(দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব )
ভেরা চিতিলোভার চলচ্চিত্রগুলোর গভীরে এক শক্তিশালী দার্শনিক কাঠামো বিদ্যমান। তিনি কেবল বিনোদনের জন্য সিনেমা নির্মাণ করতেন না, বরং তাঁর প্রতিটি ফ্রেম ছিল দর্শকের চিন্তাশক্তিকে উসকে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। তাঁর দর্শনের প্রধান কিছু দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
চিতিলোভাকে প্রায়ই একজন উগ্র নারীবাদী (Militant Feminist) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু তিনি নিজে এই তকমা গ্রহণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না । তিনি নিজেকে একজন ‘ব্যক্তিবাদী’ (Individualist) হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসতেন । তাঁর মতে, সমাজ বা কোনো গোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত ও নীতি বড়। তিনি বলতেন, “যদি তুমি কোনো নিয়ম পছন্দ না করো, তবে তা ভেঙে ফেলো” । তাঁর নারী চরিত্রগুলো প্রায়ই প্রথাগত সুন্দর আচরণ বা সেবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ধ্বংসাত্মক ও স্বার্থপর হয়ে ওঠে, যা আসলে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আরোপিত শৃঙ্খল ভাঙার একটি রূপক।
চিতিলোভার অন্যতম প্রিয় বিষয় ছিল নৈতিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষ যখন চিন্তা করা ছেড়ে দেয়, তখন সে আর পূর্ণ মানুষ থাকে না । তিনি অলসতাকে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করতেন। তাঁর মতে, বিনোদন এবং চিন্তার মধ্যে এক গভীর সংযোগ থাকা উচিত । ‘ডেইজিস’ চলচ্চিত্রের দুই মারি–কে তিনি কোনো বীর বা আদর্শ হিসেবে দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন যে কীভাবে একটি মূল্যবোধহীন সমাজ মানুষকে লক্ষ্যহীন ও ক্ষতিকারক করে তোলে । তিনি এটিকে একটি ‘দার্শনিক প্রহসন’ (Philosophical farce) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
চিতিলোভার চলচ্চিত্রে চরিত্রগুলোকে প্রায়ই যান্ত্রিকভাবে পুতুলের মতো নড়াচড়া করতে দেখা যায়। এটি মূলত হাইনরিশ ফন ক্লেইস্টের (Heinrich von Kleist) পুতুল নাচের দর্শনের সাথে সম্পর্কিত। চিতিলোভা দেখাতে চেয়েছেন যে, যখন মানুষের জীবনে কোনো গভীর উদ্দেশ্য থাকে না, তখন সে কেবল পরিস্থিতির হাতে নিয়ন্ত্রিত একটি পুতুল মাত্র । এই যান্ত্রিকতা বা পুতুলসুলভ আচরণ আসলে এক ধরনের প্রতিবাদ–কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে যেখানে মানুষের নিজস্ব কোনো স্বর নেই।
১৯৬৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে চেকোস্লোভাকিয়ায় ‘প্রাগ স্প্রিং’ (Prague Spring) আন্দোলন দমন করা হয় । এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশে নেমে আসে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যাকে বলা হয় ‘নরমালাইজেশন’ (Normalization)। এই সময়ে অনেক শিল্পী ও পরিচালক দেশ ছেড়ে চলে যান। মিলোস ফরম্যান এবং ইভান পাসার যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেও চিতিলোভা তাঁর মাতৃভূমিতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন । তাঁর ভাষায়, “তখন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা একটি মিশনে পরিণত হয়েছিল”।
১৯৬৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চিতিলোভাকে কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে দেওয়া হয়নি । এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাঁর স্বামী জারোস্লাভ কুচেরার নামে বিছু বিজ্ঞাপনী কাজ করতেন এবং গোপনে পরবর্তী চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা করতেন। ১৯৭৬ সালে তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার রাষ্ট্রপতি গুস্তাভ হুসাক–কে একটি খোলা চিঠি লেখেন যার শিরোনাম ছিল “আই ওয়ান্ট টু ওয়ার্ক” (I Want to work) । এই চিঠিতে তিনি সরাসরি পুরুষতান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করেন এবং অভিযোগ করেন যে তাঁকে কাজ করতে না দেওয়া সমাজতান্ত্রিক আদর্শের অবমাননা ।
অবশেষে ১৯৭৬ সালে তিনি ‘দ্য অ্যাপল গেম’ (Hra o jablko) নির্মাণের অনুমতি পান । তবে এরপরও তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল বাধার সম্মুখীন। তিনি নিজেকে একটি “অতিরিক্ত উত্তপ্ত কেটলি” (An overheated kettle) হিসেবে বর্ণনা করতেন যা কখনোই নেভানো সম্ভব নয় । তাঁর জেদ এবং সৃজনশীলতার কাছে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপও হার মেনেছিল।
১৯৮৯ সালে ভেলভেট রেভল্যুশনের পর চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিজমের পতন ঘটলে অনেক শিল্পীই ভেবেছিলেন যে এবার তাঁদের স্বাধীনতা আসবে। কিন্তু চিতিলোভা ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন বিদ্রোহী। তিনি লক্ষ্য করলেন যে নতুন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের নৈতিকতা কেবল ভোগবাদ (Consumerism) এবং ব্যক্তিগত লোভের কাছে বন্দি হয়ে পড়ছে।
তাঁর ১৯৯০–পরবর্তী চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি এই নতুন সমাজ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে ব্যঙ্গ করেছেন। বিশেষ করে ‘দ্য ইনহেরিটেন্স’ (The inheritance 1992) এবং ‘ট্র্যাপস’ (Traps 1998) চলচ্চিত্রে তিনি দেখিয়েছেন যে কীভাবে নতুন বিত্তবান শ্রেণি নারীদের পণ্য হিসেবে দেখে এবং ভোগবাদী লালসা কীভাবে সমাজকে ধ্বংস করছে । তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে হাহাকার বা কান্নার চেয়েও বেশি ক্ষত তৈরি করত তাঁর নির্মম হাসি বা বিদ্রূপ
চিতিলোভা কেবল পরিচালক হিসেবেই নয়, একজন শিক্ষক হিসেবেও অমূল্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি প্রাগের FAMU–তে দীর্ঘদিন পরিচালনা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। তাঁর হাত ধরেই অনেক নতুন নির্মাতা তৈরি হয়েছেন যারা বর্তমান চেক চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ভেরা চিতিলোভার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল চলচ্চিত্রের মতোই বর্ণিল। তিনি চিত্রগ্রাহক জারোস্লাভ কুচেরাকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান–তেরেজা কুচেরোভা একজন প্রখ্যাত শিল্পী এবং স্তেপান কুচেরা একজন সফল সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে মায়ের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন । চিতিলোভার শেষ দিকের কাজগুলোতে তাঁর সন্তানদেরও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল, যা তাঁর পরিবারিক বন্ধন ও শৈল্পিক উত্তরাধিকারের প্রমাণ দেয় ।
২০১৪ সালের ১২ মার্চ ৮৫ বছর বয়সে প্রাগে এই চিরবিদ্রোহী শিল্পীর প্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ব চলচ্চিত্র একজন নির্ভীক কণ্ঠস্বরকে হারায় যিনি কখনোই ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর মৃত্যু সংবাদে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং দ্য গার্ডিয়ানের মতো বিশ্বসেরা সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে “চেক চলচ্চিত্রের প্রথম নারী” এবং “অদম্য উদ্ভাবক” হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
ভেরা চিতিলোভার জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি ছিলেন একজন আপসহীন যোদ্ধা। তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে লুকিয়ে থাকত চেকোস্লোভাকিয়ার ধুলোমাখা রাস্তা থেকে শুরু করে মানুষের মনের অন্ধকার গলির খবর। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফি ছিল বিশৃঙ্খলার মধ্যে এক অনন্য শৃঙ্খলা, যেখানে প্রতিটি কাঁপানো ক্যামেরা শট বা রঙিন ফিল্টার একটি গভীর সত্য উচ্চারণ করত।
চিতিলোভা আমাদের শিখিয়েছেন যে চলচ্চিত্রের কাজ কেবল গল্প বলা নয়, বরং গল্পকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে নতুন করে গড়তে শেখানো। তিনি দেখিয়েছিলেন যে নারীর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখলে তার দৃশ্যপট কেমন বদলে যায়। আজ যখন আমরা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের দিকে তাকাই, তখন ভেরা চিতিলোভা কেবল একজন চেক পরিচালক হিসেবে নন, বরং এক বৈশ্বিক আইকন হিসেবে ভাস্বর হয়ে থাকেন যাঁর কাজ চিরকাল আমাদের স্বাধীনতার প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। তাঁর ফেলে যাওয়া প্রতিটি চলচ্চিত্রই এক একটি ‘পয়জনাস গিফট’ বা বিষাক্ত উপহারের মতো–যা দেখতে চমৎকার কিন্তু যাঁর প্রতিটি অংশ সমাজ ও মানুষের ভণ্ডামিকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। ভেরা চিতিলোভা ছিলেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি অন্ধকারের মধ্যেও উজ্জ্বল রঙের ফিল্টার লাগিয়ে সত্যকে খুঁজে নিতে জানতেন।













