মাদকাসক্তি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আসে। একটি হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে মাদকাসক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি একটি রোগ হিসেবে দেখা হয়; অন্যটি হলো মানুষের ব্যক্তিগত বা আধ্যাত্মিক রূপান্তরের অভিজ্ঞতা, যেখানে কোনো কোনো ব্যক্তি হঠাৎ করেই মাদক ত্যাগ করতে সক্ষম হন। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠ্তেমানুষের মস্তিষ্ক কি এমনভাবে পরিবর্তিত হতে পারে যে, বহু বছরের আসক্তিও একসময় হঠাৎ শেষ হয়ে যায়?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক গবেষণায় মাদকাসক্তিকে মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ঘধঃরড়হধষ ওহংঃরঃঁঃব ড়হ উৎঁম অনঁংব (ঘওউঅ) মাদকাসক্তিকে “ধ পযৎড়হরপ, ৎবষধঢ়ংরহম নৎধরহ ফরংড়ৎফবৎ” হিসেবে উল্লেখ করে–অর্থাৎ এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে মস্তিষ্কের পুরস্কার (ৎবধিৎফ), প্রেরণা (সড়ঃরাধঃরড়হ) এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের (ংবষভ–পড়হঃৎড়ষ) সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলো প্রভাবিত হয়। দীর্ঘ সময় মাদক গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের ডোপামিনভিত্তিক পুরস্কার ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে মাদক গ্রহণের প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই কারণেই চিকিৎসাবিদরা সাধারণত বলেন, মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন এবং সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় একই রকম হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু মানুষ কোনো আনুষ্ঠানিক চিকিৎসা ছাড়াই মাদক ত্যাগ করতে সক্ষম হন। আসক্তি গবেষণায় এই ঘটনাকে কখনো কখনো “ংঢ়ড়হঃধহবড়ঁং ৎবসরংংরড়হ” বা স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তি বলা হয়। এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষের জীবনে কোনো বড় মানসিক, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পরিবর্তন ঘটলে আচরণেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এই ধরনের ঘটনা কতটা সাধারণ–সে বিষয়ে গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া যায়; তাই এটিকে সাধারণ নিয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
অনেক মনোবিজ্ঞানী মনে করেন, মানুষের আচরণ পরিবর্তনের পেছনে কেবল জৈবিক বা স্নায়বিক কারণই কাজ করে না; ব্যক্তির জীবনদৃষ্টি, মূল্যবোধ এবং আত্মপরিচয়ের পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেউ যদি জীবনের উদ্দেশ্য বা অর্থ নতুনভাবে উপলব্ধি করেন, তাহলে সেই উপলব্ধি আচরণগত পরিবর্তনের শক্তিশালী প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এমন একটি পরিবর্তনের সূচনা করে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে এই অভিজ্ঞতা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ কর্তেএমন নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত এখনো নেই।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মাদকাসক্তিকে কেবল একটি শারীরিক সমস্যা বা কেবল একটি নৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বরং এটি জৈবিক, মানসিক, সামাজিক এবং কখনো কখনো আধ্যাত্মিক্তএই সব মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত একটি জটিল মানবিক অবস্থা। তাই এর সমাধানও একমাত্রিক হতে পারে না।
একদিকে যেমন চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রয়োজন, অন্যদিকে মানুষের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন্তযেমন আত্মজিজ্ঞাসা, মূল্যবোধের পুনর্গঠন, কিংবা জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন উপলব্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি হলো এই দুই দিককে পরস্পরের বিরোধী না ভেবে একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা
লেখক : নেটওয়ার্ক অফিসার, বাংলাদেশ মাদকাসক্ত চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (বারাকা)









