কবিয়াল রমেশ শীল ছিলেন একজন গণকবিয়াল, যিনি তাঁর গানের মাধ্যমে সমাজের নানা সমস্যা, অন্যায়–অবিচার এবং মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। চিরায়ত কবিগানের বিষয়বস্তুকে পাল্টে তিনি সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাকে তাঁর গানের উপজীব্য করেছিলেন।
স্বদেশপ্রেম, ভাষা আন্দোলন এবং গণমানুষের অধিকারের বিষয়ে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি বহু গণসংগীত রচনা করেন যা সাধারণ মানুষকে সংগ্রামে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৫৫ সালে রচিত তাঁর একটি বিখ্যাত গান ‘ভাষার জন্য জীবন হারালী বাঙালী ভাইরে, রমনার মাটি রক্তে ভাসালী…!’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৫২–৫৩ সালে তাঁর রচিত ভাষা আন্দোলনের গান কিংবদন্তির মতো জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তিনি আজীবন গরিব, মজদুর, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জয়গান গেয়েছেন। অত্যাচারী শাসক ও শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল আগ্নেয়গিরির মতো।
কবিয়াল রমেশ শীল ১৮৭৭ সালের ৯ মে বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার গোমদণ্ডী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা চণ্ডীচরণ শীল, মাতা রাজকুমারী শীল। পিতার মৃত্যুর কারণে চতুর্থ শ্রেণিতেই তাঁর স্কুলজীবনের সমাপ্তি ঘটে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ভোট রহস্য’ এই পুস্তিকাটি ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনের পর কেন্দ্রীয় সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং এর জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাভোগ করতে হয়েছিল। তাঁর গ্রন্থের মধ্যে আশেকমালা, শান্তিভান্ডার, নুরে দুনিয়া, দেশের গান, চট্টল পরিচয়, ভাণ্ডারে মওলা, জীবন সাথী, মুক্তির দরবার, মানব বন্ধু, চাটগায়ের পল্লীগীতি (১ম ও ২য় ভাগ) উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে আগুন দিলে তাঁর লেখা গান ও কবিতার ১৮টি পাণ্ডুলিপির মধ্যে ১৭টিই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কোনোমতে একটি পাণ্ডুলিপি রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল।
বাংলা একাডেমি ১৯৯৩ সালে তাঁর বিপুল সংখ্যক রচনা নিয়ে ৫৩৫ পৃষ্ঠার ‘রমেশ শীল রচনাবলী’ প্রকাশ করে। তাঁকে ২০০২ সাথে মরণোত্তর একুশে পদক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এছাড়া ১৯৫৮ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সহবন্দীদের আয়োজিত জন্মদিনের সংবর্ধনা, ১৯৬২ সালে ঢাকার বুলবুল একাডেমী প্রদত্ত সংবর্ধনা, ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রামের নাগরিক সংবর্ধনা প্রভৃতি সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। তিনি ১৯৬৭ সালের ৬ এপ্রিল, রমেশ ভাণ্ডার, গোমদন্ডী, বোয়ালখালীতে মৃত্যুবরণ করেন।












