সংস্কৃত শব্দ ভূত অর্থ অশরীরি আত্মা। বাংলা ভাষায় শব্দটি হুবহু ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ছোট বেলায় অন্ধকার রাতে ভূতের ভয়ে বাড়ী ফিরতাম লণ্ঠন হাতে মেজ কাকার সাথে। ভূতের ভয়ে রাতের বেলা ঘরের বাইরে যাওয়া ছিল রীতিমতো ভীতিকর। মাকে ছাড়া বাচ্চারা বের হবার প্রশ্নই ছিল না। ভূতের গল্প নিয়ে বাংলা সাহিত্যে জমজমাট রসে টইটুম্বুর কাহিনীর ছড়াছড়ি। বাংলার জনপদে আজো ভূতের ভয় দেখালে বাচ্চারা মায়ের বুকের মধ্যে মুখ লুকায়। ঘুমিয়ে পড়ে মাতৃ উষ্ণতায়।
গ্যালাক্সীগুলো এমনভাবে দৌড়াচ্ছে যে, বিজ্ঞানীরা এই ছোটাছুটিকে ভূতের ভেল্কিবাজীর সাথে তুলনা করেছেন। সর্বশেষ তথ্য উপাত্ত থেকে মোটামুটি সিদ্ধান্তে আসা গেছে যে, রাতের আকাশে যে কোটি কোটি গ্রহ উপগ্রহ তারা গ্যালাক্সী দেখা যায় এবং অত্যাধুনিক টেলিস্কোপে দেখতে পাওয়া লক্ষ কোটি গ্যালাক্সীর পরিমাণ হলো ব্রহ্মাণ্ডের মাত্র ৫ শতাংশ। তাহলে বাকী ৯৫ শতাংশ কি শুধুই ফাঁকা বা শূন্য?
হাবল পেশায় ছিলেন আইনজীবী। শখের বসে নিজের মতো করে বানিয়েছেন টেলিস্কোপ। তিনি প্রথম দেখালেন গ্যালাক্সীগুলো নির্দিষ্ট অনুপাতে দূরে সরে যাচ্ছে। একটির চেয়ে আরেকটি যত দূরে সেটি ততবেশী দ্রুত দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়ানোর হার সমানুপাতিক। যে গ্যালাক্সী যত দূরে সেই গ্যালাক্সীর আলো পৃথিবী পর্যন্ত আসতে লাল রং বা রেড শীপ আকার নেয়। রেডশীপ এর ঘনত্বকে গাণিতিক ফর্মূলায় বের করা হয় গ্যালাক্সীটির বয়স কত? আমাদের থেকে কতদূরে ইত্যাদি। এমনকি ল্যামেত্রে প্রস্তাবিত বিগ ব্যাং অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর বের করা হয়েছে হাবল ফর্মূলা ব্যবহার করে। এটিই বিখ্যাত হাবল ধ্রুবক বা হাবল ‘ল’। গণিতের ভাষায় হাবল সূত্র হল ঠ= ঐড়উ এতো দিন পর্যন্ত হাবল সম্প্রসারণ হার ছিল সেকেণ্ডে ৬৭ কি: মি:। কিন্তু একটি সুপারনোভার প্রসারণ হার নির্ণয়ের বেলায় দেখা গেল সেটির সেকেণ্ডে সম্প্রসারণ হার ৭৩ কি.মি. এর বেশী। গণ্ডগোলের শুরু এখান থেকে। হাবল সূত্র দু’ধরনের রেজাল্ট দেয়ার কারন কি? বিজ্ঞানীরা টেনশনে বা গোলক ধাঁধায় পড়ে গেলেন। এটিই সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত ‘হাবল টেনশন’।
সন্দেহ হচ্ছে মহাশূন্যের গভীর অন্ধকারে লুকিয়ে আছে কোন না কোন শক্তি যা গ্যালাক্সীকে ধাক্কাচ্ছে। মহাকাশের গভীর অন্ধকারের নাম ডাক ম্যটার, সেটির পরিমাণ মোটামুটি ২৭ শতাংশ। ডার্ক ম্যটারের মধ্যে ভূতের মত লুকিয়ে আছে আরেক রহস্য চরিত্র। অদৃশ্য এই চরিত্র ভূতের মতোই পরাক্রমশালী। এর চরিত্র বড়ই মারমুখী। ডার্ক ম্যটারে ভূতের মতো লুকিয়ে থেকে অনবরত ধাক্কাচ্ছে ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুকে। এর নাম ডার্ক এনার্জি। পরিমাপ করে দেখা গেছে মহাকাশে ৬৮ শতাংশ এনার্জি নিয়ে ব্রহ্মাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে ডার্ক এনার্জি। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে হাবল সম্প্রসারণ তত্ব দিয়ে সম্প্রসারণ যেহেতু পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না সেহেতু নতুন কোন তত্ব কি অবশ্যম্ভাবী? বিলিয়ন ডলারের এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করছে হাবল সংকটের সমাধান। রাতের আকাশে আমরা মূলত দেখি গ্রহ, তারা, গ্যালাক্সী ইত্যাদি। প্রতিদিন লক্ষ কোটি তারা দেখি অথচ এর বেশীর ভাগ’ই বহু আগেই মরে গেছে। বিলিয়ন বিলিয়ন আলোকবর্ষ দুর থেকে আলো আসতে আসতে আমাদের চোখে পড়েছে গতকাল। মজার কথা হল আমাদের চোখে তারা বা গ্যালাক্সীর আলো পৌঁছার আগেই ঐ তারার মৃত্যু ঘটেছে। বিগ ব্যাং থেকে সূর্যের মতো লক্ষ কোটি তারার জন্ম হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে, আবার তারার জন্ম হচ্ছে। গ্যালক্সীগুলোকে অনবরত ধাক্কা দিয়ে দূরে, অনন্ত অসীমে নিয়ে যাচ্ছে কে? উত্তর হলো– ডার্ক এনার্জি। অদৃশ্য, অস্পৃশ্য, রহস্যময় এই এনার্জি।
একইভাবে গ্যালাক্সীগুলো দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানতে হবে মহাবিশ্বের শেষ কোথায়? মহাবিশ্বের সীমানা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে? দু’টো প্রশ্নের উত্তর হলো মহাবিশ্বের কোন সীমানা রেখা বা সীমানা প্রাচীর নেই। মহাবিশ্ব অনন্ত ও অসীম। তবে ব্রহ্মাণ্ডের দৃশ্যমান সীমারেখা বিজ্ঞানীদের মতে ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। অর্থাৎ ঐ পর্যন্ত আলো পৌঁছাতে পেরেছে বা ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দুর থেকে ভেসে আসা আলো রেডশীপের মাধ্যমে আমাদের চোখে ধরা পড়ে। ঐ দৃশ্যমান বাউন্ডারীর পর মহাবিশ্ব কত বিস্তৃত তার কোন আনুমানিক পরিমা বিজ্ঞানীদের বা মানবসভ্যতার হাতে নেই।
একটা কথা মোটামুটি পরিষ্কার। চলার পথে গ্যালাক্সীর তারাগুলো পথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে। সূর্যের মতো তারাগুলোর মৃত্যু হলে গ্যালাক্সীর কিচ্ছু যায় আসে না। পদার্থবিদ্যার নিজস্ব নিয়মে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার সৌর পরিবারের মৃত্যু হচ্ছে। তবে সূর্যের চেয়ে ৮ গুন বেশী ভরের তারার মৃত্যু হলে ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয়। দৌড়ানোর পথে বহু গ্যালাক্সীর বড় বড় তারাগুলো ব্ল্যাকহোলে বিলীন হওয়া শুরু করলে এক সময় পুরো গ্যালাক্সীই ব্ল্যাক হোলে স্থবির হয়ে যায়।
তবে এটা ঠিক গ্যালাক্সীগুলো ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষের সীমানা প্রাচীর বা গোলক অতিক্রমের পর এখনকার দৃশ্যমান রাতের আকাশ ক্রমাগত শূন্য হয়ে পড়বে। রাতের আকাশে এতো তারা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বছর পর আর দেখা যাবে না। এক সময় রাতের আকাশও তারা শূন্য হয়ে পড়বে। অবশ্য ততোদিনে আমাদের সূর্য, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সী কিছুই থাকবে না।
লেখক: আইনজীবী; প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।











