অষ্টম সর্গ: প্রেতপুরী
চরণ সংখ্যা: ৮১৩ টি। রাজ কার্য শেষে বিশ্রাম করার সময় রাজা যেমন তার মাথার মুকুট খুলে রাখেন তেমনি দীনদেব দিনের শেষে সূর্যকে অস্তাচলে রেখে দিলেন। পৃথিবীর বুকে নেমে এলো রাত্রি। দলে দলে নেমে এলো তারা। আকাশে চাঁদ তার স্নিগ্ধ আলো ছড়াতে লাগলো। বিশাল রণক্ষেত্রে আগুন জ্বলছে এদিকে ওদিকে। সুমিত্রার সন্তান লক্ষণ মৃত্যু শয্যায় পড়ে আছে। পাশে বড় ভাই রামও কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। এ কারণে রামের সকল সেনাপতি বীর হনুমান, বিভীষণ, সুগ্রীব, কুমোদ সবাই মর্মাহত ও বিষন্ন। এমন সময় রাম তার জ্ঞান ফিরে পেল। বিলাপ করতে করতে লক্ষণের সাথে কাটানো কিছু স্মৃতির কথা স্মরণ করতে লাগলো। মৃত লক্ষণকে বলতে লাগলো, লক্ষণ তুই একবার চোখ তুলে তাকা। কোন যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। সীতা উদ্ধারেরও কোন প্রয়োজন নেই। আমরা দুই ভাই পুনরায় বনবাসে চলে যাবো। তোর মায়ের কাছে, তোর স্ত্রীর কাছে কোন মুখে দাঁড়াবো আমি। তুই একবার চোখ তুলে তাকা। এ বলে বলে বিলাপ করতে লাগলো রাম। রামের কান্না দেখে কৈলাসে পার্বতী বা দেবী দুর্গা আর স্থির থাকতে পারলেন না। অশ্রুসজল নয়নে স্বামী শিবের কাছে ছুটে গেলেন। শিব দুর্গা দেবীকে এমন অবস্থার কথা জিজ্ঞাস করলে দেবী দুর্গা বললেন, তুমি তো সব জানো দেব। লঙ্কাপুরীতে লক্ষণকে হারিয়ে রাম কান্না করছে। রাম আমার ভক্ত। আমার ভক্তের এ দুঃসময়ে আমি কিছুই করতে পারছি না। তুমি বল– এরপর কে আমাকে পূজা করবে? এ কথা বলে দুর্গা অভিমান করে বসে রইলেন। তা দেখে মৃদু হেসে শিব দুর্গাকে বললেন, আচ্ছা আমি লক্ষণকে বাঁচিয়ে তোলার উপায় বলে দিচ্ছি। তুমি মায়া দেবীর সঙ্গে রামকে মৃত্যুপুরী বা প্রেতপুরীতে পাঠাও। সেখানে রাজা দশরথ আছেন। তিনি বলে দেবেন লক্ষণকে কিভাবে বাঁচানো যাবে। মৃত্যুপুরীতে যাওয়ার পর বৃদ্ধ পিতা রামকে পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে আকুল হয়ে গেল। পিতা দুই হাত বাড়িয়ে পুত্রকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো– কতদিন পর তোকে দেখলাম। তুই বনবাসে যাওয়ার পর তোর শোকে আমি মারা গিয়েছিলাম। তারপর বৃদ্ধ পিতা রামের কাছে এখানে অর্থাৎ মৃত্যুপুরীতে আসার কারণ জানতে চান। রাম বললো– লঙ্কার রাজা রাবণ আমার ভাই লক্ষণকে মেরে ফেলেছে। তাকে ফিরে না পেলে আমারও বাঁচার দরকার নেই। লক্ষণকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবো না। এ কথা বলে রাম কাঁদতে লাগলো। পুত্রের (রামের) কান্না দেখে দশরথ (পিতা) বললো, লক্ষণের দেহে এখনো প্রাণ আছে। গন্ধমাধব নামে এক পর্বত আছে। উক্ত পর্বতের চূড়ায় ‘বিশল্য করলি’ নামে এক লতা গাছ আছে। একেবারে অব্যর্থ মহৌষধ। এ ‘বিশল্য করলি’ দিয়ে লক্ষণকে বাঁচানো যাবে। তুমি শীঘ্রই ফিরে যাও। বায়ুপুত্র হনুমানকে পাঠিয়ে দিয়ে যেন ঝড়ের গতিতে সেই লতাগাছ নিয়ে আসে। রাত পোহাতে বেশি দেরি নেই। রাত ফুরিয়ে গেলে ঔষধ কাজ করবে না। রাত ফুরাবার আগেই কাজ সম্পন্ন করতে হবে। শীঘ্রই চলে যাও। এ বলে দশরথ পুত্র রামকে বললেন, মনে কোন দুঃখ করিও না। যুদ্ধে তোরই জয় হবে। রাবণ স্ববংশে নিহত হবে। আর পুত্রবধূ, কুলবধূ সীতা ঘর আলো করে অযোধ্যায় ফিরে আসবে। তবে ভাগ্যে তোর সুখ নেই। এ বলে দশরথ পুত্রকে আশীর্বাদ করলেন। পিতাকে প্রণাম করে লঙ্কা ফিরে আসলো রাম।
নবম সর্গ: সংস্ক্রিয়া
চরণ সংখ্যা: ৪৪৩টি
রাত পার হয়ে ভোর হলো। রামের সৈন্যদের নিকট থেকে এবং শিবির থেকে আনন্দের ধ্বনি ভেসে আসতে লাগলো। এ সময় স্বর্ণ লঙ্কার রাজ প্রাসাদের সিংহাসনে বসে আছেন রাক্ষসরাজ রাবণ। রামের শিবিরে জয় উল্লাস শুনতে পেয়ে তিনি মন্ত্রী সারণকে জিজ্ঞাস করলেন– মন্ত্রী বলতো কি হচ্ছে সেখানে? যেখান থেকে কান্নার ধ্বনি ভেসে আসার কথা সেখান থেকে কেন আনন্দের ধ্বনি ভেসে আসতেছে। তা হলে কি লক্ষণ বেঁচে উঠলো। দ্রুত ব্যাপারটা জেনে এসে আমাকে বলো। ওদের তো অসাধ্য কিছুই নেই। সমুদ্রের জলে ওরা পাথর ভাসাতে পারে। দুইবার মরেও বেঁচে উঠেছে রাম। যা হোক ওদের আনন্দের কারণটা জেনে এসো। রাবণের কথার জবাবে মন্ত্রী সারণ– রাম বেঁচে উঠার পুরো কাহিনী রাবণকে শুনালো। এজন্যই রামের শিবির থেকে আনন্দের ধ্বনি ভেসে আসছে। এ কথা শুনে রাবণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন– বিধির বিধান কে খণ্ডাবে বলো। সম্মুখের যুদ্ধে যাকে আমি মেরে ফেললাম সে আবার দৈব শক্তিতে বেঁচে উঠলো। কি আর বলবো, সবই আমার ভাগ্য। না হলে মৃত্যু কি কখনো তার নিজের স্বভাব ভুলে যায়? এখন আমি বুঝতে পারছি। আমাদের আর বাঁচবার আশা নেই। সবই ভাগ্য। আর ভাগ্যকে মেনে নিতে হবে। আর কোন উপায় দেখছি না। তুমি আমার দূত হয়ে রামের কাছে যাও। গিয়ে বলো– আমি আমার ছেলে মেঘনাদের অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার জন্য সাত দিনের যুদ্ধ বিরতি চাচ্ছি। মন্ত্রী সারণ রাবণের কথা মত রামের শিবিরে গিয়ে রাবণের কথাগুলো বললো। তা শুনে রাম সারণকে বললো– তুমি তোমার রাজাকে গিয়ে বলো তিনি যা বলেছেন তাই হবে। আমরা সাত দিনের জন্য যুদ্ধ বিরতি দিচ্ছি। সাতদিন আমরা কেউ কোন প্রকার অস্ত্র ধরবো না। তাকে সুন্দরভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করতে বলো। একজন ধার্মিক কখনো অন্যের ধর্ম কাজে বাধা দেয় না। রামের মুখ থেকে এ কথা শুনে মন্ত্রী সারণ সেখান থেকে চলে আসলো। (চলবে)
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।










