মহীয়সী নারী জিনাত আজম

ড. আনোয়ারা আলম | বুধবার , ৯ জুলাই, ২০২৫ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ

হঠাৎ যেন নেমে এলো এক অনন্ত বিষাদ! চারপাশে গভীর এক হাহাকার যেন বারবার বলছে-‘নেইনেই ও আর নেই ’। কল্পনার বাইরে এক শোক বার্তাজিনাত আর নেই। কেন নিতে পারছি না কেন মানতে পারছি না। মৃত্যুইতো কঠিন সত্যি। সবাইকে চলে যেতে হবেমেনে নিতে হবে। তবে কিছু কিছু মানুষ তাঁদের আচারআচরণে, কর্মে ও মানবতায়সাংগঠনিক দক্ষতায় সবার কাছে এমন গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেনতাঁর বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়বিশেষত এই বৈরী সময়ে। ১৯৮৪ সাল থেকে পরিচয় চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের মাধ্যমে। তাঁর জীবন পত্র পল্লবে শোভিত এক জীবন্ত বৃক্ষের মতো।এই শহরের বিশেষত নারী সমাজের এক ছায়ার মতো। দুই হাতে দান করতেনঅথচ নীরবে নিভৃতে। সব মানুষ কি পারেনসবাইকে কাছে টেনে নিতে! আদরেমায়ায় ও মমতায়। জিনাতের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই যেন তা মিশে ছিলো। সাংগঠনিক দক্ষতার বাইরে সৃজনশীল একজন ব্যক্তিত্ব হলেও প্রচার বিমুখ ছিলেন লেখার মাঝে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও এ ব্যাপারে কিছুটা উদাসীনতা ছিল। বিশেষত রম্য সাহিত্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও ঐদিকটাকে যদি গভীর একাগ্রতায় ধরে রাখতেন তবে ফাহমিদা আমিনের কাছাকাছি চলে যেতে পারতেন। এরপরেও অনেক লিখেছেন কিন্তু গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা উদাসীনতা ছিলো। তবে যে কয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর সাহিত্যমূল্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণ কাহিনি রচনায়ও তিনি এক অনন্যসাধারণ ছিলেন।

কাব্যিক মাধুর্য ও রচনাশৈলীর নিদর্শন, শব্দ নির্বাচন বা নির্মাণে এক অভিনবত্ব পাঠকের মনকে মুগ্ধ করতো। লেখক বা রম্যরচনায় তিনি ছিলেন জীবনদর্শী মন ও মনোভাব প্রকাশে তিনি একেবারে কঠিন সত্যি তুলে ধরতেন। রম্য সাহিত্যিক সত্যব্রত বড়ুয়ার চিরবিদায়ের পরে বাংলাদেশ বেতারে রম্য সাহিত্যের কথক হিসেবে উনাকে ডাকা হলেও তিনি সমঝোতা করেনননি। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে অনেক কিছুর সমঝোতা করতে হয় কিন্তু তিনি করলেন না। তাঁর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাধুর্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। অবলীলায় অপ্রিয় সত্যি উচ্চারণে তিনি ছিলেন নির্ভীক। রক্তের সম্পর্কের চাইতে অনেক সময় বড়ো হয়ে ওঠে জিনাতের সাথে তাই হয়েছিলো। তাই ওর এভাবে হঠাৎ চলে যাওয়া কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

চট্টগ্রাম লেখিকা সংঘের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে আমার খুব কম যাওয়া হতোতাই অভিমান ছিলো অনেক। শেষবার গেলাম যখন, তখন দুজনের গভীর আলিঙ্গনে উপলব্ধি করেছিআমাদের দুজনের বন্ধন গভীর ছিল। ভেবেছিলাম এবার থেকে সবসময় যাবো। সম্পর্ক তো বহুদিনেরআজম ভাই এর মৃত্যুকালীন সময়ে কাছে ছিলাম আমার মায়ের মৃত্যুর পরে উনিই প্রথম এসে ছিলেন। গোসলে হাত দিয়েছেন আমার ছোট ছেলের দুর্ঘটনার পরে যখন ওকে কেবিনে আনা হলোতখন দুদিন পরপর আসতেন। এটি তাঁর অনন্য সাধারণ গুণ ছিলো যা তিনি অর্জন করেছেন। ফাহমিদা আপার ছেলের মৃত্যুর পরে আগলে রেখেছিলেন ওনাকে। তাঁর চরিত্রের বড়ো গুণ ছিলোতিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। একাকী নারী জীবনের পথচলা খুব একটা মসৃণ হয় না। এটি জীবনেরই নিয়ম। অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন তিনি। দান করতে গিয়ে পা ভাঙলেন। হাতেও বড়ো ধরনের সমস্যা ছিলো। ডায়েবেটিকিস রোগেও ভুগছিলেন! কিন্তু এরপরেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখতেন নিজেকে। আমাদের আত্মকেন্দ্রিক এ সমাজে এ ধরনের উদার ও মানবিক মানুষ পাওয়া এখন কঠিন। যাঁর হাতটি ছিলো সবার বিশেষত মেয়েদের মাথায় একটা বটবৃক্ষের ছায়ার মতো। ধীরে ধীরে এই ছায়াগুলো সরে যাচ্ছে সরে যাচ্ছে আমরা ক্রমশ ধাবিত হচ্ছি এক অতল গহ্‌বরের দিকে। যদিও আমরা জানি যতই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত রাখি না কেনমেনে নিতেই হবে– ‘এ জীবন ক্ষণিকের মৃত্যুই কঠিন সত্যি।’ যে কথাটি আমরা ভুলে থাকি বা ভুলে যাই। একজন মহীয়সী নারী জিনাত আজম বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মের মাঝে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ; সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকরোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে
পরবর্তী নিবন্ধপ্রবাহ