মশক নিধন কার্যক্রমে জনসম্পৃক্ততা জরুরি

| মঙ্গলবার , ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামকে মশার নগরী বলছেন কেউ কেউ। দুই ধরনের মশা, কিউলেক্স ও এডিস নগরকে দখল করে নিয়েছে বলা যায়। নগরবাসীর সঙ্গে কথা বললেই শোনা যায় তারা কীভাবে মশা দ্বারা আক্রান্ত। সর্বত্রই চলছে কিউলেক্স মশার দাপট। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, শীতের শেষে প্রকৃতিতে তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং এ অবস্থা কিউলেক্স মশার প্রজননের জন্য সহায়ক। এ আবহাওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক কিউলেক্স মশা জন্ম নিতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যেখানেসেখানে পানি জমে থাকায় কিউলেক্সের প্রচুর প্রজনন ঘটছে। এ তো গেল কিউলেক্সের কথা। ওদিকে এডিস মশার অবস্থাটা দেখা যাক। বৃষ্টিপাতহীন মৌসুমেও নতুন বছরের প্রথম ৫০ দিনে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অনেকে। জানা যায় দৈনিক রোগী ভর্তির হার ২৮। বোঝাই যাচ্ছে এডিস মশার প্রকোপ কতটা বেড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মশা এখন মৌসুমি দুর্ভোগ নয়, প্রায় সারা বছরের যন্ত্রণা। ব্যক্তিপর্যায়ে কয়েল বা অ্যারোসল দিয়ে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগরপরিকল্পনা, বদ্ধ জলাশয়ের তালিকা করে নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এসব কাজে জনসম্পৃক্ততা। ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি মনিটরিং ও তথ্যপ্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে, যাতে নাগরিকেরা জানতে পারেন তাঁদের এলাকায় পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।’

সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে নগরজুড়ে বিশেষ মশক নিধন ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এ কার্যক্রমের আওতায় নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ধারাবাহিকভাবে মশক নিধন অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে চসিক সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হবে। মশা নিয়ন্ত্রণে আমরা আমেরিকা থেকে বিটিআই নামের একটি অত্যন্ত কার্যকর মশার লার্ভা নিধক ঔষধ পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে বেশ ভালো ফল পাচ্ছি। এছাড়া, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ওয়ার্ডভিত্তিক মশক নিধন কার্যক্রম মনিটরিং করতে।

সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অন্যত্র বলেছেন, যে কোনো উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি নতুন নতুন কৌশল উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। নতুন ওষুধের সন্ধানের পাশাপাশি কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে লার্ভা খেতে পারে এমন মাছ বা কীটপতঙ্গ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সচেতনতায় জোর দেন।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। কিন্তু জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণকে সচেতন করার কোনো বিকল্প নেই। কীটতত্ত্ববিদরা মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কথা বলেন। এজন্য প্রথমত, চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়। কেননা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশা বেশি জন্মায়। দ্বিতীয়ত, জৈবিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে কোথায় কোথায় মশা বেশি, কোন ধরনের মশার উপদ্রব বেশি এবং এ মশার জন্য কোন ওষুধ কতটুকু ছিটাতে হবে, তা নির্ণয় করে ওই জায়গায় ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। যেন এসব জায়গায় নতুন করে মশা জন্মাতে না পারে। এছাড়া মশার অতিরিক্ত প্রজনন বন্ধের জন্য জলাশয়ে মাছ, হাঁস ছাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, রাসায়নিক ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে অনেকের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ওষুধ ছিটালেও মশার উপদ্রব কমাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ওষুধ দিলে সাময়িক মশার উৎপাত কমে, ওষুধের কার্যকারিতা কমে গেলে আবারো উপদ্রব বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মশা বাড়লে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়বে। ডেঙ্গুতে ভর্তি রোগীর অনুপাতে মৃত্যু বেশি। মৃত্যু কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে। ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা জিরোতে নিয়ে আসতে হবে। জনসচেতনতা যদি বৃদ্ধি করা না যায়, তাহলে মশক নিধন কর্মসূচি সফল হবে না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে