‘বলে পাহাড়–দেখায় তাহার আহার ভরা বুক
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ।’
হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে মুখ লুকিয়ে না রাখলেও ডিসি পাহাড়ের বুকে সেদিন হাজার হাজার মানুষের মুখ আমরা প্রত্যক্ষ করি। সেদিন একটি বিশেষ দিন। আকাশে বৈচিত্র্যময় মেঘের পাল তুলে আসে সেই বিশেষ দিনটি। পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। প্রতি বছর বিপুল উৎসাহ–উদ্দীপনা আর জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপন করা হয় সেই নববর্ষ। গুটি গুটি পায়ে জড়ো হয় মানুষ; কেউ একা– কেউ কেউ সদল বলে। আনন্দের এই অপূর্ব দিনে সবাই চান মন খুলে হাসতে, কথা বলতে, আড্ডা দিতে এবং ঘুরে বেড়াতে। চট্টগ্রাম শহরের মানুষ–সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো না কোনো সময় ঢুঁ মারবেনই পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে– বিশেষত ডিসি হিলের অনুষ্ঠানে। চট্টগ্রামে শুরু থেকে এখানে বসছে মিলনের মেলা। এটা পরিণত হয়েছে ঐতিহ্যে। এখন আরো কয়েক জায়গায় পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়। সিআরবিতে বিশাল আয়োজন। এবার শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেও আয়োজন করা হয়েছে বর্ষবরণ উৎসব। প্রতিটি আয়োজনে মানুষের ঢল নামে। ডিসি হিলে – সিআরবিতে সব হাসি হাসি মুখ। সাজ সাজ রব দেখে উচ্ছ্বসিত হই, উল্লসিত হই। যেদিক তাকাই মানুষ আর মানুষ, উপরে ওঠার জো নেই। তবু চেষ্টার শেষ নেই, শীর্ষে না ওঠা পর্যন্ত যেন শান্তি নেই।
‘আঁধারের কালো পাহাড় সরিয়ে জেগেছে সোনালি দিন
আঠালো রোদের ঝলসানো আলো চমকিত রঙিন।
সরেস বিটপী, সরস বনানী, ফল–মূল–তরুলতা–
মায়াহীন কায়া ফিরে পেলো ক্রমে অনাবিল সজীবতা।’
পহেলা বৈশাখের জন্য পুব আকাশের সূর্য সবাইকে হাতছানি দিচ্ছে। শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, নতুন বছরের। শেষ হয়ে গেলো আরেকটি বছর। যেন নীরবে মহাকালের সমুদ্রে মিলিয়ে গেলো একটি ঢেউ। ঢেউ যেমন সাগরে মিলিয়ে যায়, ফিরে আসে না। তেমনি সময় মিলিয়ে যায় কালের গহ্বরে, ফিরে আসে না। ১৪৩২ সালকে বিদায় দিচ্ছি, স্বাগত জানাচ্ছি ১৪৩৩ সালকে। স্বাগত জানাচ্ছি নতুন দিনকে, নতুন বছরকে। আমাদের সর্বজনীন উৎসবকে। নতুন দিন মানে নবউদ্যম, নতুন সজীবতা।
নতুনের উন্মাদনা, প্রকৃতির ভিন্নতা, পরিবেশের ঔজ্জ্বল্য, সর্বোপরি নববর্ষের উচ্ছ্বাস মানুষের মনকে অন্যরকম করে ফেলে। পহেলা বৈশাখ বাঙালি জীবনে উপস্থিত হয় নিরন্তর শুভ কামনা নিয়ে, অনন্ত উদ্দীপনা নিয়ে। আবহমান কাল ধরে অবিস্মরণীয় আবেগে দোলা দিয়ে যায় এই দিনটি। বৈশাখের রুদ্ররূপ কখনো কখনো ধ্বংসযজ্ঞের অবতারণা করলেও বিপুল ঐশ্বর্যময়তায় ভরপুর থাকে সবার হৃদয়। কখনো দমকা বাতাস মানুষের গতির ছন্দ ব্যাহত করে, কখনো উড়ে আসা ধুলো জুড়ে বসে মুখের ওপর। তবু যেন আনন্দের শেষ নেই। বৈশাখের মায়াবী স্পন্দন যেমন প্রকৃতিতে ভেসে বেড়াচ্ছে, তেমনি সবার বুক ছুঁয়ে উড়ে যায় আবেগের শাদা কপোত। মঞ্চে চলে নতুন দিনের আগমনী গান। তরুণ–তরুণীরা হাঁটে, কেউ একা, আবার কেউ দু’জন দু’জনার হয়ে, কেউ সপরিবারে। মুগ্ধ নয়নে এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি, গেঁথে রাখি সারা বছরের জন্যে।
বাংলা নববর্ষে প্রাণের ভেতর জোয়ার যেমন ওঠে, তেমনি পোশাকে–আশাকে ছন্দময় হয়ে ওঠে নিজের জীবন–প্রবাহ। রঙবাহারি আমেজে দেখা যায়–চারিদিক সাজ সাজ রব। মেয়েরা শাড়ি পরছে, সালোয়ার কামিজ পরছে; ছেলেরা পরছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া– কখনো কখনো শার্ট–টি শার্ট। নববর্ষের রঙটাই যেন আলাদা। তার রঙে রঙিন হয় সবার মন। মনের রঙ আর পোশাকের রঙ মিলে একাকার। শুধু ছোটোদের মধ্যে নয়, শুধু তরুণ–তরুণীদের মধ্যে নয়, সব বয়সী মানুষের মনে আনন্দের সঞ্চার হয়। এ অনুভূতি অন্যরকম, ব্যাখ্যাতীত।
বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা জুড়ে প্রতি বছরই নানা পণ্য সামগ্রীর পসরা সাজানো হয়। গ্রামীণ ও লোকজ সামগ্রীর পাশাপাশি ছোটোদের খেলনা, তালপাখা, বাঁশি, গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় সামগ্রী ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। খাবারের ভ্রাম্যমাণ দোকানের সাথে থাকে টুটুলদের আইসক্রিম বিক্রির প্রতিযোগিতা। ভেঁপু বাজছে, ঢোল বাজছে, বাঁশি বাজছে, গান ভেসে আসছে ইথারে– আহ্ কী বিচিত্র আনন্দময় ভুবন।
গরমের উত্তাপে গুমোট ও ঘামে ডুবে যাওয়া দিনে কখনো কখনো উদাস হয়ে যায় মন– যদি ভরাট কণ্ঠের আবৃত্তি কানের ভেতর দিয়া মরমে পশে। হ্যাঁ, প্রতি বছরের মতো এবারও ডিসি হিলে–সিআরবিতে বসবে গান কবিতার আসর। তীব্র তাপদাহে গান আর কবিতা বুলোবে শান্তির পরশ। সবাই হারিয়ে যাবে গান–কবিতার দেশে।
পহেলা বৈশাখে আমি আনন্দ ফেরি করে চলতে চাই। বুদ হয়ে থাকতে চাই কবিতায়–গানে। আমি আনন্দ–রথে চড়ে উড়াল দিতে চাই আমার স্বপ্নিল ভুবনে। প্রিয় মানুষের হাত ধরে নিজের মনকে রঙিন করে তুলতে চাই। অনুভব করতে চাই তার জাদুময় স্পর্শ।
২.
স্বাধীনতার বইমেলার রাদিয়া প্রকাশনের স্টলে গত শনিবার সন্ধ্যায় সৈয়দা করিমুননেসার কবিতার বই ‘ইশ যদি পাখি হতাম’–এর পাঠ উন্মোচন করা হয়। সৈয়দা করিমুননেসা তারুণ্যদীপ্ত কবি ও চিত্রশিল্পীর নাম। লেখালেখি ও চিত্রকর্মে তার সৃজনশীলতা স্পষ্ট। আমরা জানি, কবিতার যথার্থ কবিতা হওয়ার পেছনে কয়েকটি উপাদান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো– শব্দালঙ্কার, রূপক–উপমা–প্রতীক–রূপকল্প, ছন্দ ইত্যাদি। কবিতা এ সবের সমন্বিত প্রয়াস। সমালোচকরা বলেন, শিল্পী যেমন রঙ–তুলি ব্যবহার করে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বর্ণময়, চিত্রময়, সৌন্দর্যময় বিচিত্র ভুবন নির্মাণ করেন, কবিও তেমনি শব্দের কারুকাজ করে কবিতার পুষ্পিত ভুবন তৈরি করেন। সৈয়দা করিমুননেসা এভাবে তার কবিতার মাধ্যমে সৌন্দর্যময় বিচিত্র ভুবন নির্মাণ করে চলেছে। তাকে অভিনন্দন জানাই।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী;
ফেলো, বাংলা একাডেমি।














