মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিন

| শুক্রবার , ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে মানবাধিকারের পরিস্থিতি : একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক সিম্পোজিয়ামে বক্তারা বলেছেন, বিগত সরকারের শাসনামলে গুমসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে। মব, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, নির্বিচারে মামলা দেওয়া ও জামিন না হওয়া, নারীদের হেনস্তার মতো ঘটনাগুলো দুর্বল মানবাধিকার পরিস্থিতিই নির্দেশ করে।

গত শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত এই সিম্পোজিয়ামে মূল বক্তা ছিলেন গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সভাপতি হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ‘বিগত শাসনামলে ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে পদ্ধতিগতভাবে চালানো গুমের ঘটনাগুলো আইনের শাসনের প্রতি নাগরিকদের বিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে।

গুম আসলে মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর। গুমের বিষয়টি আমরা যত গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছি, ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতার মাত্রা দেখে আমরা তত বেশি স্তম্ভিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েছি। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচারের চারটি মূল উপাদান রয়েছে উল্লেখ করে বিচারপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘সত্য অনুসন্ধান একটি কঠিন কাজ। আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত পুরো সত্য প্রকাশ করে না। কমিশনকে মিথ্যা থেকে সত্য বের করে আনতে হয়েছে। সত্য অনুসন্ধানের পর অপরাধীদের বিচার করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারপতি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি বিচার বিভাগ প্রয়োজন, যা ভয় বা পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম। একজন বিচারকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আসলে তাঁর মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা স্বাধীন। কিন্তু এখন একটি প্রশ্ন তোলা যাক, তাঁরা কি সবাই মানসিকভাবে স্বাধীন? এর উত্তর স্পষ্টতনা। সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারক মানসিকভাবে স্বাধীন নন। অথচ একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচারিক স্বাধীনতা হলো সংবিধানবাদের প্রাণশক্তি।’

জাতীয় গুম কমিশনের আরেক সদস্য মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, ‘এখন কাউকে মব সৃষ্টি করে যদি হেনস্তা করা হয় এবং তারপর যদি ওটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে, তখন স্বৈরাচারের আমলের সঙ্গে তুলনা করে মানবাধিকার পরিস্থিতিটা নস্যাৎ করার চেষ্টা হয়। এটা একটা অশনিসংকেত। হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা, মব তৈরি করে মানুষকে হেনস্তা, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো কাজগুলো কিন্তু আমরা এখনো প্রত্যক্ষ করছি।’

নূর খান বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এসব মামলায় এরই মধ্যে অনেকে আটক হয়েছেন। কেউ কেউ জামিন পেলেও বেশির ভাগ জেলের ভেতরেই রয়েছেন। ফলে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এখনো আমাদের উদ্বেগ যায়নি।’

অন্তবর্র্‌তী সরকারের সময়ও সংবাদপত্রের ওপর বিভিন্ন ধরনের হামলা, ভাঙচুর ও সাংবাদিকদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, উচ্ছৃঙ্খল জনতা কর্তৃক আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার একটি ব্যাপক প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে, যা সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার সৃষ্টি করেছে। এ ছাড়া গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এদিকে নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতির মাঠ ও নির্বাচনী পরিবেশ ততই সহিংস হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটি বলছে, গত ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, নিহতের সংখ্যা এবং আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আসক বলছে, গত ডিসেম্বরে দেশে মোট ১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনায় ৪ জন নিহত এবং ২৬৮ জন আহত হন। তবে গত জানুয়ারিতে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। এই এক মাসে মোট ৭৫টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ এবং আহত হয়েছেন ৬১৬ জন।

দেশের এই ক্রমবর্ধমান সহিংস পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আসক।

বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে কিছু মানুষ ক্রমেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছে। শান্তি, শৃঙ্খলা ও সভ্যতাকে চুরমার করে দিচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সংকটও প্রকট হয়ে উঠছে। আমরা আশা করি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬