মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও মেধনাদবধ কাব্য

ড. নারায়ন বৈদ্য | রবিবার , ৪ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২৭ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

চতুর্থ সর্গ: অশোকবন

লংকা নগরীর সবাই আজ আনন্দে মগ্ন। রাত্রি হওয়া সত্ত্বেও কারো চোখে ঘুম নেই। কারণ সবাই জানে আগামীকাল সকালে রামের বিরুদ্ধে মেঘনাদ যুদ্ধে নামবেন। রাম ও লক্ষণকে হত্যা করে লংকাকে শত্রুমুক্ত করবেন। বিশ্বাসঘাতক বিভিষণকে বেঁধে নিয়ে আসবেন। তখন স্বর্ণলংকা রক্ষা পাবে। তাছাড়া পূর্বের মত অবস্থা ফিরে আসবে। এদিকে বিভীষণের স্ত্রী শরমা এক কৌটা সিন্দুর নিয়ে সীতার কাছে আসলো। সীতার দুঃখ দেখে শরমা কাঁদতে লাগলো। শরমা সীতাকে বললোতোমার এমন বিধবা বেশ দেখে ভালো লাগছে না। আমি সিন্দুর নিয়ে এসেছি। তোমার কপালে ভরিয়ে দিতে চাই। তুমি কিছু মনে করো না। তারপর শরমা সীতাকে সিন্দুর পরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, রাবণ কিভাবে সীতাকে হরণ করে এখানে নিয়ে এসেছে? অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর সীতা তাকে হরণ করার সব কথা বলতে লাগলো। রাম লক্ষণ এবং আমি সেই গোদাবড়ি নদীর তীরে পঞ্চবটি বনে খুব সুখেই দিন পার করছিলাম। কিন্তু সেখানে বিপত্তি ঘটালো তোমার ননদ, রাবণের বোন সর্পনখা। সে এসে আমাকে মেরে রামকে বিবাহ করতে চাইলো। এটা শুনে লক্ষণ রাগান্বিত হয়ে সর্পনাখাকে আঘাত করলো। তখন রাম ও লক্ষণের সাথে রাবণের সৈন্য রাক্ষসদের তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো। সেই যুদ্ধ দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না। রাম আমাকে তুলে ঘরে নিয়ে গেল। তারপর রাক্ষস সোনার হরিণের ছদ্মবেশ নিয়ে এসেছিল। আমি সেই হরিণ দেখে রামকে বললামহরিণটি আমাকে ধরে এনে দিতে। তারপর রাম, লক্ষণকে আমার সাথে রেখে সেই হরিণটি ধরতে চলে গেল। মায়া হরিণের পিছু ছুটতে ছুটতে রাম গহীন বনে প্রবেশ করল। কিছুক্ষণ পর আমরা শুনতে পেলাম, রাম কাঁদতে কাঁদতে লক্ষণের সাহায্য প্রার্থনা করছে। রাম বলছে লক্ষণ তুই কোথায়? আমি মারা যাচ্ছি। রামের কাতর কণ্ঠ শুনে আমি খুব ভয় পেলাম। লক্ষণকে বললাম তাড়াতাড়ি গিয়ে রামকে সাহায্য করতে। কিন্তু লক্ষণ যেতে চাইল না। কিছুক্ষণ পর রামের আর্তনাদ ভেসে আসলে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। রামকে গিয়ে সাহায্য করার জন্য আমি লক্ষণকে পুনরায় অনুরোধ করলাম। এবারও লক্ষণ রামকে সাহায্য করতে যেতে অস্বীকৃতি জানালো। এবারও আমার বেশ রাগ হলো। আমি লক্ষণকে নিষ্ঠুর, রঘু বংশের গ্লানি বলে গালমন্দ করতে লাগলাম। এতে লক্ষণ রাগে অভিমানে আমাকে ঘরে নিরাপদ থাকতে বলে রামকে সাহায্য করার জন্য চলে গেল। এরপর অনেকক্ষণ সময় চলে গেল। রাম, লক্ষণ কেউ আসছে না দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এমন সময় এক সন্যাসীকে দেখতে পেলাম। যোগী পুরুষ, আগুনের মত তেজস্বী, হাতে কমুন্ডল, মাথায় জটা। সেই যোগী আমার কাছে ভিক্ষা চাইলেন আমি সন্যাসীকে বললাম, এখন লক্ষণ তার ভাই রামকে নিয়ে ফিরে আসবেন। আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সন্যাসী খুব রেগে গেলেন। আমাকে অভিশাপ দিবে বললেন। এতে আমি ভয় পেয়ে লজ্জা শরম ত্যাগ করে লক্ষণের নিষেধ অমান্য করে ভিক্ষা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসলাম। এমন সময় সন্যাসী তার রূপ ত্যাগ করে রাবণের বেশে আমাকে টেনে হেঁচড়ে তার রথে তুলে নিলেন। গড় গড় শব্দে সেই রথ চলতে লাগলো। আমি খুবই ভয় পেলাম। চিৎকার করে সাহায্য চাইলাম। কেউ আমাকে সাহায্য করতে এলো না। আমি গায়ের আবরণ একটি একটি করে খুলে নীচে ফেললাম যাতে রাম এ গায়ের আবরণ চিনে আমাকে উদ্ধার করতে আসতে পারে। কিছুক্ষণ পর গোরুর পুত্র জটায়ুকে দেখতে পেলাম পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে রাবণকে দেখতে পেয়ে আক্রমণ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমি এ যুদ্ধ দেখে পুনরায় জ্ঞান হারালাম। তখন স্বপ্ন দেখলাম, বসুধা দেবি আমার কাছে বসে আছেন এবং আমাকে বলছেন আমি যাতে বিচলিত না হয়। কারণ যা হচ্ছে সবই দেবতার লেখন। অর্থাৎ আমাকে হরণ করার অপরাধে রাবণ স্ববংশ ধ্বংস হবে। আমি স্বপ্নে দেখতে পেলামরাম লক্ষণ, সুগ্রীবসহ মোট পাঁচজন বিশাল সৈন্য বহর নিয়ে রাবণের সৈন্য বহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় পাথর, গাছ ইত্যাদি দিয়ে একটি সেতু নির্মাণ করেছে সুমথীর ওপর দিয়ে লংকাপুরী আক্রমণের জন্য যাচ্ছে। বিভিষণ রাক্ষস রাজ রাবণকে বললো আমাকে রামের হাতে তুলে দিতে। না হলে লংকাপুরী ধ্বংস হয়ে যাবে। রাবণ, বিভিষণের কোন কথা শুনলেন না। বরং তাকে রেগে দরবার থেকে বের করে দিলেন। এরপর বিভিষণ রামের কাছে এসে রামকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতে লাগলো।

কিছুক্ষণ পর রাম ও রাবণের যোদ্ধাদের সাথে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধে রাবণের ভাই কুম্ভকর্ণ প্রাণ হারালো। রাবণ খুব ব্যথিত হলেন। যুদ্ধ থেমে গেলে রাবণের পরাজয়ের পর যখন আমি (সীতা) রামের কাছে আসতে চাইছিলাম তখন আমার ঘুম ভেঙে গেল। গৌরুর পুত্র জটায়ু রাবণের সাথে যুদ্ধে হেরে নীচে পড়ে আছে। তখন রাবণ পুনরায় তার রথ চালাতে লাগলেন। আমি জটায়ুকে আমার দুরাবস্থার কথা বললাম এবং তা রামকে জানিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করলাম। তারপর রাবণ তার রাজ্যে আমাকে এনে অশোকবনে বন্দী করে রাখলেন। শরমা এসব কথা শুনে কেঁদে কেঁদে সীতার গলা জড়িয়ে ধরলেন। সীতাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললোতুমি স্বপ্নে দেখেছো তা সত্যি হবে। কারণ ইতিমধ্যে বীরবাহু ও শত শত বীর যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছে। রাবণ খুব চিন্তায় রয়েছে। এই বলে শরমা সীতাকে বললো যুদ্ধ জয়ের পর তুমি এখান থেকে রামের কাছে গিয়ে আমাকে ভুলে যেও না। এরপর অশোকবনে দুঃখীনি সীতা একাকী পড়ে রইল। (চলবে)

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, গাছবাড়িয়া সরকারি কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ
পরবর্তী নিবন্ধঅভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন হৃদয় খান, সঙ্গে মোনালিসা