মানবিক মহিমায় উদ্ভাসিত হোক আগামী দিনগুলো

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৬ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

টানমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধদিয়্যে কালের গর্ভে বিলীন হলো আরও একটি বছর। বছরের শেষ দিনে সাবেক সেনাপ্রধান, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, তিন বারের নির্বাচিত এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু। ইতিহাসের বিরল সম্মান নিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। স্বপ্ন আর দিন বদলের অপরিমেয় প্রত্যাশায় জাতির জীবনে শুরু হলো আরেকটি নতুন বছরের যাত্রা। নতুন বছরের আগমনে সূর্যকরোজ্জ্বল পৃথিবীকে জানাই অভিবাদন।

ঘটনাবহুল ২০২৫ বদলে দিয়েছে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক গতিপথ। শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়। বছরটি ছিল ইতিহাসের সংযোগস্থল। বছর জুড়ে আছড়ে পড়েছে পরিবর্তনের ঢেউ, ছিল দাবি আদায়ের আন্দোলনের উত্তাপ। সব মিলিয়ে বিস্ময় ও প্রত্যাশার এক অনন্য অধ্যায় দেখেছে বাংলাদেশ। ‘এ বছরে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা হবে ইতিহাসের সাক্ষী। ২০২৫ এ দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনে ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ ছিল মব সন্ত্রাস। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে (গণপিটুনি) অন্তত ১৯৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আগের বছর সারা দেশে মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২৮ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজন তথ্য। যা আমাদেরকে আতংকিত করেছে। ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত আসক’র ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সংগঠনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তারা এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে। আসকের তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে কমপক্ষে ২৯৯ জন নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নারীপুরুষ নির্বিশেষে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ এমন সব সহিংসতার শিকার হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা, বাউল সম্প্রদায়ের সদস্য সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে প্রকাশ্যে মারধর ও অপমানের ঘটনা ঘটেছে। ভিন্ন বিশ্বাসের মসজিদ, মাজার সহ ধর্মীয় উপসনালয়ে আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এ সময়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্পৃহতা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার নির্লিপ্ত বক্তব্য এসব ঘটনা ঘটানোর পিছনে কাজ করছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্লেষণে বলা হয়, এ সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। যদিও অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন সাধারণ ও দলমত নিরপেক্ষ নাগরিক। নিহতদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন, তিনজন নারী আর একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।

২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরইমধ্যে হাজতি ৬৯ জন এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি রয়েছে ৩৮ জন। তথ্যনুযায়ী ২০২৫ সালে অন্তত ৩৮ জন বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৫ এর ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ভয়াবহ ও ধারাবাহিক রূপ নিয়েছে যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতা হয়েছে।

২০২৫ এর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ১০২ জন।

২০২৫ এ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্ববর পর্যন্ত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সময় দুবর্ৃৃত্তদের হামলায় ৩ জন সাংবাদিক নিহত হন এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনকভাবে ৪ জন সাংবাদিকের লাশ উদ্ধার করা হয়। দেশের বৃহত্তম ও সর্বাধিক প্রকাশিত পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শত শত সাংবাদিককে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। এসব ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়েছে। এ বছর উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর অন্যতম ঘটনা হলো দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন তারেক রহমান। ওই দিন তাকে সংবর্ধনা জানাতে ঢাকায় ৩০০ ফুট এলাকামুখী স্মরণকালের সবচেয়ে বড় জনস্রোতে পরিণত হয়। এ সময়কালে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের মূখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। এ ঘটনায় জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থাগুলো শোক জানিয়েছে।

এ আওয়ামী শাসনের অবসান পরবর্তী দিনগুলোতে মানুষের প্রত্যাশা ছিল পাহাড় সমান। সবক্ষেত্রে সংস্কারের মধ্য দিয়ে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন, অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা ছিল মানুষের। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ১৭ মাস আক্রান্ত হলেও দেশের মানুষের সে আশা পূরণ হয়নি। আসেনি জনজীবনে স্বস্তি। আইন শৃঙ্খলার অবনতিতে মানুষের মধ্যে বেড়েছে উদ্বেগউৎকণ্ঠা। অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি’। ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কর্মহীন হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি খুবই নাজুক। ফলে বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এ বছর।

মূল্যস্ফীতির চাপে পণ্য বিক্রি কমেছে ২০৩০%। ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় ৩৫% বেড়েছে। জ্বালানি সংকটে কারখানার সক্ষমতা নেমে এসেছে অর্ধেকে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন ৬.২৩% এ দাঁড়িয়েছে।

আমরা শিখেছি, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতকে সাজাতে হবে। কথাটিকে লক্ষ্য করেই আমরা যদি এগিয়ে যাই তাহলে বিগত বছরের সব ব্যর্থতা, না পাওয়া থেকে উতরিয়ে সামনের সময়কে সাজাতে হবে। সফল আমাদেরকে হতেই হবে। দেশীয় পরিবেশ বাদ দিলে আন্তর্জাতিকভাবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ছিল দ্বন্ধসংঘাতে বিপর্যস্ত। ফিলিস্তিনে গণহত্যা অব্যাহত থেকেছে। ইরানইসরাইলে এবং ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ উপমহাদেশে নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করেছে। রাশিয়াইউক্রেনের যুদ্ধও থামেনি। বিশ্বের এসব স্থানে রক্ত ঝরছেই আর বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নানাভাবে পৃথিবীকে অস্থির করে রেখেছে। এত ঘটনা দুর্ঘটনার মাঝেও মানুষ কিছুটা স্বস্তির আস্থা খুঁজে পেয়েছে সাধারণ নির্বাচনে। প্রতিশ্রুতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে অনিশ্চয়তা, ঘোষিত অঘোষিত নানাভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারার খবর গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের কাছে অজানা নয়। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই শঙ্কা দূর হবে না। প্রকৃত পক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যা কিছু জীর্ণ, জরাগ্রস্ত সেসব এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াই মানুষের ধর্ম। আবহমান কাল ধরে মানবসভ্যতা এভাবেই অগ্রসর হয়েছে। এ প্রত্যাশা নিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি। এমন একটি দেশ যেখানে শান্তি বিরাজ করবে, ঘটবে না ধর্মান্ধতার অমানবিক প্রকাশ, থাকবে না হিংসাবিদ্বেষ ও হানাহানি।

নতুন সময়ে নতুন বছরে জগতের আনন্দযজ্ঞে সবার ইতিবাচক আমন্ত্রণ ঘটুক। শাসক যারা, বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা যারা, তাদের জনবান্ধব হয়ে ওঠার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আসন্ন নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদের এক থাটা মনে রাখতে হবে এবং এটা মনে রেখেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিতে হবে।

আমরা প্রত্যাশা করি ২০২৬ সাল মনুষ্যত্বের জন্য শুভ সংবাদ নিয়ে আসবে। বিগত সময়ের ক্ষতগুলোকে সারিয়ে নিয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বরণ করতে চাই নতুনকে। আসুন আমরা সবাই দেশকে নিজের মায়ের মতো ভালোবাসতে শিখি। তবেই দেশের উন্নয়নের গতিধারা অব্যাহত থাকবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধছড়ার ফেরিওয়ালা
পরবর্তী নিবন্ধসুকুমার বড়ুয়া : আমাদের আদর্শের ছড়াশিল্পীর বিদায়