মক্কায় শয়তানকে পাথর মারার স্তম্ভের নকশাকার বাংলাদেশের ইব্রাহীম

মোয়াজ্জেম হোসেন | শুক্রবার , ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ

ইসলামের পঞ্চমস্তম্ভের অন্যতম হজ। পবিত্র হজের অন্যতম ওয়াজিব বিধান হলো জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা। শয়তানকে উদ্দেশ্য করে হজযাত্রীরা তিনটি স্থানে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। যদিও এই তিনটি স্থানে শয়তান বিদ্যমান নেই, কিন্তু হজযাত্রীদের কঙ্কর নিক্ষেপণ দেখে শয়তান অপমানে জ্বলতে থাকে।

মসজিদে খায়েফ থেকে মক্কার দিকে আসার সময় প্রথমে জামারায় সগির বা ছোট শয়তান, তারপর জামারায় ওস্তা বা মেজ শয়তান, এরপর জামারায় আকাবা বা বড় শয়তান। একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব প্রায় ৩৩০ মিটার। জনশ্রুতি আছে, হজরত ইব্রাহিম (.) নিজ সন্তান ইসমাইলকে (.)-কে কোরবানি করার জন্য মিনায় নিয়ে যাচ্ছিলেন। জামারায় পৌঁছালে শয়তান তাঁকে ধোঁকা দেয়। তখন শয়তানকে লক্ষ্য করে তিনি পাথর নিক্ষেপ করেন। তিন শয়তানকে তাকবিরসহ পাথর নিক্ষেপ করা হজের অপরিহার্য অংশ। শয়তানের প্রতি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই পাথর নিক্ষেপ করা হয়।

জামারা কেন্দ্রীয়ভাবে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, এখানে তাপমাত্রা থাকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য জামারার ভেতরে একাধিক ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা আছে। রয়েছে পর্যাপ্ত টয়লেট, খাবারের দোকান ও সেলুন। জরুরি প্রয়োজনে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য রয়েছে হেলিপ্যাডও।

পাথর নিক্ষেপের সুবিধার্থে মিনার পূর্ব দিক থেকে আসা হাজিরা আসবেন নিচতলা ও দোতলায়, মক্কা থেকে আসা হাজিরা তৃতীয় তলায়, উত্তর দিক ও মোয়াইসিম থেকে আসা হাজিরা চতুর্থ তলায় এবং আজিজিয়া থেকে আসা হাজিরা পঞ্চম তলায় উঠে পাথর নিক্ষেপ করবেন। ১২টি করে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ আছে এখানে। এখন হাজিদের পাথর মারার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া আছে। মোয়াল্লেম নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে পাথর মারতে হয়।

ইব্রাহিম আ. এর হজের প্রতীকী পুনর্ব্যক্তকরণ, যেখানে তিনি শয়তানকে আল্লাহর ইচ্ছা অমান্য করার জন্য মুসলমানদের প্রলোভনের প্রতিনিধিত্বকারী তিনটি স্তম্ভ পাথর ছুঁড়ে মারেন। তিনটি জামারাতই শয়তানকে প্রতিনিধিত্ব করে: প্রথম এবং বৃহত্তমটি ইসমাইল (.) কে বলিদানের বিরুদ্ধে ইব্রাহিমের প্রলোভনকে প্রতিনিধিত্ব করে; দ্বিতীয়টি ইব্রাহিমের স্ত্রী হাজেরার প্রলোভনকে প্রতিনিধিত্ব করে যাতে তিনি তাকে থামাতে পারেন; তৃতীয়টি ইসমাইলকে বলিদান এড়াতে তার প্রলোভনের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবারই তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল এবং পাথর নিক্ষেপ সেই তিরস্কারের প্রতীক।

জামারাতকে পাথর ছুঁড়ে মারার অর্থ হলো, স্বৈরাচারীদের পদদলিত করা এবং তাদের সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা। যখন কেউ তাদের উপর এবং তাদের প্রতি ঘৃণার উপর মনোনিবেশ করে, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে নিজের আত্মার উপর মনোনিবেশ করা হয় এবং যথার্থভাবেই জামারাতকে পাথর ছুঁঙে মারার সময় , একজনকে সম্পূর্ণরূপে নিজের আত্মার উপর মনোনিবেশ করতে হবে। এটি একজন ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ প্রলোভন বা নীচ আকাঙ্ক্ষার উপর আক্রমণ এবং নফস থেকে দূরে সরে যাওয়ার এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আরও আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দেয়।

এক সময় হজ পালন করতে গিয়ে জামারাতে শয়তানকে পাথর মারার ক্ষেত্রে কোনো নিয়ম না থাকায় যে যেদিক থেকে পারত, পাথর মারা শুরু করত এবং একপর্যায়ে বিশৃঙ্খলায় পদদলিত হয়ে প্রাণ হারাতো। অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে শয়তানকে পাথর মারতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ১৯৯৪ সালে ২৭০ জন হাজী মারা যান। ওই বছর বাংলাদেশের প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম সস্ত্রীক হজ করতে যান। তিনি এই দৃশ্য দেখে মর্মাহত হয়ে চিন্তা করতে লাগলেনকীভাবে তা থামানো যায়। দেশে ফিরে তিনি এই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেন। অবশেষে শয়তানকে পাথর মারার একমুখী বিজ্ঞানসম্মত চারটি ধাপ সম্পন্ন একটি প্রকল্প প্রণয়ন করেন।

তাঁর প্রস্তাবিত প্রকল্পটি হচ্ছে

. প্রতিটি জামরাকে বেড়া দিয়ে পরস্পর সংযুক্ত করা, যাতে উভয়দিকে দু’টি রাস্তার সৃষ্টি হয়। ২. জামরার দেয়াল ছয় ফুট বাই ছয় ফুট থেকে উভয়দিকে অন্তত ৩০ ফুট করে বাড়িয়ে নেয়া।

. একমুখী ট্রাফিক সিগনালের ব্যবস্থা করা।

. মিনার দিকে ‘ইন’ ও অপর প্রান্তে ‘আউট’ বসিয়ে হাজিদের চলাচল একমুখি করা। একদিক দিয়ে ঢুকে পাথর মেরে অপরদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবেন হাজিরা কিন্তু কেউ পেছনে ফিরবেন না। এই বিস্তারিত প্রকল্পটি প্রকৌশলী ইব্রাহীম প্রথমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ে জমা দেন। সেখান থেকে ঢাকার সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরিকল্পনাটি এত নিখুঁত এবং বাস্তবসম্মত ছিলো যে সৌদি সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করেন। আর এরই মধ্য দিয়ে এই মেধাবী বাংলাদেশি হজের সময় প্রতিবছর পদদলিত হয়ে মৃত্যুর মিছিল থামাতে সমর্থ হন। সৌদি বাদশা ফাহাদ প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে তাঁর এই অসাধারণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ‘মুহিব্বুল খায়ের’ বা কল্যাণকামী উপাধিতে ভূষিত করেন। তাঁর জন্য উপহারসামগ্রীও পাঠান। শুধু তাই নয়, পরে তাঁকে পবিত্র মক্কায় প্রকল্পপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করারও সুযোগ করে দেন।

তৎকালীন কাবা শরিফের প্রধান ঈমাম শায়খ আবদুস সুবাইল তাঁকে পৃথিবীর ১০ জন সেরা প্রকৌশলীর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। কেননা এর আগে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজারো প্রকৌশলী হজ করতে গেলেও কেউ কখনো এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি বা সমস্যা নিরসনের উদ্যোগ নেননি। মিনায় বর্ধিত প্রকল্পের পাশে রাস্তার ধারে সবুজ গালিচায় সাদা অক্ষরে ‘মোহান্দেস ইব্রাহিম মিনাল বাংলাদেশ’ ও ‘ ঊহমরহববৎ ওনৎধযরস ভৎড়স ইধহমষধফবংয’ লিখে টাঙিয়ে দেয়া হয়।

মুসলিম বিশ্বে ‘আর্কিটেক্ট অব মডিফিকেশন প্লান অব জামরা’ নামে খ্যাত প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীমকে দেশের মানুষ খুব বেশি চেনেন, এমন নয়। কিন্তু তিনি তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে এমন এক অসাধ্য সাধন করেছেন, যার মাধ্যমে প্রতিবছর শত শত মানুষের প্রাণরক্ষা হচ্ছে।

প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম ১৯৪১ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাবুপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আলহাজ মো. ইদ্রিস চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণগোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য প্রধান শিক্ষক ছিলেন। মেধাবী ছাত্র মোহাম্মদ ইব্রাহীম ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন। কিন্তু তৃতীয় বর্ষে উঠে স্বাস্থ্যগত কারণে রাজশাহী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইগ্রেশন নিয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর জাপানে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে শিক্ষা বিভাগ, বিআরটিসি, ওয়াপদা এবং সর্বশেষ বিসিআইসিতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

বিসিআইসির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসর গ্রহণকারী মোহাম্মদ ইব্রাহীমের উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে ‘ঐড় িঃড় নঁরষফ ধ হরপব যড়সব’ বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

তাঁর অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রাহে মক্কা রাহে, মদিনা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রইং, কোরানিক গাইড, হজ পরিক্রমা, স্বল্পমূল্যে গৃহনির্মাণ, আল কুরআনে আধুনিক বিজ্ঞান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাবুপুর গ্রামে ইসলামিয়া ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুদানে কয়েকটি মাদ্রাসা ও মসজিদ পরিচালিত হয়। এই মহান প্রকৌশলী ২০১৭ সালের ৮ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

পূর্ববর্তী নিবন্ধরোজাদারের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ পুরস্কার
পরবর্তী নিবন্ধঅর্থবছর ২০২৪-২৫ প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯%, পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন