মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য

ড. নারায়ন বৈদ্য | রবিবার , ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:১৬ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ষষ্ঠ সর্গ (বধ)

চরণ সংখ্যা৭৪০টি। লক্ষণ সেই ঘন বন সরোবরে চণ্ডী দেবীর মন্দির ঘুরে এলো। এসে বড় ভাই রামকে প্রণাম করে সেখানে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা রামকে বর্ণনা করলো। এরপর বড় ভাই এর নিকট মেঘনাদ বধ করতে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইল। রাম খুব চিন্তিত হয়ে পরলো লক্ষণকে অনুমতি দিতে গিয়ে। রাম ভাই লক্ষণকে বললো, চলো আমরা ফিরে যাই। সীতা উদ্ধারে কাজ নেই। মেঘনাদের মত বীরের সাথে তুমি পারবে না। আর আমি তোমাকে হারাতে চাই না। আমরা শুধু শুধু এখানে এসেছি। বড় ভাই রামের মুখে এমন কথা শুনে লক্ষণ রামকে আশ্বস্ত করতে লাগল যে, আমাদের সাথে সকল দেবতা আছে। যেহেতু দেবতারা রামের পক্ষে আছেন সেহেতু কোন ভয় নেই। মেঘনাদ যত বড় বীর যোদ্ধা হউক না কেন লক্ষণের হাতেই তার পরাজয় নিশ্চিত। কিন্তু এসব শুনেও রাম নিজকে বুঝাতে পারছেন না। বনবাসে আসার সময় লক্ষণের মা সুমিত্রা লক্ষণকে রামের হাতে তুলে দিয়েছেন। লক্ষণের কিছু হয়ে গেলে রাম সুমিত্রাকে কী জবাব দেবে? তাই রাম চাইছে না লক্ষণ যুদ্ধে থাক। রাম এ কথা বলার পর সারা আকাশ জুড়ে মৃদু তিরস্কার ধ্বনিত হতে লাগলো। এর ধ্বনিত প্রকম্পিত কথা ছিল এ রকম– ‘ছি: ছি: ছি: তুমি দেবতাদের কথাকে অমান্য করছো। তুমি মূর্খ আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখো’। রাম তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলময়ুর ও সাপের যুদ্ধ চলছে। যেখানে সাপ ময়ুরের কাছে স্বাভাবিকভাবে পরাজিত হয়, সেখানে রাম দেখতে পেল ময়ুর কত সহজে সাপের কাছে পরাজিত হয়ে গেল। এ দৃশ্য দেখে বিভীষণ রামকে বললো, আজ দেবতাদের কৃপায় সব অসম্ভবই সম্ভব হবে। রাম আর দ্বিমত করলো না। অনুমতি দিয়ে ভাই লক্ষণকে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত করে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিল। লক্ষণ এবং বিভীষণ মায়া দেবীর কৃপায় সকল রাবণ সেনাদের নিকট থেকে অদৃশ্য হয়ে লংকাপুরীতে গমন করলেন। ধীরে ধীরে নিকোন ভিলা যজ্ঞাগারে প্রবেশ করলো। দেবতাদের অজেয় ইন্দ্রজিৎ (মেঘনাদ) রেশমী কাপড় পড়ে পূজার সাজে সজ্জিত হয়ে পূজায় বসে আছেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মায়া বলে লক্ষণ ও বিভীষণ সেখানে প্রবেশ করলো। নিঃশব্দ কক্ষে কারো প্রবেশের অনুমান করে মেঘনাদ থাকালেন। মেঘনাদ মনে করলেন তিনি শিবের পূজা করছেন বলে শিব তুষ্ট হয়ে তার কাছে কোন দূত প্রেরণ করেছেন। তিনি জানতে চাইলেন, কেন দেবতা তার শত্রু লক্ষণের রূপ ধরে এখানে এসেছেন। এ কথা শুনে লক্ষণ বললেন, মেঘনাদ ভুল করছো। আমি কোন দেবতা বা দেবতার দূত নয়। আমি লক্ষণ। দেবতার আদেশে আমি তোমাকে হত্যা করতে এসেছি। মেঘনাদ যেন এখন তার সাথে যুদ্ধ করে। মেঘনাদ যখন বুঝতে পারলেন যে সে আসলেই লক্ষণ, তখন মেঘনাদ বিস্মিত হলেন যে, এ গৃহে কেউ যখন প্রবেশ করতে পারে না এবং কারো প্রবেশের অনুমতিও নেই সেখানে লক্ষণের মত একজন সামান্য মানুষ প্রবেশ করে কিভাবে? মেঘনাদ বললো, অবশ্যই যুদ্ধ করবো। কিন্তু লক্ষণ যেহেতু মেঘনাদের ঘরে এসেছে সেহেতু লক্ষণ তার অতিথি। লক্ষণ কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুক। আর এ সময়ে মেঘনাদ যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে আসুক এবং অস্ত্র নিয়ে আসুক। মেঘনাদ এখন পুজো করছেন এবং তার সাথে কোন অস্ত্র নেই। এ কথা শুনে লক্ষণ হেসে উঠলো এবং কোন প্রকার অস্ত্র ছাড়াই তার সাথে যুদ্ধের আহ্বান জানালো লক্ষণ। লক্ষণকে তিরস্কার করে মেঘনাদ বললেন অস্ত্র ছাড়া যুদ্ধ হয় না। তাছাড়া তা নিয়ম নয়। একজন বীর যোদ্ধা হয়ে কিভাবে যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারে? সবাই হাসবে। এতেও লক্ষণকে গলানো গেল না। ফলে মেঘনাদ প্রচন্ড রাগে একটি খোসা তুলে নিয়ে লক্ষণের মাথায় ছুড়ে মারলেন। এতে লক্ষণের মাথা ফেটে রক্ত পড়তে লাগলো। লক্ষণ জ্ঞান হারালো। এ সুযোগে মেঘনাদ লক্ষণের পড়ে যাওয়া অস্ত্র নিজ হাতে তুলে নিতে গেলেন। কিন্তু পারলেন না। কে যেন মেঘনাদের সব শক্তি তুলে নিয়েছে। মেঘনাদ অস্ত্রগারের দিকে তাকালেন। দেখলেন সেখানে মেঘনাদের কাকা অস্ত্রাগারের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কাকা বিভীষণকে দেখে মেঘনাদ সহজে বুঝতে পারলেন কিভাবে লক্ষণ এখানে প্রবেশ করেছে। বিভীষণকে দেখে মেঘনাদ তীর্যক স্বরে বললেন কাকা, কেন তুমি রামদের দাসত্ব করছো? আপনার জন্ম রাক্ষস বংশে। কেউ কি নিজের ঘর শত্রুকে চিনিয়ে দেয়। বিভীষণ কেন নিজকে রামের কাছে বিক্রী করে দিয়েছে। বিভীষণ বললো, আমি নিরুপায়। রাক্ষস রাজ রাবণ যে পাপ করেছে সেই পাপে রাক্ষস বংশ এবং এই লঙ্কাপুরী ডুবে যাবে। তাই নিজেকে বাঁচানোর জন্যই বিভীষণ এমনটা করেছে। কারণ কারো পাপের ভার সেই নেবে না। এ কথা শুনে মেঘনাদ রেগে গেলেন এবং বিনয়ের সাথে বললেন দরজা ছেড়ে দাঁড়াতে। আমি অস্ত্রাগারে গিয়ে সেখান থেকে অস্ত্র এনে লক্ষণকে সমুচিত শাস্তি দেবো। কিন্তু বিভীষণ সরে দাঁড়ালো না। এর মধ্যে লক্ষণের জ্ঞান ফিরে আসলো। এ সময় লক্ষণ একটি তীর মেঘনাদের পিঠের দিকে ছুঁড়লো। তীরের আঘাতে মেঘনাদ আহত হয়ে ছটফট করতে লাগল। এসময় মেঘনাদ যা হাতের কাছে পেল তা লক্ষণের দিকে ছুড়ে মারলো। কিন্তু লক্ষণের গায়ে লাগলো না। মেঘনাদ দেখতে পেলেন সব দেবতারা লক্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সব আশা ছেড়ে দিয়ে মেঘনাদ ভাগ্যকে মেনে নিলেন। এদিকে নিজের অজান্তে মাথার সিন্দুর মুছে ফেললেন প্রমীলা। শিশুরা হঠাৎ করে চিৎকার করতে শুরু করলো। রাণী মন্দতরী জ্ঞান হারালেন। মৃত্যু শয্যায় শায়িত মেঘনাদ লক্ষণকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, আমি বীর মেঘনাদ, যুদ্ধে অনেককে পরাজিত করেছি। রাবণের বীর সন্তান আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। কিন্তু তোর মত একজন নিকৃষ্ট যোদ্ধার হাতে আমাকে প্রাণ দিতে হলো। এটাই দুঃখ আমার। বিধাতা এমন কেন করলেন বুঝতে পারছি না। যা হোক, আমি মারা যাচ্ছি। আমার মৃত্যুর খবর যখন আমার পিতা রাক্ষস রাজ জানতে পারবে তখন তোমার কি হাল হবে? কোথায় পালাবে? ছেলে হত্যার প্রতিশোধ নেবে আমার পিতা। কোন দেবতার সাধ্য নেই তোমাকে আমার পিতার হাত থেকে রক্ষা করবে। আর তুমি যে অন্যায় করেছো সেই কথা পৃথিবীর বুকে আজীবন লিখা থাকবে। তার মা মন্দতরীর মুখ ও স্ত্রী প্রমীলার মুখ মনে করতে করতে মেঘনাদ মারা গেলেন। ইতিমধ্যে বিভীষণের লুপ্ত শক্তি ফিরে এল। সেই চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। লক্ষণ তখন বিভীষণের কাছে এসে তাকে সান্তনা দিতে লাগল। তারপর দুইজন যেভাবে অদৃশ্য মায়ায় এসেছিল সেভাবে রামের শিবিরে ফিরে গেল। লক্ষণের মুখে মেঘনাদকে বদ করার পদ্ধতি শুনে রাম তাকে বুকে টেনে নিল। বিভীষণের কাছেও রাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো। দেবতারাও খুশি হলেন। আকাশ থেকে রামের বনে পুষ্প বৃষ্টি হতে লাগলো।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ