ভেনেজুয়েলায় কথিত মার্কিন সামরিক অভিযান: সার্বভৌমত্ব ও বিশ্বব্যবস্থার সংকট

এস এম ওমর ফারুক | শুক্রবার , ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৫:২২ পূর্বাহ্ণ

আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সমতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার উপর। জাতিসংঘ সনদ-এই কাঠামোর মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু যদি এমন একটি ঘটনা ঘটে যেখানে একটি শক্তিধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আটক করে নিজ দেশে নিয়ে যায় তবে তা শুধু একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন নয়, বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার জন্য এক গভীর সংকেত বহন করে। এই প্রবন্ধে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কথিত অভিযানের ঘটনার আলোকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন, বৈধতার বিতর্ক এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার উপর সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অনাক্রম্যতার মৌলিক নীতির লংঘন হয়েছে কথিত এই অভিযানে। আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মূলনীতি হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সব রাষ্ট্র সমান সার্বভৌম। এর অর্থ হলো, কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

রাষ্ট্র প্রধানের ক্ষেত্রে এই নীতি আরও শক্তিশালীভাবে প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রপ্রধানরা personal immunity ভোগ করেন, অর্থাৎ বিদেশি রাষ্ট্রের বিচারিক বা নির্বাহী ক্ষমতা থেকে তারা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কোনো বিদেশি সেনাবাহিনী দ্বারা রাষ্ট্রপ্রধানকে জোরপূর্বক আটক করা এই অনাক্রম্যতার সরাসরি লঙ্ঘন।

জাতিসংঘ সনদের অধীনে বলপ্রয়োগ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘কোনো রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি দিতে পারবে না।’

ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক অভিযান এই অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। এখানে দুটি বৈধ ব্যতিক্রম থাকতে পারে:

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন, অথবা আত্মরক্ষার অধিকার (Article 51 ) কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানকে আটক করে নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার যুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, যদি না ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ সংঘটিত হয়ে থাকে যার প্রমাণ সাধারণত অনুপস্থিত।

আগ্রাসনের সংজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের দিকে যদি নজর দিই, তাহলে দেখতে পাই ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের Aggression Resolution (৩৩১৪) অনুযায়ী, এক রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ বা সামরিক অভিযানকে আগ্রাসন হিসেবে গণ্য করা হয়।

রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া শুধু আগ্রাসনই নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ধ্বংসের একটি চরম রূপ। এই ধরনের কাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC )-এর এখতিয়ারে পড়ার সম্ভাবনা রাখে যদিও বাস্তবে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে আইনি জবাবদিহিতা প্রায়ই রাজনৈতিক কারণে বাধাগ্রস্ত।

হস্তক্ষেপ নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার প্রবেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের আরেকটি মৌলিক নীতি হলো non-intervention principle । নিকারাগুয়া বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় (ICJ, 1986 ) আন্তর্জাতিক বিচার আদালত স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছে এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্যে সামরিক বা গোপন অভিযান চালাতে পারে না।

রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া কার্যত সরকার পরিবর্তনের (regime change ) একটি চরম রূপ, যা এই নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে কী বলা হয়েছে? যদি কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া জোরপূর্বক আটক করা হয়, তবে তা arbitrary detention হিসেবে গণ্য হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে রাষ্ট্রপ্রধান হলেও ন্যায্য বিচার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (due process) নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ধরনের অভিযান প্রায়ই বেসামরিক নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন-এরও লঙ্ঘন ।

ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থায় এর বৈধতা কতটুকু বিপজ্জনক? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থায় বৈধতা পাবে কি না? আইনগতভাবে উত্তর স্পষ্ট: না, পাবে না।

কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়। যদি শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো জবাবদিহিতা ছাড়াই এ ধরনের কাজ করতে পারে, তবে তা একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। এর ফলাফল হতে পারে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক আইন শক্তির রাজনীতির কাছে পরাজিত হওয়া, পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে অন্যান্য রাষ্ট্রেরও গোপন বা প্রকাশ্য অভিযান বাড়ানো, বিশ্বব্যবস্থার ‘rules-based order ’ থেকে ‘might is right ’ ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি। ভেনেজুয়েলায় কথিত মার্কিন সামরিক অভিযান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইনের একাধিক মৌলিক স্তম্ভ-সার্বভৌমত্ব, বলপ্রয়োগ নিষেধাজ্ঞা, রাষ্ট্রপ্রধানের অনাক্রম্যতা ও হস্তক্ষেপ নিষেধাজ্ঞা সবকিছুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সংকট নয়; বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিক ও আইনগত ভিত্তির উপর আঘাত। যদি এই ধরনের আচরণকে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা আরও অস্থিতিশীল, অনিশ্চিত ও সহিংস হয়ে উঠবে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কায়সার নিলুফার কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজুম্’আর খুতবা
পরবর্তী নিবন্ধমহাকালের বিধান: জীবনের সুতো ও সময়ের স্রোত