মহাষষ্ঠীতে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু, আজ মহাসপ্তমী

মণ্ডপে মণ্ডপে শাঁখের ধ্বনি, ঢাকের বাদ্য

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৩ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

মহাষষ্ঠীর আচার ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজার পাঁচদিনব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা গতকাল থেকে শুরু হয়েছে। সন্ধ্যায় দেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও সায়ংকালে দুর্গাদেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মহাষষ্ঠীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় বিহিত পূজার পর দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে মূল দুর্গোৎসবের সূচনা হয়েছে। ধূপশাখের ধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হচ্ছে পুরোহিতের মন্ত্র। সনাতনী সমপ্রদায়ের প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব ঘিরে শহর থেকে গ্রামে এখন সর্বত্র সাজ সাজ রব।

আজ শনিবার শারদীয়া দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দুর্গাদেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমাদি কল্পারম্ভ ও মহাসপ্তমী বিহিত পূজার আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে।

আজ শুরু হচ্ছে দেবীদর্শন, দেবীর পায়ে ভক্তদের অঞ্জলি প্রদান এবং সবশেষে প্রসাদ গ্রহণ। মূলত দুর্গোৎসবের মূল পর্বও শুরু হচ্ছে আজ মহাসপ্তমী থেকে। মহাসপ্তমীতে ষোড়শ উপাচারে অর্থাৎ ষোলটি উপাদানে দেবীর পূজা হবে ভোর থেকে। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদান করা হবে। দেবীকে আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, স্নানীয়, পুষ্পমাল্য, চন্দন, ধূপ ও দীপ দিয়ে পূজা করবেন ভক্তরা। সপ্তমী পূজা উপলক্ষ্যে সন্ধ্যায় বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তিমূলক সংগীত, রামায়ণ পালা, আরতিসহ নানা অনুষ্ঠান হবে। এভাবে উৎসব চলবে আগামী মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত।

এবার বর্ণিল আয়োজন আর উৎসবমুখর পরিবেশে চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬ থানা এবং জেলার ১৫ উপজেলায় ২ হাজার ৪৬৮টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। সর্বজনীন এ উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের মাঝে শুরু হয়েছে আনন্দ ও উৎসাহউদ্দীপনা। হিন্দু পুরাণ মতে, মহাসপ্তমীতে ভক্তদের কল্যাণ ও শান্তির আশীর্বাদ নিয়ে হিমালয় নন্দিনী দেবী দুর্গা পূজার পিঁড়িতে বসবেন।

দেবী দুর্গা জীবের দুর্গতি হরণ করেন। তিনি শক্তিদায়িনী অভয়দায়িনী। মা দুর্গার কাঠামোতে জগজ্জননী দুর্গা ছাড়াও লক্ষী, স্বরস্বতী, কার্তিক, গনেশ, সিংহ ও অসুরের মূর্তি থাকে। এছাড়া পেঁচা, শ্বেতহংস, ময়ূর, ইঁদুর ও সবার উপরে শিবের মূর্তি বিদ্যমান। লক্ষী ধনের, স্বরস্বতী জ্ঞানের, গণেশ কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতীক। মা দুর্গার দশটি হাত ও দশটি প্রহরণ। সিংহ বশংবদ ভক্তের ও অসুর অশুভ দুর্গতির প্রতীক। দেব সেনাপতি কার্তিক তারকাসুরকে বধ করে স্বর্গভ্রষ্ট দেবতাদের পুনরায় স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অতন্ত্র প্রহরায় রক্ষা করেছিলেন স্বর্গের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। মা দুর্গা ধরায় আসেন সন্তানদের নিয়ে। একেক সময়ে একেক বাহনে। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী এবার দেবীদুর্গা এসেছেন ঘোটক (ঘোড়ায়) চড়ে। মহা দশমী বিহিত পূজা শেষে আবার ফিরে যাবেন ঘোড়ায় চড়ে। দেবীর ঘোড়ায় চেপে আগমনের ফল হলো ‘ছত্রভঙ্গস্ত্তরঙ্গমে’। অর্থাৎ সামাজিক, রাজনৈতিকসহ নানা ক্ষেত্রে ঘটবে অস্থিরতা। বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, দুর্ঘটনা বাড়বে।

অন্যান্যবারের মতো এবারও সাধারণত কারিগররা তিন ধরনের দুর্গা প্রতিমা বানিয়েছেন। এর মধ্যে আছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় থিম ভিত্তিক প্রতিমা মূর্তি, অজন্তা ধাঁচের মূর্তি যেগুলো ওরিয়েন্টাল প্রতিমা হিসেবে পরিচিত। আবার চিরায়ত বাঙালি নারীর রূপের প্রতিমাও আছে।

মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থিম ভিত্তিক এবং অজন্তা ধাঁচের মূর্তির চাহিদা এখন বেশি। থিম ভিত্তিক প্রতিমা সকলে তৈরি করতে পারেন না। চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক পূজা মণ্ডপে গত ১০/১২ বছর ধরে থিম ভিত্তিক প্রতিমা পূজা শুরু হয়েছে। আকর্ষণীয় থিমের উপর নির্মিত প্রতিমা দর্শনে ৫ দিনব্যাপী এসব মণ্ডপে দশনার্থীদের সীমাহীন ভিড় লেগে থাকে। থিমের উপর নির্মিত প্রতিমাগুলো পুরান ঢাকা, ফরিদপুর ও যশোর থেকে আসে। এ ধরনের মূর্তিতে শাড়ি, অলংকার ও অঙ্গসজ্জা সবই করা হয় মাটি ও রঙ দিয়ে। বাংলা প্রতিমায় শাড়ি, অলংকার, সাজসজ্জার উপকরণ আলাদাভাবে কিনে নিতে হয় বলে অজন্তার চাহিদা বেশি বলে তিনি জানান।

নগরীর আকর্ষণীয় পূজা মণ্ডপ : প্রতি বছরের মত এবারও নগরীতে আকর্ষণীয় থিম ভিত্তিক (ভিন্ন ধরনের চমক নিয়ে) দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে আগ্রাবাদ একতা সংঘে, গোসাইলগাঙ্গা, হাজারী লেন, সতীশ বাবু লেনে। এছাড়াও আকর্ষণীয় প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে পাথরঘাটা, গঙ্গাবাড়ি দুর্গা মন্দির, ঘাটফরহাদবেগ, সদরঘাট, উত্তর নালাপাড়া, রাজাপুকুর লেন, চট্টেশ্বরী বাড়ি, মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড় চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন মণ্ডপে।

নগরীর বাইরে পটিয়া উপজেলার কেলিশহর, দক্ষিণ ভূর্ষি, সুচক্রদন্ডী, রাউজানের গহিরা, নোয়াপাড়া, বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী গ্রামের ভবানীভবন মাতৃমন্দির, জ্যেষ্ঠপুরা গ্রাম, আনোয়ারা উপজেলা সদর কচিকাচা শিল্পীগোষ্ঠী পূজা মণ্ডপ, পরৈকোড়া দুর্গা মন্দির, পাঠনীকোঠা দুর্গা মন্দির, কৈনপূরা দুর্গা মন্দিরসহ বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে বর্ণাঢ্য পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

গোয়ালপাড়া মহিলা সংঘ পূজা উদযাপন পরিষদ : বাংলাদেশে একমাত্র মহিলাদের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শারদীয় দুর্গা পূজা উদযাপন হয়ে আসছে চট্টগ্রামের গোয়ালপাড়া পুকুর পাড়ে। এটি চট্টগ্রামসহ সারাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ব্যতিক্রমী পূজা মণ্ডপ। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে গোয়ালপাড়া মহিলা সংঘ পূজা উদযাপন পরিষদের ব্যানারে মহিলাদের তত্ত্বাবধানে এই পূজা মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন হয়ে আসছে। এখানে পূজা কমিটির সবাই মহিলা। পূজায় আরতি করা থেকে সকল কাজকর্ম সব কিছুই করে থাকেন এলাকার মহিলারা। এই পূজা পরিষদের সভাপতি মীনা চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক গীতা রুদ্র। তারা দুইজন বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে আমরা এলাকার মহিলারা মায়ের পূজার আয়োজন করে আসছি। এটা শুধু চট্টগ্রামে নয় বাংলাদেশে প্রথম। প্রতি বছর এই পূজা মণ্ডপে আমাদের (মহিলাদের) আয়োজন দেখতে নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ভীড় করেন। ৫দিনব্যাপী পূজার সকল আয়োজন থেকে শুরু করে আরতি করা পর্যন্ত সব আমাদের মেয়েরাই করে। শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্যদিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য্য আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬ থানায় প্রতিবারের মতো এবারও সর্বজনীন পূজা এবং ব্যক্তিগত ঘটপূজাসহ ২৯৩টি মণ্ডপে উৎসবমুখর পবিরেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুগ্রীব মজুমদার দোলন বলেন, এবার চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় ২ হাজার ১৭৫ মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে সর্বজনীন প্রতিমা পূজা উদযাপিত হবে ১ হাজার ৬৫১টি মণ্ডপে এবং ঘটপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫২৪টি মণ্ডপে। পূজা পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা পূজা পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা কন্ট্রোল রুম ও ৩টি পর্যবেক্ষণ টিম থাকবে বলে জানান তিনি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাহাড়ের চূড়ায় মিষ্টি পানের চাষ
পরবর্তী নিবন্ধদেড় মাস পর ভেসে উঠল ঝুলন্ত সেতু