পবিত্র রমজান মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকালে যৌথভাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইরানে হামলা চালিয়েছে। গত জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর নতুন করে হামলা হলো। কিন্তু এমন সময় এই হামলা চালানো হয় যখন সামরিক সংঘাত এড়াতে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবার আলোচনা শুরু করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পাল্টা জবাবে ইরানও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও আবুধাবির মতো শহর এবং কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো, যেগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে তারাই এই হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। মনে হয় এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নতুন এক সংঘাত ও সংকটের মধ্যে নিমজ্জিত হতে যাচ্ছে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবি করে আসছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম হতে পারে। যদিও তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কথা অস্বীকার করে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর বিষয়টি মার্কিন আধিপত্যের বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী শক্তিগুলোর জন্যও একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ৯টি দেশের পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে যার মধ্যে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দেশ রয়েছে ৫টি তারা হলো রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং চীন। ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরায়েলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও পারমানবিক অস্ত্র রয়েছে বলে ধারনা করা হয়। তবে প্রশ্ন হলো অন্যের কাছে যদি পারমানবিক অস্ত্র থেকে থাকে তাহলে ইরান বা উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে কেন এত আপত্তি–এর কারণ দিবালোকের মতো সত্যি যে, ইরান এবং উত্তর কোরিয়া যেহেতু যুক্তরাষ্টের মিত্র দেশ নয় সে কারণে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বেশি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইরানের সঙ্গে আলোচনার নাটক সাজিয়ে ট্রাম্প আসলে সময় ক্ষেপণ করছিলেন। হয়তো তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি করা।
প্রাসঙ্গিকভাবে প্রশ্ন আসে তাহলে কি চীন বা রাশিয়া ইরানের পক্ষে এগিয়ে আসবে? যদি আসে, তবে সেই সাহায্য কেমন হবে? রাশিয়া বা চীন সরাসরি সেনা পাঠিয়ে বা কোনো যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়াবে এ সম্ভাবনা খুবই কম। চীন যদিও সরাসরি সংঘাতে জড়াতে চায় না, তবু সামরিক সহযোগিতা থেকে বেইজিং পিছিয়ে থাকেনি। বহিরাগত চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখার জন্য ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে চীন। তবে যেকোনো পদক্ষেপ যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যাপক সংঘাত ঘটাতে পারে এমন বিষয় হলে তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে চীন।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বন্ধ করা নয়, তাদের লক্ষ্য ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে উৎখাত করে ভেনিজুয়েলার মত একটি পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। যাতে ভবিষ্যতে ইরান আর মধ্যপ্রাচ্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে কর্তৃত্ব যেন আরো সুদৃঢ় হয়। এই প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক বক্তব্যে ইরানিদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার হুমকি দূর করবে, একই সঙ্গে ইরানিদের জন্য তাঁদের শাসক উৎখাত করার সুযোগ তৈরি করবে। এবং আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা আপনাদের সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিন। সম্ভবত পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এটিই আপনাদের একমাত্র সুযোগ। ইরানিদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন উগ্রবাদী ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ যৌথ হামলা ‘সাহসী ইরানি জনগণের জন্য তাঁদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে’। তবে এই যুদ্ধ যদি ইরানের সরকার বদলের লক্ষ্যে হয়, তা কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ থাকবে না তার ভার বহন করতে হবে ইরানের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের। আর সেটাই হবে আগামীদিনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট এই হামলার সুযোগ করে দিয়েছে। নানা কারণে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির শুরুতে ইরানে দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয়েছিল, দীর্ঘদিনের গভীর অর্থনৈতিক সংকটই ছিল সেই বিক্ষোভের মূল কারণ। কিন্তু এই রাজনৈতিক কৌশল আর ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে আটকে রয়েছে ৯ কোটির বেশি সাধারণ মানুষ। এই যুদ্ধের ফলে তাদের জীবনই এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে। জাতিগত বিভাজন আরও প্রকট হয়ে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে ইরান বলতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে অনেকটা একঘরে হয়ে আছে। পার্শ্ববর্তী কোন দেশ তাদের সহযোগিতা করছে না বরং সে সব দেশের যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটি থেকে তারা ইরানের উপর হামলা করতে সমর্থন যোগাচ্ছে। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী রাশিয়া–চীনসহ পরাশক্তি এবং অন্যান্য দেশসমূহ ইরানকে সরাসরি কোন সামরিক সহযোগিতা করছে না। তাই বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই অসম যুদ্ধ খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী অথবা এই যুদ্ধে ইরানের জয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যে সমস্ত রাষ্ট্র ইসরায়েল –যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলাকে সমর্থন করছে তাদের উপর ইরানের এলোপাতাড়ি ক্ষেপনাস্ত্র হামলা সেসব দেশও ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। সুতরাং এ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট সৃষ্টি হবে সেটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এবং সেটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে। যার কারণ ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, এবং সামরিক তৎপরতা বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়ায় এর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখন এক ভয়াবহ ও অযৌক্তিক আগ্রাসনের মঞ্চে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় কাঁপছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার, কিন্তু এবার কোনো উপসাগরীয় দেশই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে রেহাই পায়নি। এমনকি ওমান যেখানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করছিলো, সে ওমানেও হামলা হয়েছে। উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে কয়েক সপ্তাহ ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছিল কারণ তারা আশঙ্কা করছিল, এই সংঘাতের প্রভাব তাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলোর জনসংখ্যার বড় অংশই বিদেশি শ্রমিক এবং তাঁরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে হয়। সর্বশেষ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বলতে হয়, ‘সাম্রাজ্যবাদের বুলেট যাদের পিছু নেয় তাদের পরাজয় শুধু সময়ের ব্যাপার’।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।











