উন্নয়নশীল দেশের টেকসই অগ্রযাত্রা কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন কিংবা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি নির্মিত হয় দক্ষ, সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক এবং আর্থিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদের মাধ্যমে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবসম্পদই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ; কারণ নীতিমালা প্রণয়ন থেকে মাঠপর্যায়ের সেবা প্রদান–সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে মানুষ। আর এই মানবসম্পদের বিকাশ ঘটে পরিকল্পিত, মানসম্মত, অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে।
এই উপলব্ধি থেকেই সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধাসরকারি ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসমূহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম। সময়ের ধারায় এটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়; বরং একটি আস্থার প্রতীক, পেশাগত উৎকর্ষের নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
এই প্রতিষ্ঠানের ব্যতিক্রমধর্মী বৈশিষ্ট্য হলো–এখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০তম গ্রেডের কর্মচারী থেকে শুরু করে ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা একত্রে বিভিন্ন কোর্সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই বহুমাত্রিক ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ প্রশিক্ষণকে কেবল তাত্ত্বিক পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং এটি হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক শেখা, নীতি–আলোচনা ও বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি কার্যকর ক্ষেত্র।
একই শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আন্তঃদপ্তরিক বোঝাপড়া ও সমন্বয় জোরদার করে। এতে পেশাগত সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে, সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি বিকশিত হয় এবং জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নির্মাণ সহজতর হয়। কেন্দ্রীয় নীতিমালার আলোকে এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এই কেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালনা করে কেন্দ্রীয় দিকনির্দেশনা ও আঞ্চলিক প্রয়োগের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন রচনা করেছে–যা নীতির বাস্তবায়নে গতি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে।
এখানে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধি–বিধান, বাজেট ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা, আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা, পিপিআর ও ই–জিপি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ শিক্ষা, সঞ্চয় কৌশল, দুর্নীতি প্রতিরোধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ই–গভর্ন্যান্স, শুদ্ধাচার ও নৈতিকতা, নেতৃত্ব বিকাশ, নাগরিককেন্দ্রিক প্রশাসন, যোগাযোগ দক্ষতা এবং অবসর পরিকল্পনাসহ বহুমাত্রিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এসব প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা–কর্মচারীদের কেবল নিয়ম জানায় না; বরং দায়িত্ববোধ, নৈতিক সাহস ও জনকল্যাণমুখী মানসিকতা বিকাশে সহায়তা করে।
গত ২৫ বছর ধরে (২০০১ সাল থেকে) একজন রিসোর্স পার্সন হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে আমি প্রত্যক্ষ করেছি–এই কেন্দ্র নীরবে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে দক্ষ, স্বচ্ছ ও মানবিক প্রশাসন গড়ে তুলছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাগত সততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেবাদানে গতি ও মান উন্নত হচ্ছে এবং জবাবদিহিতা জোরদার হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব ক্রমশ কমে আসছে এবং সেবাপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতা হচ্ছে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য।
বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও সমপ্রসারণ সময়ের দাবি। সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের জন্যও বিনিয়োগ ও আর্থিক সচেতনতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রবর্তন করা যেতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, বেকার যুবক–যুবতী এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক জ্ঞান ও বিনিয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধি আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। সঞ্চয় সংস্কৃতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা গেলে অপ্রয়োজনীয় ঋণনিভর্রতা কমবে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্ত ভিত পাবে।
একটি আর্থিকভাবে সচেতন, নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং পেশাগতভাবে দক্ষ নাগরিকসমাজ গড়ে তুলতে আঞ্চলিক লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে–এটাই প্রত্যাশা। মানবসম্পদ উন্নয়নের এই ধারাবাহিক প্রয়াসই টেকসই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি সুদৃঢ় করবে।












