অন্ত্যমধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি রহিমুন্নিসা চৌধুরানী এক তাৎপর্যপূর্ণ নাম। তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম মহিলা কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। যে সময়ে নারী শিক্ষা এবং বিশেষত মুসলিম নারীদের সাহিত্যচর্চা ছিল প্রায় অসম্ভব ও সমাজ–নিষিদ্ধ, সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রহিমুন্নিসার আত্মপ্রকাশ এক বিরল ব্যতিক্রম। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ না পেয়েও তিনি স্বীয় মেধা, অধ্যবসায় এবং মাতৃ–অনুপ্রেরণায় কাব্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় নিজের স্থান করে নিয়েছেন।
রহিমুন্নিসার জন্ম ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ শাসনামলে চট্টগ্রামের শুলকবহর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল আব্দুল কাদের এবং পিতামহ জংলি শাহ ছিলেন সুফি সাধক। তাঁর পূর্বপুরুষরা মক্কা থেকে এসে চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করেন।
শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন। ফলে তাঁর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের সুযোগ সহজলভ্য ছিল না। তবে জন্মগত প্রতিভা ও মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি স্বশিক্ষিত হন। চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া নিবাসী আবুল হোসেন নামের এক পণ্ডিতের কাছ হতে কবি রহিমুন্নিসা আরবী ফার্সি উর্দু ইংরেজি ও পুঁথি সাহিত্যের উপর শিক্ষা লাভ করেন। পণ্ডিত আবুল হোসেনের তত্ত্বাবধানে তিনি মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষায় বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।
১৮৬০ সালে (মতান্তরে এর কাছাকাছি সময়ে) হাটহাজারী উপজেলার জাফরাবাদের (বর্তমান রহিমপুর তাঁর ইন্তেকালের পরে কবির প্রতি শ্রদ্ধা এবং স্মারক হিসেবে তাঁর নামে এই গ্রামকে রহিমপুর নাম করণ করা হয়) বিখ্যাত জমিদার জান আলী চৌধুরীর প্রথম পুত্র আহমদ আলী চৌধুরীর সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁর স্বামী আহমদ আলী চৌধুরীও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। তাঁদের দুই কন্যা (সামেয়ান খাতুন ও দোরদানা খাতুন) এবং এক পুত্র (সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী) ছিল।
ড.এনামুল হক তাঁর বিখ্যাত ‘মনীষা মঞ্জুষা’ বইয়ে কবি রহিমুন্নিসা চৌধুরীর ইন্তেকাল ১৮০০ শতাব্দীতে উল্লেখ করেন। কবির বংশধর হিসেবে আমার পূর্ব পুরুষদের কাছ হতে আমি এই বিষয়ের সত্যতাও জানতে পারি।
ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁর বইয়ে কবির মৃত্যু সন ও ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকের মত একই হিসেবে উল্লেখ করেন। কবি রহিমুন্নিসা ‘লাইলী মজনু‘ কাব্য ও পদ্মাবতী কাব্য অনুবাদ করেছিলেন। তাছাড়া দোরদানা বিলাপ, ভ্রাতৃ বিলাপ নামের কবির আরো দুটি কাব্যও পাওয়া গিয়েছিল। বলাবাহুল্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমাদের বাড়ির কিছু সম্পদ একসময় নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ঐ সময় আমাদের পূর্ব পুরুষেরা কবি রহিমুন্নিসার লেখা আরো কয়েকটা কাব্য হারিয়ে ফেলেছিলেন।
কবি রহিমুন্নিসার প্রধান পরিচিতি তাঁর বিখ্যাত উচ্চমানের কাব্য ‘লাইলী মজনু আর মহাকবি আলাওল এর পদ্মাবতী কাব্য অনুবাদ এর জন্য। যদিও তাঁর অন্য রচনার পাণ্ডুলিপি (অপ্রকাশিত)। বাংলা একাডেমি বর্ধমান ভবনের লাইব্রেরিতে কবির অনুবাদ কাব্য লাইলী মজনু কাব্য এখনো সংরক্ষিত আছে।
কবি রহিমুন্নিসা চৌধুরীর জীবন ও সাহিত্যকর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো তাঁর ‘লাইলী মজনু‘ কাব্য। এই কাব্যের মূল ফারসি উপাখ্যানটি বিশ্বজুড়ে সুবিখ্যাত হলেও, রহিমুন্নিসার রচনায় একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তিনি এই বিদেশী প্রেম কাহিনির মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ভাষা–রীতির সংযোগ ঘটিয়েছেন।
এখানে তাঁর কাব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের (যা কাব্যের ভূমিকায় আত্মপরিচয় জ্ঞাপক) আলোচনা এবং বিশ্লেষণ দেওয়া হল। রহিমুন্নিসার কাব্যের ভূমিকায় এমন কিছু পঙ্ক্তি রয়েছে যেখানে তিনি নিজের পরিচয়, জন্মস্থান ও স্বামীর নাম উল্লেখ করেছেন। মধ্যযুগে পুরুষ কবিদের পাশাপাশি কবি রহিমুন্নিসা একজন নারী হয়ে তৎকালীন সামাজিক প্রতিকূলতার ভিতরে বসবাস করে ও অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেছিলেন, তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন নারীর পক্ষে কাব্যের শুরুতে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য পরিবেশন করা ছিল রীতিমতো সাহসিকতার কাজ।
কাব্যের অংশবিশেষ (উদ্ধৃতি) তে কবি লিখেছেন –
‘নাম মোর রহিমুন্নিসা কহি যে নিশ্চয়।
শুলকবহর গ্রামেতে নিবাস আলয়।
পতির নাম আহমদ আলী চৌধুরী হয়।
তাঁর আজ্ঞাপত্র লিখিলাম প্রেমময়।’
এই পঙক্তিগুলোতে কবির আত্মবিশ্বাস এবং সমাজের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে আত্মপ্রকাশের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পরিস্ফুট হয়েছে। তিনি সরাসরি নিজের নাম উচ্চারণ করে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মুসলিম নারীর পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। স্বামীর অনুপ্রেরণা: তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে স্বামীর ‘আজ্ঞাপত্র’ (অনুমতি বা উৎসাহ) পেয়েই তিনি কাব্য রচনায় হাত দিয়েছেন। এটি একদিকে তৎকালীন সামাজিক রীতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, আবার অন্যদিকে তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রতি স্বামীর সমর্থনকে প্রকাশ করে, যা তাঁর কাজে সহায়ক হয়েছিল। এই উল্লেখটি তৎকালীন সামাজিক বিন্যাসকেও তুলে ধরে।
‘শুলকবহর গ্রামেতে নিবাস আলয়’ উল্লেখের মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত হন । লাইলী মজনু‘ মূলত একটি জাগতিক প্রেমোপাখ্যান হলেও, রহিমুন্নিসা তাঁর কাব্যের শুরুতেই স্রষ্টা বন্দনা করেছেন এবং প্রেমকে ঐশ্বরিক প্রেমের (ইশ্ক্–এ–হাকিকি) সাথে কিছুটা মেলানোর চেষ্টা করেছেন। এটি মধ্যযুগের ধর্মীয় ভাবধারার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাঁর রচনায় উপস্থিত ছিল যুগান্তকারী সাহিত্যের উআদান। তাঁর ভাষা ছিল সে সময়ের বাংলা পুঁথি সাহিত্যের ভাষা, যা অনেকটা মিশ্র এবং তৎসম ও তদ্ভব শব্দের পাশাপাশি প্রচুর আরবি–ফারসি শব্দে পূর্ণ। এটি তাঁর সময়ের শিক্ষিত মুসলিম সমাজের ভাষারীতির প্রতিফলন । তিনি মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যের প্রচলিত লঘু ত্রিপদী ছন্দ ব্যবহার করেছেন, যা পাঠকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। তাঁর বর্ণনায় সরলতা, আবেগের গভীরতা এবং কাব্যিক অলংকারের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মূল কাহিনি নায়ক–নায়িকার বিরহ–ব্যথা, প্রেম ও ত্যাগ এসব কিছুর বর্ণনাতেই কবি নারীসুলভ সংবেদনশীলতা ও দরদের ছাপ রেখেছেন, যা তাঁর পুরুষ সমসাময়িকদের রচনার থেকে ভিন্নতা এনেছে।
ফারসি সাহিত্যের এই বিখ্যাত প্রেম উপাখ্যানটি অবলম্বনে রচিত তাঁর কাব্যটি মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতার প্রমাণ বহন করে। তাঁর এই কাব্যটিই তাঁকে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম মহিলা কবির আসনে বসিয়েছে। তাঁর কাব্যে তৎকালীন সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের পাশাপাশি একজন নারীর আবেগ ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে। বিশেষত, তাঁর কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি নিজের নাম–পরিচয়, জন্মস্থান এবং স্বামীর প্রতি অনুরাগ লঘু ত্রিপদী ছন্দে বর্ণনা করেছেন, যা তৎকালীন প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত বিরল এবং সাহসী পদক্ষেপ।
রহিমুন্নিসা এমন এক সময়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন যখন বাংলার সমাজে মেয়েদের প্রকাশ্যে আসা বা লেখালেখির সুযোগ ছিল না। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাঁর সাহিত্য–প্রয়াস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক আলোকবর্তিকা। তাঁর এই অসামান্য কীর্তি সেই সময়ের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজেও নারীর মেধা ও প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। তবে সমসাময়িক পুরুষ কবিদের মতো তিনি যথাযথ মূল্যায়িত হননি। এমনকি কালের পরিক্রমায় অনেকটা উপেক্ষিতও থেকে গেছেন।
তাঁর সাহিত্যকর্ম পরবর্তীকালে মুসলিম নারী কবি ও সাহিত্যিকদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সামাজিক সীমাবদ্ধতা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যেও নারীর পক্ষে শিল্প ও সাহিত্যে অবদান রাখা সম্ভব।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না পেয়েও শুধুমাত্র মাতৃ–শিক্ষাদাতা এবং পণ্ডিতের কাছ হতে শিক্ষা লাভ করে পুঁথি পাঠ–এর মাধ্যমে তিনি যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন, তা প্রমাণ করে যে স্বশিক্ষা ও আগ্রহ থাকলে সামাজিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব। তিনি আরব্য–ফারসি ইংরেজি উর্দু সাহিত্যের জনপ্রিয় উপাখ্যানকে বেছে নিলেও, তা পরিবেশন করেছেন সম্পূর্ণ বাঙালি ঢঙে এবং স্থানীয় ভাষারীতিতে। এর মাধ্যমে তিনি পুঁথি সাহিত্যের সেই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করেছেন যা সমাজের একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছাতো।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাসের অংশ : রহিমুন্নিসা চৌধুরী চট্টগ্রামের শুলকবহর গ্রামের বাসিন্দা এবং জাফরাবাদের (বর্তমান রহিমপুর) বিখ্যাত জমিদার পরিবারে বধূ ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামের সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। মধ্যযুগের অনেক শক্তিশালী কবি যেমন – দৌলত উজির বাহরাম খান, আলাওল তাঁদেরই ধারায় একজন নারী কবির সংযোজন আঞ্চলিক সাহিত্যের গুরুত্বকে বৃদ্ধি করেছে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল সংস্কৃতিমনা। স্বামী আহমদ আলী চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিজ পরিবারে সাহিত্যচর্চার সুযোগ থাকায় তিনি কঠোর পর্দা প্রথা সত্ত্বেও তাঁর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই পারিবারিক সমর্থন তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় খুবই বিরল ছিল।
নারী জাগরণের নীরব প্রতীক হিসেবে একজন আলোকিত সাহিত্যিক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ছিল নারী স্বাধীনতা বা নারী জাগরণের এক নীরব কিন্তু দৃঢ় প্রতীক। সমাজের যে অংশটি (মুসলিম নারী) সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও সাহিত্যচর্চা থেকে বঞ্চিত ছিল, তিনি সেই অংশ থেকে উঠে এসে নিজের নাম এবং কাব্য প্রকাশ করেছেন। এটি প্রমাণ করে, ‘অবরোধবাসিনী’ হয়েও মনের সৃজনশীলতাকে তিনি আটকে রাখতে দেননি। রহিমুন্নিসার অস্তিত্ব বাঙালি মুসলিম নারী লেখকদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। বেগম রোকেয়া বা ফয়জুন্নেসার মতো পরবর্তীকালে আসা লেখিকাদের অগ্রদূত হিসেবে তিনি আলোচিত না হলেও তাঁর জেগে উঠা নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পথে এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোকবর্তিকার মত।
তাঁর কাব্যের ভাষা ছিল সে সময়ের আরবি–ফারসি প্রভাবিত বাঙালি মুসলমানের কথ্য ভাষা, যা ‘দোভাষী পুঁথি সাহিত্য‘’এর বৈশিষ্ট্য। রহিমুন্নিসা কেবল একজন কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রতিকূলতার মাঝেও স্বশিক্ষিত এক নারী, যিনি সামাজিক রীতিনীতি মেনেও নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশে সফল হয়েছিলেন এবং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মুসলিম নারীর নীরব কিন্তু অনিবার্য উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলেন।
কবি রহিমুন্নিসা চৌধুরানী অন্ত্যমধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর রচিত ‘লাইলী মজনু’ আর পদ্মাবতী কাব্য কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং শত শত বছরের সামাজিক বঞ্চনার মাঝে দাঁড়িয়ে এক নারীর প্রতিভার দুঃসাহসিক আত্মপ্রকাশ। তিনি প্রথম মুসলিম মহিলা কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন, তা তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।
পরিশেষে বলতে হয়, এমন একজন মহীয়সী নারীর বংশধর হতে পেরে আমরা গর্ববোধ করি। তার পরিচয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই, গর্বিত হই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতের উঁচু স্থান দান করুক। তথ্যসূত্র : বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রকাশিত প্রবন্ধসমূহ।
লেখক: কবি রহিমুন্নিসার চতুর্থ বংশধর।












