ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত না করে তাদের পুনর্বাসন জরুরি

রুনা তাসমিনা | শনিবার , ৭ মার্চ, ২০২৬ at ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

গুলজার টাওয়ারের সামনে নামতেই একজন অল্প বয়সী তরুণী হাত বাড়িয়ে বললো, কয়টা টাকা দেন আপা। ভাত খামু। বললাম, আমি তোমার মতো যুবতী মেয়েকে কখনোই ভিক্ষা দেবো না। ভাত খাওয়ার জন্য কাজ করো। বলে চলে গেলাম আমার কাজে। আমি শুধু একজনের কথা বললাম। শহর জুড়ে এরকম অসংখ্য তরুণী ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে রাখে। কাজ করে যাদের জীবনযাপন করার ক্ষমতা আছে তাদের হাতে ভিক্ষার টাকা আমি কখনো দিই না। বিভিন্নজনের সাথে এব্যাপারে কথা বলে জেনেছি তাঁরাও দেন না। তবুও কেউ না কেউ দেয় বলেই তো এরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাকে রোজগারের সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেয়। আছে শিশু ভিক্ষুক। স্কুলে যাওয়ার বয়সে তারা হাত পেতে ঘুরে বেড়ায় পথে, মার্কেটের সামনে, বাজারে, মেলায়, পার্কে, যে কোনো জনসমাগম স্থলে। এরশাদ সরকারের আমলে সুবিধাবঞ্চিত, অবহেলিত, অসহায়, শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন পথকলি ট্রাস্ট। এই ট্রাস্টের অধীনে বিদ্যালয়ে কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জনকল্যাণমূলক এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। সরকার পতনের পর সেই উদ্যোগের কার্যক্রমও ধীরে ধীরে কমে গিয়ে পরে বন্ধ হয়ে যায়। শেখ হাসিনার সরকারও ‘একটি শিশুও রাস্তায় থাকবে না’ স্লোগান নিয়ে পথশিশু পুনর্বাসন কার্যক্রমের উদ্যোগ নেন। তারপরও পথ থেকে এই শিশুদের তুলে নেয়া সম্ভব হয়নি। তারা সেই ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পথেই রয়ে গেলো। বৃদ্ধ আর পঙ্গু ভিক্ষুক তো আছেই। কিছু কিছু ভিক্ষুকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতো বিকৃত, দেখলে শিউরে উঠতে হয়। এরা বিকলাঙ্গ জন্মগ্রহণ করে? নাকি কোনোভাবে এদের পঙ্গু করে দেয়া হয়, সেই প্রশ্নটিও আসে। একবার সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘লাল জড়ুল’ নামে এক হারিয়ে যাওয়া শিশুর ঘটনা পড়েছিলাম। তার মা বাবা তাকে খুঁজে পায় একটা হাত কাটা অবস্থায়। বাবা চিনতে পারেন নি। মা চিনেছেন তার সন্তানকে। হয়তো কোনো চক্র কাজ করছে এর পেছনে। আমাদের দেশের মতো এতো বীভৎস, বিকলাঙ্গ ভিক্ষুক বিশ্বের আর কোনো দেশে আছে বলে মনে হয় না। একটা ব্যাপার খুব অদ্ভুত! প্রতিবছর রমজান মাস আসলেই হঠাৎ করে ভিক্ষুকদের সংখ্যা যেন দুই তিনগুণ বেড়ে যায়। কোনো এলাকায় যদি অন্যান্য সময় দুচার জন থাকে, রমজান মাসে সেই একই এলাকায় সেই সংখ্যা সাত আট, দশজন হয়ে যায়। শহর, গ্রাম সবখানেই এই দৃশ্য চোখে পড়ে। এরা হয়তো মৌসুমী ভিক্ষুক। শুধু রমজান মাসকে বেছে নেয় উপার্জনের সহজ উপায় হিসেবে। সেসময় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যাকাতসহ দানখয়রাত বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি করেন। সেই সময়টিকে লক্ষ্য করে ভিড় করে এসব মৌসুমী ভিক্ষুকরা। তাদের লক্ষ্যস্থল মসজিদসহ ইবাদতের স্থানগুলো। মসজিদের সিঁড়িতে, পাশে বসে থাকে শিশু থেকে শুরু করে সববয়সী ভিক্ষুক। নামাজ শেষে মানুষ বের হতেই চোখে পড়ে বাড়িয়ে দেয়া হাতের সামনে। যা নামাজীদের জন্য বিব্রতকর। তারপরও কোনো উদ্যোগ নেই। অনেকে হয়তো মনে করেন, অসহায়কে দান করা মহৎ কাজ। কিন্তু এই মহৎ কাজ করতে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করছি না তো! অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে তারা জীবিকা নির্বাহ করবে কীভাবে? আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমের মতো তৈরি হচ্ছে বেওয়ারিশ মানবসেবা কেন্দ্র। কিছু মানবিক মানুষ রাস্তাঘাট থেকে তুলে এনে এসব মানুষদের দায়িত্ব নিচ্ছেন। তাঁদের মতো আরও মানুষ এগিয়ে এলে হয়তো ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে কিছু মানুষ খেয়ে পরে বাঁচার ঠিকানা খুঁজে পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যাদের জন্য আমরা ভাবছি তারা কী চায়? নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমাদের কাছাকাছি দুই তিনজন বৃদ্ধা মহিলা প্রায়ই দেখি ভিক্ষা করতে। তাদের জিগ্যেস করেছিলাম কেন এই বয়সে ভিক্ষা করেন? এখন বৃদ্ধাশ্রম আছে। চাইলে সেখানে থাকতে পারেন। আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো। প্রত্যেকেই বাহানা দেখালেন ঘরে নাতি নাতনি আছে। তাদের জন্য বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া সম্ভব নয়। বুঝলাম এরা নিজের ইচ্ছায় রাস্তায় নেমেছে হাত পাতার জন্য। অসামর্থ্য, পঙ্গুদের জন্য আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে পারি। কিন্তু সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে ভিক্ষা দিয়ে দিন দিন ভিক্ষুক বাড়ানোর পক্ষে আমরা নই। ভেবে দেখুন তো, আপনি যে যুবতী মেয়েটিকে ভিক্ষা দিচ্ছেন সে যদি কোনো বাসাবাড়িতে কাজ, কোনো প্রতিষ্ঠানে ক্লিনারের কাজ, কোনো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে কিংবা মানুষের সাহায্য নিয়ে একটা সেলাই মেশিন নিয়েও বসে, তাহলে কতোটা সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে! যে শিশুটিকে আপনি ভিক্ষা দিচ্ছেন, সে যদি ভিক্ষা করার বদলে স্কুলে যায়, হতে পারে তার অকার্যকর ব্রেন জেগে উঠবে। এমনও হতে পারে ভবিষ্যতে সে সুপ্রতিষ্ঠিত একজন মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। ক্ষুধাএকটি হিংস্র শব্দ। যার ছোবলে মানুষ বাধ্য হয় নিজের অস্তিত্বকে বিসর্জন দেয়। রাস্তার ভিক্ষুককে নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হলো, ওরা পরিস্থিতির কাছে হয় বিক্রি হয়েছে নয় বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমাদের সভ্য সমাজেও আছে ভিক্ষুক। চাহিদার হাত পেতে তারা আমাদের চারপাশে নীরবে ঘুরে ভদ্র, পরিপাটি বেশে। রাস্তার ভিক্ষুকের চেয়ে সেসব ভিক্ষুক সমাজের কাছে ঘৃণ্য। ভিক্ষাবৃত্তি অনাদিকাল থেকে চলে আসা একটি প্রাচীন পেশা। প্রাচীনকালে থেকে আধ্যাত্মিক সাধকগণ আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে ভিক্ষা গ্রহণের সংস্কৃতি থাকলেও, বর্তমানে এটি দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কারণে পেশা হিসেবেও প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। অনেক সমাজ সেবক এখন বৃদ্ধাশ্রম, পুনর্বাসন কেন্দ্র, এতিমখানা নির্মাণ করে দরিদ্র, অবহেলিত, ঘর থেকে নিগৃহীত মানুষকে আশ্রয় দিচ্ছেন। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আমরা রাস্তায় হাত পেতে থাকা মানুষগুলোকে উৎসাহিত করতে পারি সেসব স্থানে সম্মানের সাথে বাঁচতে।

লেখক: গল্পকার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপবিত্র মাহে রমজানে ইতেকাফ
পরবর্তী নিবন্ধবই জ্ঞানের শক্তি বাড়িয়ে দেয়