মহান একুশে : বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা

আয়েশা পারভীন চৌধুরী | সোমবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২০ পূর্বাহ্ণ

বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে জানান দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পৃথিবীর কোন দেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কাউকে মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়নি। আমরা একমাত্র জাতি যাদেরকে ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। রাজপথ রঞ্জিত করতে হয়েছে। শহীদ বরণ করতে হয়েছে। রফিক সালাম জব্বার বরকতসহ আরো অনেক শহীদের তরতাজা রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হয়েছে। বাংলা ভাষা আন্দোলন তথা রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত পাকিস্তানি তৎকালীন প্রদেশ পূর্ববঙ্গে সংগঠিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের দুইটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। আর এই আন্দোলনকেই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হয়। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল। তার আগেই হয়েছিল ভাষা নিয়ে বিতর্ক। ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন ও আহমদ রফিক তাদের ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য বইয়ে লিখেছেন ; প্রথম লড়াইটা প্রধানত ‘সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে সীমাবদ্ধ’। এই বইটির বর্ণনা অনুযায়ী দেশ ভাগের আগেই ৪০ এর দশকের শুরুতেই সাহিত্যিকরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নিয়ে এক স্মৃতি কথায় আহমদ রফিক আরো বলেন; সে সময় ঢাকায় মাঘের শীত বাঘের শরীরে লাগতে পারে কিন্তু তরুণ ছাত্র জনতার গায়ে মাঘের শীতের কোন প্রভাব পড়েনি। সে সময়ে বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিক; শিক্ষক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাংলা উর্দু আরবি ইংরেজি এই চারটি ভাষার পক্ষে বিপক্ষে নানান মত ছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন নিশ্চিত হওয়ার পর উর্দু বাংলা বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সেই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ ‘মিল্লাত’ পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল; ‘মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোনও ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর থাকিতে পারে না। লেখক সাংবাদিক আব্দুল হক লিখেছিলেন; ‘উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে উর্দু শিক্ষিতই চাকরির যোগ্যতা লাভ করবেন। প্রত্যেকটি বাংলা ভাষীই চাকরির অনুপযুক্ত হয়ে পড়বেন। ‘বাংলা ভাষীদের আরো উদ্বেগ ছিল ২০০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের মানুষের সাংস্কৃতিক পার্থক্য নিয়ে। শুধুমাত্র ধর্ম তাদের মধ্যে কতটুকু যোগসূত্র স্থাপন করতে পারবে এই নিয়ে অনেক ভাবনা ছিল। দেশ বিভাগের কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা; ডাকটিকেট; ট্রেনের টিকেট ; পোস্ট কার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলা বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। সেই সময়ে বুদ্ধিজীবীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন; মাতৃভাষার পরিবর্তে উর্দু চাপিয়ে দিলে বাংলা ভাষাভাষী পরবর্তী প্রজন্ম অশিক্ষিত হয়ে পড়বে। বাংলা ভাষার সত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। স্বাধীনভাবে মাতৃভাষার চর্চার ক্ষেত্রে এটিকে বড় আঘাত বলে মনে করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা করেন ; ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা’। আর এই ঘোষণার প্রতিবাদে বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিবাদী উচ্চারণ নতুন রাষ্ট্র সম্পর্কে বাঙালির স্বপ্নভঙ্গের সূচনা বলা যেতে পারে। এভাবে ভাষা ও সংস্কৃতিক পার্থক্য দিন দিন আরো জোরালোভাবে প্রতীয়মান হচ্ছিল। ফলে দিন দিন ধর্ম নয় বরং বাঙালি জাতিয়তাবাদের ধারণা স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। দেশভাগের পর থেকে ১৯৫২ সালের শুরু পর্যন্ত বাঙালিরা জোরালোভাবে রাষ্ট্রভাষা উর্দুর বিরুদ্ধে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করে গেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে ভাষার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে সেই ভাষা এখন ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। আকাশ সংস্কৃতির ছোবলে ও আধুনিকতার নামে আমাদের বাংলা ভাষা এখন বিকৃত করা হচ্ছে। মৃতপ্রায় নদীর মত বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও মাধুর্য মলিন হয়ে যাচ্ছে।

ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গসহ সমস্ত বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে পালিত একটি বিশেষ দিবস। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ১৭ই নভেম্বরে জাতিসংঘ কর্তৃক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। তবে ২০০২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এটি শহীদ দিবস হিসেবেও পরিচিত। এ দিনটি বাঙালি জনগণের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই আন্দোলনে পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল ; ২০০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখণ্ডের ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের অধিবাসীদের মনে এক হাওয়ার অনুভূতি সম্ভবত জাগ্রত হবে না। ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান সংসদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতি কার্যকর হতে লেগেছিল আরো দুই বছর। মাতৃভাষা নিয়ে এ আন্দোলনের ফলেই পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বীজ বপন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পাশ করা ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ কার্যকর হয় ৮ মার্চ ১৯৮৭ সাল থেকে। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে এখন থেকে প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে পালন করবে, জাতিসংঘে এই সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মত ভাবে পাস হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫ তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। মে মাসে ১১৩ সদস্য বিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্য বিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়। সুস্থ ও শুদ্ধ সংস্কৃতি বিকাশে বাংলা ভাষা চর্চার বিকল্প নাই। আমাদের বিকাশে ও মননে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব অপরিসীম। তাই একুশ মানে চেতনা। একুশ মানে বাংলাদেশ।

লেখক: প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, ডা. ফজলুল হাজেরা ডিগ্রী কলেজ, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধব্যাংক বাঁচলে বাঁচবে দেশ
পরবর্তী নিবন্ধদূরের দুরবিনে