‘মব’ শব্দটি বলার পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ করার’ একটা মানসিকতা কাজ করে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি শব্দটি ব্যবহারে সবাইকে ‘সতর্ক’ থাকার কথাও বলেছেন। গতকাল রোববার ঢাকায় এক সংলাপে এমন মন্তব্য করার পর অন্যান্য আলোচকের সমালোচনার মুখে পড়েন তাজুল ইসলাম। তার এমন বক্তব্যকে কেউ কেউ ‘হুমকি’ হিসেবেও দেখছেন। খবর বিডিনিউজের।
রোববার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন’ শীর্ষক নীতি সংলাপ আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। এতে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ‘মব’ নিয়েও কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘মবকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এখন ‘মব’ সরকারকে খেয়ে ফেলছে, নির্বাচন কমিশনকে খেয়ে ফেলছে, দেশটাও কেউ খেয়ে ফেলতে পারে। সেই সময় মবকে দমন না করার ফল আমাদের দিতে হবে এখন।’
তার বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘মব শব্দটি প্রয়োগের আগে অবশ্যই খুব সতর্ক থাকতে হবে। বাস্তিল দুর্গের পতনের সঙ্গে আপনি রাস্তার ছিনতাইকারীর ‘মবকে’ মেলাতে পারবেন না। গণভবনের পতনের সেই বিপ্লবের যে অর্জন, সেটার সঙ্গে ‘মব’ শব্দটা বারবার ব্যবহার করা হয়। এই বিপ্লবীদেরকে অথবা বিপ্লব যারা করেছেন, তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো চেষ্টা যদি কোনো মহলের থাকে, আমি বলবো যে, সবারই সংযত হওয়া উচিত। এটা কখনো করবেন না। বিপ্লবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো আয়োজন, এটা কিন্তু বরদাস্ত করা যাবে না।’
এর পর বক্তব্য দিতে গিয়ে বিএনপি নেত্রী নিলুফার চৌধুরী বলেন, ‘চিফ প্রসিকিউটর বলে গেলেন মবকে মব বলা যাবে না। আচ্ছা, আমরা যে নামেই ডাকি না কেন, এটা তো সত্যি। এটা তো উনি বলে যেতে পারলেন না যে, এইসবের আইনের অনুশাসন কায়েম আছে, বিচার হচ্ছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম যেদিন একজন অর্ধ পাগলকে সারারাত খাইয়ে আবার পিটিয়ে যখন মেরে ফেলল, আমরা কি সেই বিচারটা হতে দেখেছি; দেড় বছর চলে গেছে।’ তিনি বলেন, জানা গেল তিনি মোবাইল তো চুরি করেই নাই, সে একটা পাগল, অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষকে সারারাত টর্চার করল, যেটা আমরা আবরারের সময় দেখেছিলাম। তাইলে সরকার এলো, সরকার গেল। দলীয় সরকার এলো, নির্দলীয় সরকার এলো, আমরা কি ওই জায়গা থেকে আলাদা হতে পেরেছি? পারিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের সমালোচনা করে সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘এখানে ডান পাশে বসা, উনি (তাজুল ইসলাম) চলে গেছেন। আমার কাছে মনে হলো উনি একটু ‘থ্রেটই’ করলেন।
উনি থাকলে এই কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, আমি আশা করি উনার কানে আমার কথাটা পৌঁছে দেবেন। মবকে জাস্টিফাইড করব? নিলুফা মনি তো খুব সাধারণ একটা উদাহরণ দিলেন।’
সিপিবির এই নেতা বলেন, ‘আপনি আইনের শাসন চান, আবার মবকে উসকান। এটা বাংলাদেশে চলবে না। এটা যদি চালাইতে চান, আইনের শাসন চলতে পারে না। এটা হচ্ছে পরিষ্কার কথা। ব্যাখ্যার দরকার নাই।’
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের আগে গত বছরের ২৬ জুন একই স্থানে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামোর পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম মবকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘বলা হচ্ছে মব তৈরি হচ্ছে, আমি এটাকে মব বলছি না, বলছি প্রেশার গ্রুপ।’
এভাবে মবকে বিভিন্নভাবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টার কারণে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পোড়ানোর মতো ঘটনা সামনে আসছে বলে মন্তব্য করেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। প্রেস সচিবের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই টেবিলে বসেই সরকারের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছিলেন, মব বলে কিছু নেই, এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ। এই জাস্টিফিকেশন দাঁড় করানোর কয়েক দিন পর আমরা দেখলাম, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, তারপর দেখলাম, তারা আর মব নিয়ে কথা বলছেন না।
এখন আবার যখন তারা মবের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছেন, আমরা আশঙ্কা করছি, অচিরেই হয়তো আমাদের ওই রকম কিছু ঘটনা বা দুর্ঘটনা দেখতে হতে পারে।’












