জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় কক্সবাজারের মহেশখালীর তিনটি গ্রামকে সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক ‘উমিগিও’ মডেলে ‘মডেল মৎস্যজীবী গ্রাম’ হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মিডা) ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। এই এমওইউ–এর আওতায় সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন ‘উমিগিও’ অর্থাৎ সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক সম্প্রদায় উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করে মহেশখালীর তিনটি গ্রামকে মডেল মৎস্যজীবী গ্রামে রূপান্তরে মিডাকে সহায়তা করবে। খবর বিডিনিউজের।
সাগর সংরক্ষণ, সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ রক্ষা এবং টেকসই ব্লু ইকোনমি বিকাশে এই সমঝোতা স্মারক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের সমুদ্র একটি প্রধান সম্পদ, কিন্তু এটি ক্রমবর্ধমানভাবে দূষিত হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য এখন সমুদ্রের কয়েক হাজার মিটার গভীরে শনাক্ত করা যাচ্ছে। এই সমঝোতা স্মারক আমাদের সমুদ্র রক্ষা ও পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করবে।
অনুষ্ঠানে মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটির পক্ষে নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং জাপানের সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ওপিআরআই) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিৎসুতাকু মাকিনো সমঝোতা স্মারকে সই করেন। এই অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন তার সামুদ্রিক গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী সম্মানিত। আমাদের গবেষণা উদ্যোগে তাদের সম্পৃক্ত করতে পেরে আমরা আনন্দিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউট ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত থাকবে এবং এই গবেষণা সহযোগিতা ধীরে ধীরে প্রসারিত হবে।
এমওইউ–এর আওতায় উপকূলীয় উন্নয়ন ও কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্থা হিসেবে মিডা, দেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক খাতসংক্রান্ত জাতীয় অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করবে। এসব অগ্রাধিকার ২০টির বেশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাধীন দাতব্য সংস্থা সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নীতি, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় দুই পক্ষ সামুদ্রিক চাষ (মেরিকালচার), মৎস্য আহরণ, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সি ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জাপানের ব্লু ইকোনমি মডেলগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণে যৌথভাবে কাজ করবে। সহযোগিতার অংশ হিসেবে উপকূলীয় জীবিকা উন্নয়ন, সমুদ্রে নিরাপত্তা, সমপ্রদায়ভিত্তিক সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মৎস্যজীবী সমপ্রদায় ও সরকারের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া মৎস্য সম্পদ ও উপকূলীয় পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে বেজলাইন জরিপ, জেটি ও স্বয়ংক্রিয় মাছ অবতরণ কেন্দ্র, কোল্ড–চেইন ও পরিবহন লজিস্টিকস, সি ফুড প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কাজও এই অংশীদারত্বের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সীফুড সংরক্ষণ, সামুদ্রিক চাষ, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বৈচিত্র্য, বিনিয়োগ সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রে নিরাপত্তা এবং শ্রমমান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথাও এমওইউতে রয়েছে।
সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওপিআরআই’র প্রেসিডেন্ট মিৎসুতাকু মাকিনো বলেন, এই অংশীদারত্ব বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্লু ইকোনমি, বিশেষ করে মৎস্য খাতে প্রসারিত করার একটি মূল্যবান সুযোগ উপস্থাপন করেছে। মিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, মিডা দেশের উপকূলজুড়ে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রাচীন জীবনধারা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এসপিএফ–এর সঙ্গে এই অংশীদারত্ব মূল্যবোধ ও কার্যক্রমের একটি সমন্বয় যা বাংলাদেশকে জাপানের ‘উমিগিও’ সামুদ্রিক শিল্পভিত্তিক উপকূলীয় সমপ্রদায় উন্নয়ন মডেল থেকে শেখার সুযোগ দেবে; যেখানে জীবিকা, টেকসই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিকে একীভূত করা হয়।
তিনি বলেন, এই অংশীদারত্ব আমাদের বঙ্গোপসাগর, বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগরের সম্ভাবনা উন্মোচনে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, কৌশল ও ব্যবস্থাগুলো বিস্তৃতভাবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা দেবে। এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পেতে বাংলাদেশকে এখন আরও উচ্চতর পর্যায়ে কার্যক্রম নিতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকায় প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে দুই দিনব্যাপী ‘নর্থইস্ট ইন্ডিয়ান ওশান রিজিওনাল ডায়ালগ অন সাসটেইনেবল ব্লু ইকোনমি, কনেকটিভিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর স্মল আইল্যান্ড ডেভেলপিং স্টেটস (এসআইডিএস)’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সংলাপের পাশাপাশি এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশন, মিডা এবং পিস অ্যান্ড পলিসি সলিউশনস (বাংলাদেশ) আয়োজন করে। এতে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভারতের আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জের নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়ন অংশীদাররা এই সংলাপে অংশ নেন।












