ভেরা চিতিলোভা: চেক নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্রের বিদ্রোহী রূপকার ও তাঁর দার্শনিক অভিযাত্রা

অর্ক চৌধুরী | সোমবার , ৩০ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ

(পর্ব ১)

বিংশ শতাব্দীর ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ভেরা চিতিলোভা (Vera Chytilova) কেবলমাত্র একজন পরিচালক নন, বরং তিনি ছিলেন একাধারে একজন সমাজতাত্ত্বিক, দার্শনিক এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী কণ্ঠস্বর। ১৯২৯ সালে জন্ম নেওয়া এই চেক শিল্পী তাঁর বৈপ্লবিক সিনেমাটোগ্রাফিক স্টাইল এবং প্রথাভাঙ্গা বর্ণনারীতির মাধ্যমে বিশ্ব চলচ্চিত্রের গতিপথ পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। চেকোস্লোভাকিয়ার কমিউনিস্ট শাসনের কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যে থেকেও তিনি যেভাবে শিল্পের স্বাধীনতাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, তা সমসাময়িক এবং পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে কাজ করে। এই প্রতিবেদনে ভেরা চিতিলোভার শৈশব, তাঁর জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাসমূহ, চলচ্চিত্রের কারিগরি শৈলী এবং তাঁর গভীর দার্শনিক অভিযাত্রার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিবিড় বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হচ্ছে।

ভেরা চিতিলোভার জীবন ও কাজের ভিত্তি বুঝতে হলে তাঁর প্রারম্ভিক জীবনের অস্থিরতা এবং পরিবর্তনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। ১৯২৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি চেকোস্লোভাকিয়ার ওস্ট্রাভাতে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম হয় । তাঁর শৈশবকাল অতিবাহিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং পরবর্তী সময়ে চেকোস্লোভাকিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্থানের ক্রান্তিলগ্নে । এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তাঁর মনে যে গভীর ছাপ ফেলেছিল, তা পরবর্তীকালে তাঁর চলচ্চিত্রের প্রতিটি ফ্রেমে প্রতিফলিত হয়েছে ।

চিতিলোভার শিক্ষা জীবনের শুরু চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হয়নি। প্রাথমিকভাবে তিনি ব্রেনাতে স্থাপত্য (Architecture) এবং দর্শন (Philosophy) নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । তবে এই প্রথাগত শিক্ষা তাঁকে খুব বেশিদিন আটকে রাখতে পারেনি। তিনি মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জনে মনোনিবেশ করেন। তিনি একজন খসড়াকার (Draftswomen), ফ্যাশন মডেল এবং ফটো রিটাচার হিসেবে কাজ করেন । এই বিচিত্র পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের বাহ্যিক রূপ এবং গঠনশৈলী সম্পর্কে এক গভীর ধারণা প্রদান করে, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সিনেমাটোগ্রাফিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছিল।

চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর প্রকৃত আকর্ষণ তৈরি হয় যখন তিনি প্রাগের বিখ্যাত বারান্দভ ফিল্ম স্টুডিওতে (Barrandov Film Studios) ক্ল্যাপার গার্ল (Clapper girl) হিসেবে কাজ শুরু করেন । এই স্টুডিওর পরিবেশে কাজ করতে গিয়েই তিনি অনুধাবন করেন যে চলচ্চিত্রই হতে পারে তাঁর ভাব প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তবে তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক চলচ্চিত্র শিল্পে তাঁর যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি যখন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য স্টুডিওর সুপারিশ চান, তখন তাঁকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু চিতিলোভার অদম্য জেদ এবং শিল্পবোধ তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। অবশেষে ২৮ বছর বয়সে তিনি প্রাগের স্বনামধন্য ফিল্ম অ্যান্ড টিভি স্কুল অফ দ্য একাডেমি অফ পারফর্মিং আর্টস (FAMU)-তে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। তিনি ছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বিভাগে অধ্যয়নরত প্রথম নারী শিক্ষার্থী ।

১৯৬০এর দশকের শুরু থেকে চেকোস্লোভাকিয়ায় এক ধরনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উদারীকরণের বাতাস বইতে শুরু করে, যা ইতিহাসে ‘চেক নিউ ওয়েভ’ (Czech New Wave) নামে পরিচিত। ভেরা চিতিলোভা ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। মিলোস ফরম্যান, জিরি মেনজেল এবং ইভান পাসারের মতো নির্মাতাদের পাশে তিনি একমাত্র নারী পরিচালক হিসেবে এক স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলেন।

চেক নিউ ওয়েভের চলচ্চিত্রগুলো সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের (Socialist Realism) মিথ্যা বীরত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার সংকীর্ণ গণ্ডি অতিক্রম করে সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের সঙ্কট, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং হাস্যরসের মাধ্যমে সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরত এই আন্দোলনের নির্মাতারা ফরাসি নিউ ওয়েভ এবং ইতালীয় নব্যবাস্তববাদ (Neorealism) দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তাঁদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে এক অনন্য নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেছিলেন। চিতিলোভার ক্ষেত্রে এই আন্দোলনটি ছিল কেবল চলচ্চিত্রের রূপান্তর নয়, বরং এক ধরনের নৈতিক ও বৌদ্ধিক বিপ্লব।

চিতিলোভার স্নাতক পর্যায়ের চলচ্চিত্র ‘সিলিং’ (Strop/Ceiling, 1962) নির্মাণের সময়ই তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর চিত্রনাট্যটি ‘কিচি’ (Kitschy) তকমা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল, কিন্তু চিতিলোভা তাঁর শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অনড় ছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের কাজগুলোতে নারী জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলের বৈপরীত্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

ভেরা চিতিলোভার সিনেমাটোগ্রাফিক স্টাইল বা চিত্রগ্রহণের শৈলী ছিল তৎকালীন সময়ের তুলনায় কয়েক দশক এগিয়ে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে চলচ্চিত্রের ভাষা সাহিত্যিক বা আক্ষরিক হওয়ার পরিবর্তে দৃশ্যমান ও কারিগরিভাবে বৈপ্লবিক হওয়া প্রয়োজন । তাঁর এই দৃষ্টি বাস্তবায়নে চিত্রগ্রাহক জারোস্লাভ কুচেরা (Jarsolav Kučera) এবং পোশাক ও শিল্প নির্দেশক এস্টার ক্রুমবাচোভা (Ester Krumbachova) অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

জারোস্লাভ কুচেরা, যিনি চিতিলোভার স্বামীও ছিলেন, তাঁর চিত্রগ্রহণে এক ধরনের ‘সাইকেডেলিক’ এবং পরীক্ষামূলক আবহ তৈরি করতেন । তাঁরা একত্রে এমন এক শৈলী উদ্ভাবন করেছিলেন যা বর্ণনাধর্মী চলচ্চিত্রের চেয়েও বেশি ছিল অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার প্রকাশ। চিতিলোভার চলচ্চিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

চিতিলোভার চলচ্চিত্রে রঙের ব্যবহার কখনোই কেবল সৌন্দর্যের জন্য ছিল না। বিশেষ করে তাঁর মাস্টারপিস ‘ডেইজিস’ (Sedmikrasky, ১৯৬৬)-এ তিনি অসংখ্য রঙের ফিল্টার ব্যবহার করেছেন । এই ফিল্টারগুলো মেজাজ পরিবর্তন এবং দৃশ্যের প্রতীকী অর্থ বহনে সাহায্য করত। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি নেগেটিভ ফিল্টারের মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে এক অন্য আলোয় উপস্থাপন করতেন ।

রৈখিক কাহিনীর পরিবর্তে চিতিলোভা দ্রুত পরিবর্তনের মাধ্যমে এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল কলাস’ (Visual collage) তৈরি করতেন। এটি দর্শককে কাহিনীতে নিমগ্ন হওয়ার পরিবর্তে বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করত। তাঁর মতে, দর্শক যখন চলচ্চিত্র দেখে খুব বেশি আবেগী হয়ে পড়ে, তখন সে এর অন্তর্নিহিত দর্শন বুঝতে ব্যর্থ হয়।

চিতিলোভা তাঁর চলচ্চিত্রে প্রায়ই বাস্তব জীবনের ফুটেজ এবং কাল্পনিক বা পরাবাস্তব (Surreal) দৃশ্যপট জোড়া দিতেন । যেমন তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সামথিং ডিফারেন্ট’ (O něčem jinem, ১৯৬৩)-এ তিনি একজন প্রকৃত অলিম্পিক জিমন্যাস্ট এবং একজন কাল্পনিক গৃহিণীর জীবনকে সমান্তরালভাবে দেখিয়েছেন। একপাশে ছিল কঠোর পরিশ্রমের প্রামাণ্যচিত্র এবং অন্যপাশে একঘেয়ে ঘরোয়া জীবনের নাটকীয়তা।

ফ্রুট অফ প্যারাডাইস’ (Ovice stromů rajskych jime, 1970) চলচ্চিত্রে আদম এবং ইভএর রূপক কাহিনীর মাধ্যমে তিনি সত্য এবং মিথ্যার লড়াইকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে কুচেরা এবং চিতিলোভা ডাবল এক্সপোজার এবং প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে প্রতিটি ফ্রেম একটি পেইন্টিং বা চিত্রের মতো মনে হয়।

১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ডেইজিস’ (Sedmikrasky) ভেরা চিতিলোভার সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং আন্তর্জাতিকভাবে নন্দিত চলচ্চিত্র । দুই কিশোরী মারির গল্প নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মূলত একটি আঁভগার্দ হাস্যরসাত্মক নাটক । চলচ্চিত্রটি শুরু হয় যুদ্ধের বিমানের ফুটেজ এবং যান্ত্রিক যন্ত্রাংশের শব্দের মাধ্যমে, যা ইঙ্গিত দেয় যে পৃথিবীটি নিজেই একটি বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে।

দুই মারি সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু পুরো পৃথিবীটি পচে গেছে (Spoiled/Bad), তাই তারাও এখন থেকে ‘পচা’ বা খারাপ আচরণ করবে। এই সিদ্ধান্তের পর তারা এক অদ্ভুত ধ্বংসাত্মক খেলায় মেতে ওঠে। তারা বয়স্ক ও বিত্তবান পুরুষদের সাথে ডেটে গিয়ে প্রচুর খাবার খায় এবং শেষে তাদের ট্রেনে তুলে দেয়। চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যটি হলো একটি বিশাল ব্যাঙ্কোয়েট হল বা ভোজসভার দৃশ্য, যেখানে তারা দুই মারি মিলে রাজকীয় সব খাবার নিয়ে এক চূড়ান্ত হুল্লোড়ে মেতে ওঠে এবং পুরো ঘরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ।

এই চলচ্চিত্রটি তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকারের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল বিশেষ করে খাবারে অপচয় দেখানোর কারণে এমপি জারোস্লাভ প্রুজিনেক এটিকে সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতার পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন চিতিলোভা অত্যন্ত সাহসের সাথে এই সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের শেষে তিনি একটি উৎসর্গপত্র যোগ করেন– “এই চলচ্চিত্রটি তাঁদের জন্য উৎসর্গীকৃত যাঁদের বিরক্তির একমাত্র কারণ হলো একটি পদদলিত লেটুস পাতা”। এর মাধ্যমে তিনি আসলে সেইসব আমলাদের বিদ্রূপ করেছিলেন যারা মানুষের স্বাধীনতার চেয়ে তুচ্ছ জিনিসের অপচয় নিয়ে বেশি চিন্তিত । ফলস্বরূপ, ‘ডেইজিস’ নিষিদ্ধ করা হয় এবং চিতিলোভার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ দীর্ঘ সময়ের জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআমি অ্যাটর্নি জেনারেল, রাষ্ট্রের কল্যাণে কথা বলে যাব : রুহুল কুদ্দুস কাজল
পরবর্তী নিবন্ধপালঙ্ক’র সুবর্ণজয়ন্তী