হঠাৎ যেন নেমে এলো এক অনন্ত বিষাদ! চারপাশে গভীর এক হাহাকার – যেন বারবার বলছে-‘নেই– নেই – ও আর নেই ’। কল্পনার বাইরে এক শোক বার্তা– জিনাত আর নেই। কেন নিতে পারছি না –কেন মানতে পারছি না। মৃত্যুইতো কঠিন সত্যি। সবাইকে চলে যেতে হবে– মেনে নিতে হবে। তবে কিছু কিছু মানুষ – তাঁদের আচার–আচরণে, কর্মে ও মানবতায়– সাংগঠনিক দক্ষতায় সবার কাছে এমন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন– তাঁর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়– বিশেষত এই বৈরী সময়ে। ১৯৮৪ সাল থেকে পরিচয় চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের মাধ্যমে। তাঁর জীবন পত্র পল্লবে শোভিত এক জীবন্ত বৃক্ষের মতো।এই শহরের বিশেষত নারী সমাজের এক ছায়ার মতো। দুই হাতে দান করতেন– অথচ নীরবে নিভৃতে। সব মানুষ কি পারেন– সবাইকে কাছে টেনে নিতে! আদরে– মায়ায় ও মমতায়। জিনাতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই যেন তা মিশে ছিলো। সাংগঠনিক দক্ষতার বাইরে সৃজনশীল একজন ব্যক্তিত্ব হলেও প্রচার বিমুখ ছিলেন – লেখার মাঝে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও এ ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনতা ছিল। বিশেষত রম্য সাহিত্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও ঐদিকটাকে যদি গভীর একাগ্রতায় ধরে রাখতেন তবে ফাহমিদা আমিনের কাছাকাছি চলে যেতে পারতেন। এরপরেও অনেক লিখেছেন কিন্তু গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা উদাসীনতা ছিলো। তবে যে কয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে – সেগুলোর সাহিত্যমূল্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণ কাহিনি রচনায়ও তিনি এক অনন্যসাধারণ ছিলেন।
কাব্যিক মাধুর্য ও রচনাশৈলীর নিদর্শন, শব্দ নির্বাচন বা নির্মাণে এক অভিনবত্ব পাঠকের মনকে মুগ্ধ করতো। লেখক বা রম্যরচনায় তিনি ছিলেন জীবনদর্শী মন ও মনোভাব প্রকাশে তিনি একেবারে কঠিন সত্যি তুলে ধরতেন। রম্য সাহিত্যিক সত্যব্রত বড়ুয়ার চিরবিদায়ের পরে বাংলাদেশ বেতারে রম্য সাহিত্যের কথক হিসেবে উনাকে ডাকা হলেও তিনি সমঝোতা করেনননি। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে অনেক কিছুর সমঝোতা করতে হয় – কিন্তু তিনি করলেন না। তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধুর্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। অবলীলায় অপ্রিয় সত্যি উচ্চারণে তিনি ছিলেন নির্ভীক। রক্তের সম্পর্কের চাইতে অনেক সময় বড়ো হয়ে ওঠে – জিনাতের সাথে তাই হয়েছিলো। তাই ওর এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে আমার খুব কম যাওয়া হতো– তাই অভিমান ছিলো অনেক। শেষবার গেলাম যখন, তখন দুজনের গভীর আলিঙ্গনে উপলব্ধি করেছি– আমাদের দুজনের বন্ধন গভীর ছিল। ভেবেছিলাম এবার থেকে সবসময় যাবো। সম্পর্ক তো বহুদিনের– আজম ভাই এর মৃত্যুকালীন সময়ে কাছে ছিলাম – আমার মায়ের মৃত্যুর পরে উনিই প্রথম এসে ছিলেন। গোসলে হাত দিয়েছেন – আমার ছোট ছেলের দুর্ঘটনার পরে যখন ওকে কেবিনে আনা হলো– তখন দু‘দিন পরপর আসতেন। এটি তাঁর অনন্য সাধারণ গুণ ছিলো যা তিনি অর্জন করেছেন। ফাহমিদা আপার ছেলের মৃত্যুর পরে আগলে রেখেছিলেন ওনাকে। তাঁর চরিত্রের বড়ো গুণ ছিলো– তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। একাকী নারী জীবনের পথচলা খুব একটা মসৃণ হয় না। এটি জীবনেরই নিয়ম। অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। দান করতে গিয়ে পা ভাঙলেন। হাতেও বড়ো ধরনের সমস্যা ছিলো। ডায়েবেটিকিস রোগেও ভুগছিলেন! কিন্তু এরপরেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখতেন নিজেকে। আমাদের আত্মকেন্দ্রিক এ সমাজে এ ধরনের উদার ও মানবিক মানুষ পাওয়া এখন কঠিন। যাঁর হাতটি ছিলো সবার বিশেষত মেয়েদের মাথায় একটা বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। ধীরে ধীরে এই ছায়াগুলো সরে যাচ্ছে – সরে যাচ্ছে – আমরা ক্রমশ ধাবিত হচ্ছি এক অতল গহ্বরের দিকে। যদিও আমরা জানি –যতই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত রাখি না কেন– মেনে নিতেই হবে– ‘এ জীবন ক্ষণিকের –মৃত্যুই কঠিন সত্যি।’ যে কথাটি আমরা ভুলে থাকি বা ভুলে যাই। একজন মহীয়সী নারী জিনাত আজম বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মের মাঝে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ; সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ।