মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য

ড. নারায়ন বৈদ্য | রবিবার , ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

পূর্ব প্রকাশিতের পর

অশোক বনে স্বামী বিরহে দুঃখিনী সীতা বসে আছে। বিভীষণের স্ত্রী শর্মা সেখানে উপস্থিত হয়ে সীতাকে প্রণাম করে তার পাশে বসলো। শর্মাকে দেখে সীতা বললো দুই দিন ধরে লঙ্কাপুরীতে হাহাকার শুনছি। কি হয়েছে বলোতো? সেদিন ভয়ংকর যুদ্ধ লক্ষ্য করলাম। গর্জন শুনতে পেলাম তীব্রভাবে। আকাশে বজ্র ও বিদ্যুৎ দেখে কত ভয় পেলাম। যুদ্ধে কে জিতলো বা কে হেরে গেলো কিছুইতো জানি না। আমাকে বলতোকি হলো? সীতার কথার জবাবে শর্মা বলতে লাগলোআপনার ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আপনার দেবর লক্ষণ মেঘনাদকে মেরে ফেলেছে। নিহত মেঘনাদের জন্য লঙ্কাপুরীতে হাহাকার উঠেছে। আর রাণী মন্দতরী কাঁদছেন। লঙ্কাপুরীর সবাই কান্না করছে। এখন মেঘনাদের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া হবে। এ কারণে সাত দিনের জন্য যুদ্ধ বিরতি চলছে এ সময় দুই পক্ষ কোন প্রকার অস্ত্র ধরবে না। মেঘনাদ এর স্ত্রী প্রমীলার স্বামীর সঙ্গে সহ মরণে যাবেন। এ কথা বলতে বলতে শর্মা কেঁদে ফেললো। শর্মার কান্না দেখে সীতাও কেঁদে কেঁদে বলতে লাগলো সবই আমার জন্য হয়েছে। কি কুক্ষণে যে আমার জন্ম। আমার জন্য রাম ও লক্ষণ বনবাসে এলো। পুত্র শোকে রাজা দশরথ মারা গেলেন। আমার জন্যই এ যুদ্ধ। যুদ্ধে দুই পক্ষেরই কত যোদ্ধা মারা গিয়েছে। সবই আমার জন্য। আমার জন্যই বীর মেঘনাদ মারা গেলেন। আজ বিশ্বসুন্দরী প্রমীলা সহ মরণে যাচ্ছেন। সীতার এমন কথা শুনে শর্মা বললোকি বলছেন এসব? কিছুই আপনার জন্য হয়নি। সব কিছুই হয়েছে রাক্ষস রাজ রাবণের জন্য। রাবণ তার পাপের ভারে নিজেও ডুবলেন, লঙ্কাবাসীদেরকেও ডুবাচ্ছেন। এ বলে শর্মা কাঁদতে লাগলো।

লঙ্কাপুরীর পশ্চিম দ্বার খুলে গেল। লক্ষ লক্ষ সৈন্য স্বর্ণদন্ডে রেশমী পতাকা উড়িয়ে সুবর্ণ শয্যায় কুসুমে আবৃত্ত মেঘনাদের মরদেহ নিয়ে আসতে লাগলো। মেঘনাদের মরদেহের পাশে বসে আছেন প্রমীলা সুন্দরী। কপালে সিন্দুর, গলায় পদ্মের মালা। তার কোমল বাহুতে কনকন শোভা পাচ্ছে। দেহে আরো নানাবিধ অলংকার। মুখে নেই হাসি। ধীর স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন তিনি। তিনি সহমরণে চলেছেন। তার কথা ভেবে লঙ্কাপুরীর নারীরা কাঁদছে। পণ্ডিত মন্ত্র পড়তে পড়তে চলেছেন মরদেহের পাশে। বধূগণ স্বর্ণের থালায় বয়ে নিয়ে যাচ্ছে চন্দন কস্তুরী ও বিবিধ ভূষণ। সোনার কলসিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে পবিত্র গঙ্গাজল। শঙ্খ সহ নানা রকম বাদ্য বাজছে। রাক্ষস বধূরা উলু ধ্বনি দিচ্ছে। চিতা সজ্জিত হচ্ছে। রাক্ষস রাজ রাবণ অশ্রুসজল নয়নে পায়ে হেঁটে আসছেন। সঙ্গে নীরবে চলেছেন সভাসদস্যবৃন্দ। দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে রাম খুব কষ্ট পেল। বিপদে মনে কোন শত্রুভাব রাখতে নেই ভেবে মেঘনাদের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে রাম এক হাজার সৈন্য পাঠিয়ে দিল। সাগর তীরে চন্দন কাঠ দিয়ে চিতা সজ্জিত করা হলো। তারপর মেঘনাদের মরদেহকে স্নান করিয়ে রেশমী পোষাক পরিয়ে যথাস্থানে নিয়ে রাখা হলো। পুরোহিতবৃন্দ গম্ভীর স্বরে মন্ত্রপড়তে লাগলেন। প্রমীলা স্নান করে নিজের দেহ থেকে সকল শোভিত স্বর্ণালঙ্কার ও অন্যান্য আবরণ খুলে ফেললেন। সখীদের উদ্দেশ্যে বললেন, এতদিনে পৃথিবীতে আমার জীবন লীলা সাঙ্গ হলো। তোমরা আমার বাবার বাড়ীর দেশে ফিরে যেও। আমার বাবা মাকে সব কথা খুলে বলো। তাদেরকে বলোএ অভাগীর কপালে যা লিখা ছিল তাই ঘটেছে। তারা আমাকে যার হাতে সপে দিয়েছিলেন আমি তার সঙ্গে আছি। আর কি বলবো? তোমরা আমাকে ভুলে যেও না। আমি থাকবো না। তবুও আমাকে মনে রেখো। তোমাদের কাছে এটুকু শুধু মিনতি। এ বলে প্রমীলা চিতায় উঠে স্বামীর পায়ের পাশে বসলেন। শাস্ত্রীয় মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন। নারীরা উলু ধ্বনি দিতে লাগলো। চতুর্দিক থেকে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগলো। দশানন রাজা চিতার কাছে এসে পুত্র এবং পুত্র বধূর জন্য শোক ও সন্তপ্ত হয়ে কান্না করতে লাগলেন। মেঘনাদকে নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল তা বলতে লাগলেন। রাবণের শোকাহত অবস্থা দেখে কৈলাসে শিব চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তার মাথার জটা নাড়তে লাগলো। গলায় জড়ানো সর্প গর্জন করে উঠলো। তার কপাল তৃতীয় নয়ন জ্বলে উঠলো ধপ ধপ করে। পর্বত কাপতে লাগলো থর থর করে। বিশ্ব আতঙ্কিত হলো। যেন মহা প্রলয় উপস্থিত হয়েছে। স্বামীর এমন অগ্নিসূতি দেখে দেবী দুর্গা হাত জোড় করে বলতে লাগলোপ্রভু, তুমি এত রেগে যাচ্ছো কেন? মেঘনাদ বিধির বিধানে নিহত হয়েছে। রাম বা লক্ষণের তো কোন দোষ নেই। তবুও তুমি যদি ওদের ক্ষতি করতে চাও তাহলে আগে আমাকে ভস্ব কর। তারপর রাম লক্ষণের কাছে যাও। দুর্গার এমন কথা শুনে শিব শান্ত হয়ে বললেনতুমি বুঝতে পারছ না। আমার হ্রদয় রাবণের দুঃখে বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। রাবণ কত ভক্তি করে আমাকে পূজা করে। তুমি সেটা জানো। যা হোক তোমার কথায় আমি রাম, লক্ষণকে ক্ষমা করলাম। এ বলে শিব অগ্নি দেবকে ডেকে শীঘ্রই রাক্ষস দম্পতিকে কৈলাসে নিয়ে আসতে বললেন।

শিবের ইশারায় আকাশে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠলো। অগ্নিকণায় জ্বলে উঠলো চিতা। সকলে অবাক হয়ে দেখলেন, অগ্নি রথের সিংহাসনে বসে আছেন মেঘনাদ আর তার বামপাশে প্রমীলা সুন্দরী। স্বর্গের রথ আকাশ পথে ভেসে উড়ে গেল। দেবতাগণ পুষ্প বৃষ্টি করতে লাগলেন। সকলে দুধের স্রোতে চিতার আগুন নিবিয়ে দিলেন। প্রমীলা ও মেঘনাদের ভস্ব জড়ো করে সাগরে নিক্ষেপ করলেন। চিতা স্থল ধৌত করা হলো জাহ্নবীর জল দিয়ে। লক্ষ লক্ষ রাক্ষস চিতার ওপরে স্বর্ণের মন্দির তৈরী করে ফেললো। মঠের চূড়া আকাশে গিয়ে ঠেকলো। লঙ্কার সকল নরনারী সমুদ্র জলে স্নান করে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেল নগরীর স্থলে। বিজয়া দশমীতে দেবী বিসর্জন দিলে যেমন হয় সেভাবে সাত দিন ধরে সমগ্র লঙ্কায় শোকের বাতাস বইতে লাগলো। দিবানিশি সাতদিন শোকের কান্নায় ভরে রইল।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবাংলাদেশে নদীপথে কন্টেনার পরিবহনের সম্ভাবনা থেকে বাস্তবে রূপায়ণ
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ