মাতামুহুরী নদীর শতাধিক স্থানে ভূ-গর্ভের বালু উত্তোলন

মানবসৃষ্ট চোরাবালিতে আটকে প্রাণ যাচ্ছে অহরহ গত সোমবার মারা যায় দুই কিশোরী

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া | শনিবার , ১৪ মার্চ, ২০২৬ at ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নদী কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলাকে ঘিরে রেখেছে পরম মমতায়। এই নদী চকরিয়ার মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিতই ছিল। সারাবছর এই নদীর মিঠাপানি দিয়ে চাষবাস করে কৃষককুল অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে আসছে। একইসাথে নদী বিধৌত এলাকার মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রয়েছে এই মাতামুহুরী নদী। দলে দলে নদীতে গোসল করা, মাছ ধরা ছাড়াও সনাতনী সম্প্রদায়ের পূজাঅর্চনার জন্যও এই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি যেভাবে মিঠাপানির উৎস পুকুরগুলোও নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেখানে মাতামুহুরী নদীই একমাত্র ভরসা হয়ে রয়েছে চকরিয়াবাসীর জন্য।

কিন্তু আশীর্বাদের এই নদীকে চকরিয়া উপজেলাজুড়ে মৃত্যুপূরীতে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে। সর্পিল আকারের এই নদীর অন্তত ৪০ কিলোমিটারের বুকজুড়ে দেখা মিলবে শত শত ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনের। পুরো অংশে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে ও মেশিনের আওয়াজ শুনলে মনে হবে এ যেন কোনো কলকারখানা। বাস্তবে এসব আওয়াজ কোনো শিল্পকারখানার নয়, ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন চালানোর আওয়াজ। কিছুদূর পরপর প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নদীর তলদেশের ভূগর্ভের বালু তুলে ফেলা হচ্ছে রাতারাতি বিপুল টাকার মালিক বনে যাওয়ার নেশায়। আর এতেই মহা সর্বনাশ ঘটেছে এই মাতামুহুরী নদীর পুরো চকরিয়া অংশজুড়েই।

মাতামুহুরী নদীতীরের কাকারা ইউনিয়নের মাঝের ফাঁড়ির বেপারী পাড়ার বাসিন্দা ও প্রবীণ সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, পার্বত্য অববাহিকার মাতামুহুরী নামের এই নদী এতদঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ। এই নদীকে ঘিরে শত শত পরিবার মাছ ধরে জীবিকাও নির্বাহ করে থাকে। এমনকি সনাতনী সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচারঅনুষ্ঠানেও এই নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নদীর মিঠাপানি দিয়ে সারাবছর কৃষক তার জমিতে ফসল ফলিয়ে উপজেলাকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে থাকেন। যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায়ও বিরাট অবদান রেখে আসছে।

তাহলে বর্তমানে এই নদীকে মৃত্যুপূরী কেন বলা হচ্ছেএমন প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মাতামুহুরী নদীর অন্তত শতাধিক স্থানে দেদারছে বসানো হয়েছে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালো চালিত বম্ব মেশিন। এসব যন্ত্র দিয়ে পানির সাথে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে তুলে ফেলা হচ্ছে নদীর তলদেশের ভূগর্ভের বালু। এতে মাতামুহুরী নদীর পুরো চকরিয়া অংশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো বড় বড় গর্ত। আর সেসব গর্ত পরিণত হয়েছে একেকটা চোরাবালিতে। এই অবস্থায় গোসল করা, মাছ ধরাসহ প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহারের জন্য যেকোনো বয়সের মানুষ নদীতে নামতেই তলিয়ে যাচ্ছে তলদেশে মানবসৃষ্ট চোরাবালিতে। আর সেখানেই আটকা পড়ে মারা পড়ছে বেশুমার মানুষ।

তিনি জানান, সর্বশেষ গত সোমবার বিকেলে চকরিয়া পৌরসভার হালকাকারা মৌলভীর চর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বাড়ির ধারে গোসল করার জন্য নদীতে যায় একদল কিশোরী। তারা নদীতে পা ফেলতেই একে একে তলিয়ে যায় বালু তোলার কারণে মানবসৃষ্ট চোরাবালিতে। তদ্মধ্যে এক প্রত্যক্ষদর্শী দুইজনকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মুহূর্তেই মারা যায় সমবয়সী দুই কিশোরী মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। এভাবে গত কয়েকবছরে নদীতে মারা পড়েছে শতাধিক মানুষ। তবে গত একমাস ধরে যেভাবে শত শত ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনে ভূগর্ভের বালু তুলে ফেলা হচ্ছে তা মাতামুহুরী নদীর পুরো চকরিয়া অংশজুড়ে হাজারো বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় এখন মৃত্যুপূরীতে রূপান্তর হয়েছে। তাই নদীতে নামার আগেই সকলকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে।

পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের হালকাকারা গ্রামের সচেতন লোকজনের অভিযোগ, শুধুমাত্র হালকাকারা অংশেই অন্তত ছয় স্থানে মাতামুহুরী নদীতে শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এর ফলে নদীর তলদেশে অসংখ্য গর্ত ও চোরাবালির সৃষ্টি হয়েছে। গোসল করতে নেমে ওই চোরাবালিতে আটকে গিয়ে দুই কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে।

সরজমিন মাতামুহুরী নদীবিধৌত চকরিয়া পৌরসভা ছাড়াও উপজেলার সুরাজপুরমানিকপুর, কাকারা, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, কোনাখালী, চিরিঙ্গা, সাহারবিল, বদরখালী ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক স্থানে চলছে অবৈধভাবে বালু তোলার প্রতিযোগিতা। শক্তিশালী ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনে নদীর তলদেশের ভূগর্ভের বালু তুলে ফেলার কারণে নদীটি আজ মৃত্যুপূরীতে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে।

নাম প্রকাশ করা যাবে না এমন শর্ত জুড়ে দিয়ে পরিবেশসচেতন একাধিক ব্যক্তি দৈনিক আজাদীকে বলেন, মাতামুহুরী নদী মূলত কোনো বালুমহাল নয় বা সরকারিভাবে ইজারা দেওয়ারও উপযোগী নয়। এরপরও গত একমাস ধরে হঠাৎ করে পুরো উপজেলাজুড়ে সরকারি দলের ক্ষমতার প্রভাববলয়ে থাকা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক বনে যাওয়ার নেশায় মত্ত হয়ে কলিজা ছিঁড়ে খাওয়ার মতো প্রতিযোগিতায় নেমে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে মাতামুহুরী নদীকে। এই কারণে বর্তমানে মাতামুহুরী নদীতে সৃষ্ট হাজারো বড় বড় গর্তের চোরাবালিতে পরিণত হয়ে মৃত্যুপূরীতে রূপান্তর করা হয়েছে। পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ড চলমান থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা বা উপজেলা প্রশাসন বালুদস্যু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

ক্ষমতার প্রভাববলয়ে থাকা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার কার্যক্রম নেই কেনএমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, যারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে তারা মূলত সরকার দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। মাতামুহুরী নদীর চকরিয়া অংশের কোথাও অবৈধভাবে বালু তোলার খবর পেয়ে অভিযান চালাতে গেলেই সাথে সাথে হস্তক্ষেপ করা হয়।

সরজমিন আরও দেখা গেছে, ড্রেজার ও শ্যালোমেশিনে উত্তোলিত ভূগর্ভের বালু বড় বড় পাইপ দ্বারা সরাসরি মানুষের ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে এবং এসব বালু বিভিন্ন স্থানে ফসলি জমির ওপরও স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। এমনকি ড্রেজার, শ্যালো মেশিনের সাথে বড় বড় পাইপ সংযুক্ত করে অনেকদূর পর্যন্তও এই বালু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে বহুমুখী সমস্যা দেখা দিয়েছে।

মাতামুহুরী নদীকে মৃত্যুপূরীতে রূপান্তর করা নিয়ে জানতে চাইলে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রূপায়ন দেব বলেন, মাতামুহুরী নদীতে অসংখ্য ড্রেজার ও মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে দুর্বৃত্তরা। প্রতিদিনই নদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। যে স্থানের কাছে দুই কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে, তার পাশের আমাইন্যারচর এলাকায় সমপ্রতি অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে এবং প্রায় ৯ লাখ টাকার বালু জব্দ করা হয়েছে। এসি ল্যান্ড আরও বলেন, প্রতিনিয়ত মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানকালে শ্যালো মেশিন, ড্রেজার ও শত শত ফুট পাইপ ধ্বংস করা হচ্ছে। এমনকি তালিকা করে অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের নোটিশও দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও সচেতন থাকতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) জমির উদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বলেন, সরজমিন পরিদর্শনের পর পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান দৈনিক আজাদীকে বলেন, মাতামুহুরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার কোন সুযোগ কাউকে দেওয়া হয়নি। যারা পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাম্পগুলো বন্ধ কেন?
পরবর্তী নিবন্ধহাতুড়ি নিয়ে দোকানে ঢুকে কর্মচারীর ওপর হামলা সেই মাদক কারবারি আটক