সৌরজগতে ধুমকেতুর চলাফেরা নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক ধুমকেতু কখন আমাদের দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করবে সেটিও বিজ্ঞানীরা দিনক্ষণ সহ বলে দিচ্ছেন। এডমণ্ড হ্যালি অন্দকষে ১৭০৫ সালে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন হ্যালির ধুমকেতুটি একবার খালি চোখে দেখা যাবে ১৯৮৬ সালে। ৭৫–৭৬ বছর পর আবার দেখা যাবে ২০৬১ সালে। অর্থাৎ প্রতি ৭৫–৭৬ বছরে হ্যালির ধুমকেতু আমাদের দৃশ্যপটে উপস্থিত হবে। বিশ্ববাসীর মতো আমি নিজেও খালি চোখে ১৯৮৬ দেখতে পেয়েছি হ্যালির ধুমকেতু। এটি এই প্রজন্মের জন্য শেষ দেখা। কারণ ২০৬১ সালে আবার যখন এটি উপস্থিত হবে তখন আমরা কেউ’ই বেঁচে থাকবো না।
এবারের বিষ্ময় 31/ATLAS । এটি ২৯–৩০ অক্টোবর সূর্যের কাছাকাছি অবস্থানে এসে পড়েছিল এবং ২৭০ মিলিয়ন কি: মি: দুর দিয়ে পৃথিবীকে অতিক্রম করেছে। এটির গতি হলো সেকেন্ডে ৬০ কি: মি:। তাই বিজ্ঞানীদের অভিমত হলো সৌরজগতের কোন ধুমকেতুর পক্ষে এমন গতি সম্ভব নয়। অর্থাৎ সৌর পরিবারের বাইরের অন্য কোন সৌর পরিবার থেকে এটির আগমন ও ছুটে চলা। অবশ্য উৎপত্তি যেখানেই হোক এটি মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর কোন একটি সৌর পরিবার থেকে ছুটে এসেছে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীতে সূর্য আছে লক্ষ লক্ষ। সুতরাং সৌর পরিবারের সংখ্যাও লক্ষ লক্ষ। আলোর গতিতে চললেও মিল্কিওয়ে অতিক্রমে লাগবে এক লক্ষ বছর। মিল্কিওয়েতে ছোটাছুটি করছে হ্যালির ধুমকেতুর মতো লক্ষ লক্ষ ছোট বড় ধুমকেতু।
একজন বিজ্ঞানী আভাস দিয়েছেন মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীর কোথাও না কোথাও পৃথিবীর মতো গ্রহ আছে। মানুষের মতো উন্নত সভ্যতা আছে। অর্থাৎ ভিনগ্রহের উন্নত মনুষ্যরাই এই 31/ATLAS ধুমকেতু সদৃশ বস্তুটি ব্রহ্মাণ্ডে নিক্ষেপ করেছে। আমরা যেমন নিক্ষেপ করেছি ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২। যুক্তি হিসেবে দাবী করা হচ্ছে অন্য দশটি ধুমকেতুর মতো এটির লেজ নেই। প্রাকৃতিক হলে অবশ্যই লেজ বা পুচ্ছ থাকতোই। বিজ্ঞানীদের অন্যগ্রুপ মনে করেন 31/ATLAS এলিয়েন প্রেরিত ধুমকেতু সম্ভবত নয়। এলিয়েনরা যদি পাঠিয়েই থাকে তবে বুঝবো ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের মতো উন্নত প্রাণ ও সভ্যতা আছে।
বিংশ শতাব্দীতে অন্যতম বিতর্কের বিষয় ছিল পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটেছে? প্রাণ বিকাশের প্রাথমিক রাসায়নিক উপাদানগুলো নিতান্ত এই গ্রহের নিজস্ব নাকি ধুমকেতু বা উল্কাপিন্ডের মাধ্যমে অন্য গ্রহ থেকে এসে পতিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের উপর বিজ্ঞানীরা মনে করছেন জীবনের বিল্ডিং ব্লকগুলি এসেছে ভিনগ্রহ থেকে। ২ বিলিয়ন বছর বয়সী এক উল্কাপিণ্ড পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এখানে প্রাপ্ত উঘঅ মানুষের জিনগত DNA কাঠামোর মতোই। এর অর্থদাড়ায় মনুষ্য উঘঅ ভিনগ্রহ বা মহাবিশ্বের অন্য কোন উৎস থেকে পৃথিবীতে এসেছিল। লক্ষ কোটি বছরের বিবর্তনে যা আজকের মনুষ্য সৃষ্টি প্রক্রিয়া বলবৎ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে সেদিন খুব নিকটবর্তী যেদিন বিজ্ঞানীরা ঘোষণা করবেন মনুষ্য সদৃশ প্রজাতি এই সৌরজগৎ বা অন্য সৌরজগৎ বা অন্য গ্যালাক্সী বা অন্য ক্লাস্টার বা অন্য সুপার ক্লাস্টারে অবশ্যই আছে। ঐরূপ কোন আবিষ্কার আবির্ভূত হলে দুঃখ থাকবে আমাদের জীবদ্দশায় তা দেখে যেতে পারব না।
এডুইন হাবল আমার মতোই আইনজীবী ছিলেন। ছিলেন সৌখিন ফটোগ্রাফার। একদিন বসে পড়লেন দালানের ছাদে নিজের আবিষ্কৃত দুরবীন নিয়ে। শহরের বড় বড় বিজ্ঞানীদের ডেকে এনে দেখালেন মহাকাশের মহাকাণ্ড। সবাই বিস্ময়ে দেখল গ্যালাক্সীগুলো একে অন্যের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে। অর্থাৎ গ্যালাক্সীগুলো প্রসারণশীল। সহজভাবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সীতে যত নক্ষত্র আছে, তারা একের কাছ থেকে অন্যটি সরে যাচ্ছে। তেমনি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সী থেকে প্রতিবেশী এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সী দূরে সরে যাচ্ছে। একিভাবে ব্রহ্মাণ্ডের লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সীগুলো অনবরত শুধু ছুটছে বা একে অন্যের নিকট থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বা পালাচ্ছে।
হাবলের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছে ঘোষণা করলেন, বেলজিয়াম পাদ্রী জর্জ ল্যামেত্রের বিগ ব্যাং তত্ত্বটিই সঠিক। হাবলের সম্প্রসারণ তত্ত্বকে উল্টো করে ভাবলে দেখা যায় সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড এক সময় এক বিন্দুতে স্থিত ছিল। এর নাম দেয়া হয়েছে সিঙ্গুঁলারিটি। অকল্পনীয় ঘনত্বের এই বিন্দুতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে শুরু হয় সম্প্রসারণ। লিথিয়াম হিলিয়াম হাইড্রোজেন কার্বন ডাই–অক্সাইড অক্সিজেনসহ অজস্র উপাদানগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সৃষ্টি করেছে ধুলাবালি, উল্কাপিণ্ড, ধুমকেতু, উপগ্রহ, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সী ইত্যাদি। বলা হচ্ছে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এই বিস্ফোরণ হয়েছিল। বিজ্ঞান বলছে এই সুন্দর পৃথিবী, পৃথিবীতে মানুষসহ যত প্রাণ আছে, সমস্ত জীবজগৎ এবং মহাকাশের সমস্ত গ্রহ উপগ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সী পদার্থবিদ্যার নিয়মানুযায়ী সৃষ্টি হয়েছে। এখনো নতুন নতুন প্রাণের উদ্ভব হচ্ছে। বহু প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে। বহু নক্ষত্র মরে যাচ্ছে আবার নতুন নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে। আকাশে বিশেষ আলোর ঝলক দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন সূর্য্যের চেয়ে অনেক বড় নক্ষত্রের মৃত্যু হয়েছে। নক্ষত্রের এই শেষ পরিণতির নাম সুপারনোভা। বহুদিন ধরে ভাবছি ১৩.৮ বিলিয়ন বছর সময়টি বিজ্ঞানীরা মাপলেন কিভাবে? আসলে বিষয়টি অতবেশী জটিল নয়। অনেকটাই সহজ।
আইনস্টাইন বলেছিলেন ব্রহ্মাণ্ডে আলোর চেয়ে দ্রুতগতির কিছুই নেই। আলো সেকেণ্ডে ৩ লক্ষ কিলোমিটার অতিক্রম করে। এই হিসেব ধরে আলো এক বছরে যে পথ অতিক্রম করে তার দৈর্ঘ্য হলো ৯৪৬ হাজার কোটী কিলোমিটার। মহাজাগতিক মাইক্রোওয়েভ তত্ত্ব বা বর্ণালীর রেডশীপ ঘনত্ব ব্যবহার করে ব্রহ্মাণ্ডের এই বয়সসীমা নির্ধারিত হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষের পক্ষে ঐসব তত্ত্ব্ব জানা বা বুঝার দরকার নেই। তবে ইদানীং বিজ্ঞানীরা বলছে বিগব্যাং মুহুর্ত্বে যে আলো ছুটতে শুরু করেছিল তা আজো নিশ্চয়ই ছুটছে। আজ হোক কাল হোক জন্ম মুহূর্ত্বের সেই আলো ধরা পড়বেই। তরুণ বাঙালী বিজ্ঞানী লামিয়া মাওলা বলছেন বিগ ব্যাং মূহুর্তে কি ঘটেছিল তা মানুষ জানতে পারবে অতি নিকট ভবিষ্যতে।
লেখক: প্রাবন্ধিক; আইনজীবী, আপীল বিভাগ










