মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য

ড. নারায়ন বৈদ্য | রবিবার , ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ at ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পঞ্চম সর্গ: উদ্যোগ

গভীর রাত। স্বর্গপুরীতে সবাই ঘুমে নিমজ্জিত। শুধু ঘুম নেই দেবরাজ ইন্দ্রের চোখে। শয্যা ত্যাগ করে ইন্দ্র চিন্তিত মনে সিংহাসনে বসে আছেন। ইন্দের স্ত্রী সচি দেবী তা দেখে এত চিন্তিত হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ইন্দ্র বললো কাল যুদ্ধে রামের কি অবস্থা যে হবে তার জন্য তিনি চিন্তিত। ইন্দ্রের মুখে সচিদেবী তা শুনে বললেন, যেখানে স্বয়ং শিব, দূর্গাদেবী এবং দেবতারা রামের পক্ষে আছেন সেখানে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই। ইতিমধ্যে কার্তিকের সব অস্ত্র লক্ষণকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। তাই চিন্তিত হওয়ার কোন কারণ নেই। এই সময় ইন্দ্রের সভায় মায়াদেবী আসলেন। মায়াদেবীর আগমন দেখে ইন্দ্র এর কারণ জানতে চাইলেন। তখন মায়াদেবী বললেনআমি তোমার মনের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এসেছি। তুমি চিন্তা করো না। আমি এখন লংকাপুরী যাব। মায়া বলে মেঘনাদের শক্তি হরণ করে নেব। তারপর লক্ষণ মেঘনাদকে হত্যা করবে। তবে মেঘনাদের মৃত্যুর খবর যখন রাবণ জানবে তখন রাবণের হাত থেকে রাম, লক্ষণ ও বিভীষণকে কিভাবে বাঁচাবো তা ভেবে পাচ্ছি না। তখন ইন্দ্রের স্ত্রী সচি দেবী, মায়া দেবীকে আশঙ্কা মুক্ত করার জন্য বললেন সেটা আমি দেখবো। একবার মেঘনাদ নিহত হলে পরের সবকিছু আমরা সামলে নেব। মেঘনাদকে হত্যা করার পর রাম ও লক্ষণকে রক্ষা করার জন্য আমি দেব সৈন্যদের নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো। সচিদেবীর এমন কথা শুনে মায়াদেবী সেখান থেকে চলে গেলেন। এরপর দেবরাজ ইন্দ্র চিন্তামুক্ত হয়ে ঘুমাতে গেলেন। তখন মায়াদেবী স্বপ্ন দেবীর কাছে এসে বললেন। তুমি শীঘ্রই লংকাপুরীতে গিয়ে লক্ষণকে তার মা সুমিত্রা রূপ ধরে স্বপ্ন দেখাবে। স্বপ্নে বলবে লংকাপুরীর উত্তর দিকে দেবী দূর্গার মন্দির অবস্থিত। তার পাশে একটি সরোবর আছে। সেখানে গিয়ে স্নান করে পবিত্র হয়ে সেই মন্দিরে দেবী দূর্গার পূজা করতে। দেবীর কৃপাতে লক্ষণ মেঘনাদকে হত্যা করতে পারবে। মায়াদেবীর কথামত স্বপ্ন দেবী লক্ষণের মায়ের রূপ ধরে লক্ষণকে স্বপ্ন দেখালেন। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল লক্ষণের। তারপর লক্ষণ তার ভাই রামের কাছে গিয়ে স্বপ্নের সব কথা খুলে বললেন, তখন রাম বিভিষণকে সাথে নিয়ে তার ভাই লক্ষণকে সেই মন্দিরে পূজা করতে বললেন। লক্ষণ দেবী দূর্গার মন্দিরে গিয়ে পূজা করতে লাগলেন। দেবী দূর্গা পূজা পেয়ে তার আসল রূপ ধরে সেখানে হাজির হয়ে বললেন, তুমি সুমিত্রার পুত্র। তুমি বিভিষণকে সাথে নিয়ে সোজা নিকুন ভিলা যজ্ঞাগারে পৌঁছে যাও। এখানে প্রবেশের সময় আমি তোমাদের অদৃশ্য করে দেবো যেন কেউ তোমাদের দেখতে না পায়। তারপর মেঘনাদ যখন অগ্নিদেবের পূজা করবে তখন তুমি মেঘনাদকে হত্যা করবে। দেবীর এমন কথা শুনে লক্ষণ খুশী হয়ে সেখান থেকে ফিরে আসলেন। এদিকে প্রায় সকাল হয়ে গিয়েছে। মেঘনাদ ঘুম থেকে উঠলেন। মেঘনাদ ঘুম থেকে উঠে এবং স্ত্রী প্রমিলাকে ডেকে তুললেন। তারপর দুইজনে গেলেন মেঘনাদের মা মন্দতরীর কাছে আশির্বাদের জন্য। মন্দতরীর গৃহে পৌঁছালে ত্রিজঠা নামে রাক্ষস মেঘনাদকে বললো, রাণী মা মেঘনাদের মঙ্গলের জন্য শিবের মন্দিরে পূজা করছেন। মেঘনাদ ও প্রমিলা মন্দতরীর কাছে আসলেন মন্দতরীর পুত্র মেঘনাদকে আশির্বাদ করে প্রমিলাকে বললেন যেন সে তার কাছে থাকে। মন্দতরী পুত্র মেঘনাদকে যুদ্ধে জয়ের জন্য আশির্বাদ করার পর মেঘনাদ বললেন, তুমি চিন্তা করো না মা। আমি যুদ্ধে লক্ষণকে হত্যা করে বিভীষণকে বেঁধে এনে লংকাপুরী শত্রুমুক্ত করবো। তারপর তোমার কাছে ফিরে আসবো। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেঘনাদ ফিরে আসার সময় স্ত্রী প্রমিলা মেঘনাদকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। প্রমিলা বললা, আমার কত ইচ্ছা ছিল আমি নিজ হাতে তোমাকে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে দেবো। সেটা রাণী মা মন্দতরীর জন্য সম্ভব হলো না। তিনি আমাকে তার কাছে রেখে দিলেন। তোমাকে ছেড়ে দিতে আমার মন চাইছে না। মেঘনাদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেলেন। মেঘনাদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে প্রমিলা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেবী দূর্গাকে স্মরণ করলেন। এ রাজ্যের জন্য প্রার্থনা করতে লাগলেন। তার প্রার্থনা আকাশে ভাসতে ভাসতে দেবী দূর্গার কাছে আসতে লাগলো। এটা দেখে দেবরাজ ইন্দ্র, খুবই ভয় পেলেন। দেবরাজ ইন্দ্র ভাবলেন, দেবী দূর্গা যদি তার প্রার্থনা শুনে মেঘনাদের পক্ষে চলে যায়? তাই ইন্দ্র, বায়ুদেবকে বললেন, বায়ু কৈলাস থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে। ইন্দ্রের কথা মত বায়ুদেব কৈলাসের দিকে বায়ু প্রবাহিত না করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। ফলে প্রমিলার প্রার্থনা দেবী দূর্গার নিকট পৌঁছায়নি। এদিকে প্রমিলা দূর্গা দেবীর কাছে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করে ঘরে ফিরে আসলেন। যমুনায় কৃষ্ণকে কাঁদতে কাঁদতে এভাবে বিদায় দিয়ে রাধা ঘরে ফিরে এসেছিলেন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ,

গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ