষ্যৎচিত্র তুলে ধরেছেন ইলন মাস্ক। বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক বলেন, “আগামী এক–দুই বছরের মধ্যেই এআই মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে যা প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ যেকোনো মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মানবজাতির সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এআই–এর উন্নতি এত দ্রুত হচ্ছে যে এই বছর শেষে এমন একটি এআই দেখা যেতে পারে যা যেকোনো মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমত্তায় এগিয়ে থাকবে।”
ইলন মাস্ক আমেরিকার একজন বিখ্যাত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী, যিনি মহাকাশ(SpaceX), বৈদ্যুতিক গাড়ি (Tesla ), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI ) এবং সামাজিক মাধ্যম X/Twitter সহ একাধিক প্রযুক্তি খাতে বিপ্লব এনেছেন। বর্তমানে বিশ্বের সেরা ধনী ইলন মাস্ক। তিনি যে পূর্বাভাস ও রোডম্যাপ দিচ্ছেন তা কোনোমতেই ফেলনার নয়।
আমরা দেখছি, বিশ্বের বড় বড় সংস্থাগুলো এআইতে বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে ফেসবুক, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো জায়েন্ট তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় বহু মানুষের কাজ কার্যত এআইকে ব্যবহার করেই সেরে ফেলছে সংস্থাগুলো। ফলে ক্রমশ কমছে কর্মসংস্থান। বাড়ছে কর্মী ছাঁটাই। এবার মাস্কের বক্তব্যে আরও জোরালো হলো আগামী দিনে এআইয়ের বাড়বাড়ন্তের দিক।
গুগল ডিপমাইন্ডের যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা ও মুখ্য এজিআই বিজ্ঞানী শেন লেগ বলেন, “এআই সিস্টেম ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষকে টপকাতে শুরু করেছে। যার মধ্যে রয়েছে–ভাষার ব্যবহার ও সাধারণ জ্ঞান। আগামী কয়েক বছরে যুক্তি প্রয়োগ, চাক্ষুষ উপলব্ধি কিংবা ধারাবাহিক শিক্ষাসহ তাদের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠবে এআই।”
বিবিসি নিউজনাইটের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক হিসেবে খ্যাত অধ্যাপক জেফরি হিন্টন বলেছেন, ‘এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং তার প্রভাবে মানবজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে–এটা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এআই অনেক মামুলি বা গতানুগতিক ধরনের কাজ কেড়ে নেবে। এআইয়ের কল্যাণে মানুষের উৎপাদনশীলতা ও আয় উভয়ই বাড়বে। কিন্তু তাঁর মনে আশঙ্কা, এই সম্পদ ধনীদের ঘরে যাবে। যাঁরা চাকরি হারাবেন, তাঁদের ঘরে যাবে না এই অর্থ এবং সমাজের জন্য তা ভালো হবে না বলেই তিনি মনে করেন। বিবিসির অনুষ্ঠানে জেফরি হিন্টন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানবজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি আছে।
পৃথিবীতে মানুষ আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে প্রাণিজগতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রজাতি হিসেবে টিকে আছে মানুষ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত উন্নতি সেই শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানকে দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন রাখবে কি না, তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, এমন এক সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে, যখন এআই প্রযুক্তি মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাবে। এ মুহূর্তটিকেই তাঁরা বলছেন ‘সিঙ্গুলারিটি’। যে বিন্দু থেকে শুরু হবে এমন এক যুগ, যেখানে যন্ত্র চিন্তা করবে মানুষের চেয়েও দ্রুত ও নিখুঁতভাবে। সমপ্রতি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এআইমাল্টিপল একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ৮ হাজার ৫৯০ জন বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তার পূর্বাভাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিঙ্গুলারিটির সম্ভাব্য সময়সীমা ক্রমেই কাছাকাছি চলে আসছে। ১০ বছর আগেও বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ২০৬০ সালের আগে এআই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু এখন অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, সেই সময় হয়তো আর দূরে নয়। সম্ভবত কয়েক বছরের মধ্যেই ঘটতে পারে এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
প্রযুক্তিগত সিঙ্গুলারিটি এমন এক পর্যায়, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং নিজেই নিজের উন্নয়ন ঘটাতে শুরু করে। অর্থাৎ এমন এক বিন্দু, যেখানে এআইয়ের বুদ্ধিমত্তা মানুষের সম্মিলিত জ্ঞানের সীমা অতিক্রম করে যায়। এ বিষয়ে এআইমাল্টিপলের প্রধান বিশ্লেষক সেম দিলমেগানি বলেন, ‘সিঙ্গুলারিটি একটি কাল্পনিক ঘটনা, যা ঘটলে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা হঠাৎ করেই বিস্ফোরণের মতো বৃদ্ধি পাবে। এ অবস্থায় একটি সিস্টেম মানুষের মতো চিন্তা করতে পারবে, কিন্তু গতিতে হবে অতিমানবীয় এবং স্মৃতিতে প্রায় নিখুঁত। সিঙ্গুলারিটি ঘটলে যন্ত্রে চেতনার জন্মও হতে পারে।’
সিঙ্গুলারিটি একদিন ঘটবেই এ বিষয়ে বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞ একমত। তবে কবে ঘটবে, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দারিও আমোদি বলেন, ২০২৬ সালেই সিঙ্গুলারিটি ঘটতে পারে। তখনকার এআই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নোবেলজয়ী মানুষের চেয়েও বুদ্ধিমান হবে। ফলে তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয় মানুষের চেয়ে ১০ থেকে ১০০ গুণ দ্রুত করবে। বর্তমানে শীর্ষ এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা গড়ে প্রতি সাত মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ‘বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ’ ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে ভিন্ন কথা শোনাচ্ছেন এআই বিজ্ঞানী ইয়ান লেকুন। তাঁর মতে, দকৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে না বা মানব জাতিকে নিয়ন্ত্রণে নেবে না, বরং এটি মানুষের বুদ্ধিমত্তা বাড়াবে। এআই মানব সক্ষমতাকে বাড়াতে ডিজাইন করা হয়েছে, প্রতিস্থাপন বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। এটি মানুষকে আরো ভালো সিদ্ধান্ত নিতে, জটিল সমস্যা সমাধান করতে ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।‘ তিনি এআইকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার বদলে একটি টুল হিসেবে দেখার জন্য বলছেন, যা মানব দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতাকে বাড়িয়ে তোলে। ফলে আরো নতুন সমাধান ও জীবনের মান উন্নত হয়। তার ভাষ্য, মানব ও এআইয়ের মধ্যকার সহযোগিতা একসঙ্গে ভবিষ্যতে আরো বড় সফলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। লেকুন বিশ্বাস করেন, দএআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করা চতুর মানুষের দলের সাহায্য পাওয়ার মতো। তিনি বলেন, ‘এআই অ্যাসিস্ট্যান্টরা প্রায়ই ব্যবহারকারীদের চেয়েও বেশি স্মার্ট হতে পারে। যদি তা আরো স্মার্ট হয়ে যায়, তবে আমাদের উদ্বিগ্ন না হয়ে বরং এর সম্ভাব্য উপকার ও সুযোগ কাজে লাগানো উচিত। সময়ের সঙ্গে এআই একটি সাধারণ অবকাঠামো হয়ে উঠবে, যা বিশ্বব্যাপী সবাই ব্যবহার করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এত অগ্রগতির পরও সবচেয়ে উন্নত ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) এখনো একটি চার বছরের শিশুর সমানও বুদ্ধিমান নয়, যা নির্দেশ করে যে মানবস্তরের এআই এখনো অনেক দূরের ব্যাপার।‘
সব মিলিয়ে বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপরিসীম ক্ষমতার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। সামনে অপেক্ষা করছে প্রযুক্তিগত অনন্যতা, যা আসলে এমন এক প্রাযুক্তিক বিশ্বব্যবস্থা, যেখান থেকে আর পেছনে ফেরার সুযোগ থাকবে না। এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে উপেক্ষার উপায় যেহেতু নেই, এর ক্ষমতাকে কাজে লাগানোই উত্তম। তবে এআইকে যন্ত্রকেন্দ্রিক নয়, বরং মানবকেন্দ্রিক করে তোলাটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ কখনোই শুধু যন্ত্রের কাঁচামালে পরিণত হতে পারে না। তাই এআইকে বৈশ্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে একটি হাতিয়ারে পরিণত হতে হবে।
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)











