মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য

ড. নারায়ন বৈদ্য | রবিবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সপ্তম সর্গ: শক্তি নির্ভেদ

চরণ সংখ্যা: ৭৭৩ টি। আকাশে সূর্য উঠেছে। রামের বনে সবাই সকালে স্নান সেরে উৎফুল্ল মনে অবস্থান করছেন। এদিকে প্রমীলা স্নান সেরে সুন্দর সাজে সজ্জিত হতে লাগলেন। কিন্তু কাকন পরিতে গিয়ে দেখলেন তিনি কাকন পরতে পারছেন না। তিনি সখী বাসন্তীকে ডেকে বললেন, লঙ্কায় কি হয়েছে? চতুর্দিকে হাহাকার শুনতে পাচ্ছি। তাছাড়া আমার কেমন জানি লাগছে। বাম চোখটা নাচছে। তুমি আমার স্বামী মেঘনাদের কাছে যাও। তিনি যেন আজ যুদ্ধে না যান। বাসন্তী বললোচতুর্দিকে কোলাহল হচ্ছে। বরং আমরা প্রথমে রাণী মন্দতরীর কাছে যাই। তিনি শিবের মন্দিরে পূজা করছেন। তারপর প্রমীলা ও বাসন্তী শিব মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কৈলাসে শিব অত্যন্ত মনমরা হয়ে বসে আছেন। দেবী দুর্গা মহাদেবের কাছে জানতে চাইলেন তার মনমরা হয়ে বসে থাকার কারণ। শিব বললেন, তোমার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে। যুদ্ধে মেঘনাদ লক্ষণের হাতে নিহত হয়েছে। রাবণ, পুত্র শোকে এখন পাগল হয়ে যাবে যদি আমি তাকে না বাঁচায়। সে আমার পরম ভক্ত। তোমার অনুরোধে এবং দেবরাজ ইন্দ্রের অনুরোধে আমি করেছি। এখন আমি রাবণের জন্য কিছু করবো। তুমি কিছু বলতে পারবে না। এ কথা শুনে দেবী দুর্গা বললেন, তোমার যেটা ইচ্ছা তাহাই করো। তবে একটা কথা মনে রেখো, রাম আমার পরম ভক্ত। মহাদেব শিব তখন বীরভদ্রকে ডেকে রাবণের কাছে গিয়ে মেঘনাদের মৃত্যুর খবর জানিয়ে দিতে বললেন। বীরভদ্র আকাশ পথে উড়তে উড়তে লঙ্কাপুরীতে পৌঁছালো। একজন দূতের ছদ্মবেশে রাবণকে মেঘনাদের মৃত্যু সংবাদ দিল। রাবণ এ খবর শুনে সিংহাসন থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন এবং অজ্ঞান হয়ে গেলেন। জ্ঞান ফিরে এলে মেঘনাদের হত্যাকারীর পরিচয় জানতে চাইলেন। বীরভদ্র মেঘনাদকে হত্যার পুরো ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলো। বীরভদ্র চলে গেলে রাবণ সকল যোদ্ধাকে প্রস্তুত হতে বললেন। সমগ্র লঙ্কাপুরী উন্মাদনায় মেতে উঠলো। লঙ্কাপুরীর সকল যোদ্ধারা নানা রকম অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলো। অশান্ত হলো লঙ্কাপুরী। সমুদ্রে গর্জন শুরু হলো। রাবণের যুদ্ধের প্রস্তুতির কথা রাম জানতে পারলো। রাম তার সকল সেনাপতিকে ডেকে কিভাবে যুদ্ধের মোকাবেলা করা যায় এবং রাবণের আক্রোশ থেকে লক্ষণকে বাঁচানো যায় তার পরামর্শ করতে লাগলেন। তাছাড়া রাবণকে কিভাবে বধ করা যায় তা নিয়ে পরামর্শ করতে লাগলেন।

এদিকে লঙ্কাপুরীর রাক্ষস বাহিনীর রণসজ্জা দেখে লক্ষ্মীদেবী দেবরাজ ইন্দ্রের কাছে গেলেন। দেবরাজ ইন্দ্র স্বর্গে মেঘনাদ বধ হওয়াতে আনন্দ অনুষ্ঠান করছিলেন। লক্ষ্মীদেবী দেবরাজ ইন্দ্রকে বললেন, রাবণ খুব রেগে গিয়েছে। তার ক্রোধ থেকে লক্ষণকে কিভাবে বাঁচাবে তা নিয়ে ভাবো। লক্ষণ তোমাকে সাহায্য করতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। তুমি তাকে রক্ষা করো। লক্ষ্মীদেবীর এ কথা শুনে ইন্দ্র বললো, সকল দেবতারা প্রস্তুত হয়ে আছে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা সবাই লঙ্কাপুরীতে গিয়ে রামের পক্ষে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। তখন লক্ষ্মীদেবী ইন্দ্রকে আশির্বাদ করে ফিরে আসলেন। যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে সমগ্র লঙ্কা প্রস্তুত। এমন সময় মেঘনাদের মা মন্দতরী পাগলের ন্যায় দৌড়ে এসে রাবণের পায়ে আঁছড়ে পড়লেন। রাবণ তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন, তিনি তার পুত্র হত্যার প্রতিশোধ অবশ্যই নিবেন। এরপর মন্দতরী চলে গেলে রাবণ যুদ্ধের জন্য বের হয়ে পড়লেন।

যুদ্ধ শুরু হলো। শুধু রাম ও রাবণের যুদ্ধ নয়। রামের সাথে যোগ দিয়েছে দেবতারাও। দেবতারা রাম সেনাদের আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছেন। রাবণ এতে আরো বেশি রেগে গেলেন। প্রচন্ড গর্জনে ও দুরন্ত বেগে রাবণের রথ চলতে লাগলো। সামনে এসে দাঁড়ালেন দেব সেনাপতি কার্তিক। রাবণ বলল, আমি তোমার পিতাকে অর্থাৎ শিবকে পূজা করি। তুমি আমার সামনে থেকে সরে যাও। আমি পুত্র হত্যার প্রতিশোধ নেবো। লক্ষণকে হত্যা করবো। লক্ষণ অন্যায় যুদ্ধে আমার পুত্রকে হত্যা করেছে। কার্তিক রাবণকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশে লক্ষণকে রক্ষা করতে এসেছি। তুমি যদি পার তবে আমাকে পরাজিত করে লক্ষণের কাছে যাও। শুরু হলো দেব সেনাপতি কার্তিক ও রাবণের যুদ্ধ। যুদ্ধে দেব সেনাপতি কার্তিক, রাবণের কাছে পরাজিত হয় পথ ছেড়ে দিলেন। এরপর মুখোমুখি হলো দেবরাজ ইন্দ্র। দেবরাজ ইন্দ্রকে দেখে রাবণ খুব রেগে গেলেন। বললেন, আমার পুত্র মেঘনাদকে মেরে যুদ্ধ করার জন্য নির্লজ্জের মত লঙ্কপুরীতে এসেছো। তুমি অমর। নাহলে তোমাকে অবশ্যই যমপুরীতে পাঠিয়ে দিতাম। ইন্দ্রের সাথে রাবণের যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধে ইন্দ্র পরাজিত হলেন। এরপর রামের সেনাপতিরা একে একে রাবণের মুখোমুখী হতে লাগলো। সবাইকে পরাজিত করে রাবণ এগিয়ে যেতে লাগলেন। এমন সময় রামচন্দ্র রাবণের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রাবণ, রামকে বললেন, আমি তোমাকে চাই না। আমি তোমার ভাই লক্ষণকে চাই, যে অন্যায়ভাবে আমার পুত্রকে হত্যা করেছে। তখন রাবণ লক্ষণকে দেখতে পেলেন এবং লক্ষণের দিকে রাবণ এগিয়ে গেলেন। শুরু হলো রাবণ ও লক্ষণের যুদ্ধ। লক্ষণ ভালো যুদ্ধ করছে দেখে রাবণ বললো যুদ্ধতো ভালই শিখেছো। কিন্তু তোমাকে আমার হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। তোমাদের দেবতারা আমার পুত্রকে হত্যা করতে তোমাকে সাহায্য করেছে। তোমার ভাই সহ সকল যোদ্ধাকে ডেকে আনলেও তুমি আমার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। একথা বলে রাবণ তার মৃত পুত্রের কথা স্মরণ করে শক্তিশালী অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন। সেই আঘাতে লক্ষণ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো এবং মারা গেল। মৃত লক্ষণের দেহ নেয়ার জন্য রাবণ ছুটে গেলেন তার কাছে। তখন কৈলাসে দেবী দুর্গা শিবের পায়ে লুটিয়ে পড়লেন। শিবকে বললেন, রাবণ যেন লক্ষণের মৃতদেহ নিয়ে যেতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে। মহাদেব শিব তখন বীরভদ্রকে পাঠিয়ে দিলেন রাবণের কাছে। বীরভদ্র লঙ্কাপুরীতে গিয়ে রাবণের কানে কানে বললেন, যুদ্ধে তো জিতে গিয়েছ এখন মৃত লক্ষণের লাশ দিয়ে কি করবে। তখন রাবণ লক্ষণের মৃতদেহ ফেলে অট্ট হাসিতে হাসতে হাসতে লঙ্কাপুরীতে ফিরে গেলেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ