মরিচ-হলুদের গুঁড়ায় কাপড়ের রং মিশিয়ে তৈরি হয় মসলা

আজাদী প্রতিবেদন

৪৪০ কেজি হলুদ-মরিচের গুঁড়া ও ১২০ কেজি রং জব্দ তিন নারীসহ চার ব্যবসায়ী আটক | বৃহস্পতিবার , ২৩ মার্চ, ২০২৩ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

রমজান মাসে ইফতারে কম বেশি মসলার ব্যবহার হয়ে থাকে। তাই অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি মসলার বাজারেও থাকে চড়া দাম। এর সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তৈরি করছে ভেজাল মসলা। এই সব ভেজাল মশলা ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। এই রকম এক

 

তথ্যের কথা জানিয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)। গত মঙ্গলবার (২১ মার্চ) বিকেল ৫টায় ফেনী মডেল থানার মেসার্স তন্ময় ট্রেডার্স এবং জহির উদ্দিন ভূঁইয়ার মশলার মিল থেকে তিন নারীসহ চার ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। এসময় রাসায়নিক রং মেশানো ৮টি প্লাস্টিকের বস্তায় ৪৪০ কেজি হলুদমরিচের গুঁড়া ও ৭টি প্লাস্টিকের বস্তায় ১২০ কেজি রং পাওয়া যায়।

আটকরা হলেন, টুটুল সাহা (৫৫), জোসনা আক্তার (৪৮), রহিমা বেগম (৪০) এবং বিউটি খাতুন (৩৮)। র‌্যাব জানায়, মশলা মিল ঘরের ভেতর তল্লাশি করে ৮টি প্লাস্টিকের বস্তায় ৪৪০ কেজি ভেজাল রং মেশানো হলুদমরিচের গুঁড়া ও ৭টি প্লাস্টিকের বস্তায় ১২০ কেজি রং পাওয়া যায়।

র‌্যাব৭ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) মো. নূরুল আবছার আজাদীকে জানান, তারা দীর্ঘদিন যাবৎ অসৎ উপায়ে হলুদ, মরিচের গুঁড়ার সাথে রাসায়নিক রং মিশিয়ে ভেজাল মসলা তৈরি করে আসছে। এই সব ভেজাল মসলা ফেনী জেলার বিভিন্ন বাজারসহ নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাইকারিদের মাধ্যমে বিক্রি করে আসছে। মঙ্গলবার ভেজাল মসলা তৈরির খবর পেয়ে র‌্যাব তাদের আটক করে।

র‌্যাব জানায়, রমজান এলেই চট্টগ্রামে অবাধে শুরু হয় ভেজাল মসলার কারবার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন ঘাসের বীজ, চাল ও ডালের গুঁড়া, ধানের তুষে রঙ মিশিয়ে ভেজাল মসলা তৈরি ও বিক্রি করা হয়। ভেজাল মসলার বড় ক্রেতা হচ্ছে হাটবাজারের মুদি দোকানি ও নগরের বিভিন্ন হোটেলরেস্তোরাঁ। দাম

কিছুটা কম হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষও রান্নার কাজে এসব মসলা ব্যবহার করে থাকেন। আসল হলুদ ও মরিচের গুঁড়া ২৫০ টাকা কেজি হলেও ভেজাল মসলার গুঁড়া ১৩০ টাকায় পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ে ভেজালবিরোধী অভিযানে ভেজাল মসলা ব্যবসায়ীরা ধরা পড়লেও পরে জামিনে বের হয়ে আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রামের আছদগঞ্জ, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ ও রাজাখালী এলাকায় অগণিত ভেজাল মসলা তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা থেকে মসলার গুঁড়া বিভিন্ন এলাকায় খুচরা পাইকারি ও বিক্রেতাদের হাতে পৌঁছে যায়।

সম্প্রতি ভোক্তা অধিকারের ভেজালবিরোধী অভিযানে মসলায় ভেজাল মেশানোর বিষয়টি হাতেনাতে ধরা পড়ে। এসব কারখানায় ঘাসের বীজের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে ভেজাল গুঁড়া মসলা তৈরি করা হয়। ঘাসের বীজ বা কাউন, যা পাখির খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তা ভেজাল মসলার মূল উপকরণ। ঘাসের বীজ

গুঁড়া করে ক্ষতিকর রং মেশানো হয়। লাল রং মেশালে তৈরি হয়ে যায় মরিচের গুঁড়া আর হলুদ রং মেশালে একই গুঁড়া হয়ে যায় হলুদের। এর সঙ্গে কিছু শুকনা মরিচের গুঁড়া মেশালে মরিচের গুঁড়ায় হালকা ঝাল হয়। আর নকল হলুদের গুঁড়ায় কিছু আসল হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে দিলে ভেজাল মসলা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

এক মসলা ব্যবসায়ী জানান, গুঁড়া মসলায় যে রং মেশানো হয় তা কাপড়ে ব্যবহারের রং। নগরীর বিভিন্ন বাজারে ৩০০ টাকা কেজিতে এসব রং পাওয়া যায়। অথচ খাদ্যের পরিপূরক হিসেবে যে রং ব্যবহার করা হয় তার দাম ৫ হাজার টাকা কেজি।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হওয়া হলুদ, মরিচ ও মিঙড মসলায় মানবদেহের ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ক্রোমাটেড, মেটানিল ইয়োলো, টেঙটাইল ডাই পিউরি, পেপরিকা, ফিটকিরিসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল ও ইট, কাঠ, ভুট্টা,

চালের গুঁড়ার মিশ্রণ রয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে কৃষি কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়েছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুঁড়া মসলায় সাইপারমেথরিনের সহনীয় মাত্রা ০.০১ পিপিএমের স্থলে ০.৭৩ পিপিএম, ডায়াজিননের সহনীয় মাত্রা ০.০১ পিপিএম স্থলে ০.১৯ পিপিএম পাওয়া গেছে। যা মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। প্রতিবেদনে বলা হয়, মসলায় মেশানো রাসায়নিক দ্রব্যের জীবাণু গ্রহণ করায়

মানুষের শরীরে ক্যান্সার, কিডনি, লিভার আক্রান্তসহ অন্তত ৫০ ধরনের মারাত্মক রোগ ছড়াচ্ছে। যার ভয়াবহতায় অকালে ঝরছে অসংখ্য প্রাণ।

সচেতন মহলের অভিযোগ, অতি মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা মসলায় ভেজাল দিচ্ছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের এসব তদারকির কথা তারা রহস্যজনক কারণে নীরবতা পালন করছে।

নগরীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের এক গবেষক বলেন, মসলায় মেশানো ইট, কাঠ, ভুট্টা ও চালের গুঁড়া, ক্রোমাটেড, মেটানিল ইয়োলো, টেঙটাইল ডাই পিউরি, পেপরিকা, ফিটকিরিসহ বিভিন্ন কীটনাশক দ্রব্য ফুটিয়ে রান্না করলেও এর বিষক্রিয়া নষ্ট হয় না। যা দীর্ঘ

সময় গ্রহণে শরীরে মারাত্মক সব রোগ সৃষ্টি হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে শূন্যের দিকে নামতে থাকে। যার ভয়াবহতায় গর্ভবতী নারীদের থেকে বিকলাঙ্গ শিশু জন্মের আশঙ্কা থাকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআর কোনো পাতানো নির্বাচন বাংলাদেশে হবে না
পরবর্তী নিবন্ধসুজুকি গাড়ির এক্সক্লুসিভ শো-রুম এখন খুলনায়