ভাষা আন্দোলনের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনটি এলো। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ আজ। আজ ‘মাথা নত না করা’র অমর একুশে। মহান শহীদ দিবস। তবে এবার শুধু দিবস পালন নয়, অমর একুশের ৭৪ বছর পূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এবার মহান ভাষা শহীদ এবং ৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন ও ২০২৪–এর স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ যাবতকালে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি স্বনির্ভর নিরাপদ, মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার শপথের দিন।
নিজ মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানানোর বিশেষ অনুপ্রেরণা হয়ে এসেছে ২১ ফেব্রুয়ারি; মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ৭৪ বছর আগে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ করার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বাংলা মায়ের অকুতোভয় সন্তানেরা।
বাঙালি জাতির চিরভাস্বর আত্মত্যাগের স্মৃতিবিজড়িত মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়।
মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস–২০২৬ উপলক্ষ্যে দেয়া এক বাণীতে তিনি বলেন, ‘মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাসহ বিশ্বের সকল ভাষাভাষী মানুষ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজকের এই দিনে, আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সকল শহীদকে, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা।’ একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের এদিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শহীদ হন আবুল বরকত, আবদুস সালাম, রফিকউদ্দিন আহমদ, আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। তাঁদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে রচিত হয় শত বছরের শাসন ও শোষণে জর্জরিত তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুক্তির প্রথম সোপান।
ভাষার জন্য বায়ান্নে ভাই হারানোর শোক আর বর্ণমালার গানে গানে আজ সকালে একুশের প্রভাত ফেরিতে অংশ নেবে বিভিন্ন স্কুল ও সংগঠনের শিক্ষার্থীরা। কবির ভাষায় : প্রভাতফেরি, প্রভাতফেরি/আমায় নেবে সঙ্গে/বাংলা আমার বচন/আমি জন্মেছি এই বঙ্গে…। বাঙালির ভাষা–চেতনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আজ উদযাপিত হবে ইউনেস্কো ঘোষিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার ছাত্র ও যুবসমাজ শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে আসে।
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকে শহীদ হন। তাদের সেই মহান আত্মত্যাগই আজ বিশ্বজুড়ে ভাষাপ্রেম ও মৌলিক অধিকার আদায়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে দিনটি। প্রতি বছরের মতো এবারও দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বায়ান্নর উর্বর বীজ থেকেই ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। ভাষাকেন্দ্রিক জাতিরাষ্ট্র পাওয়া, বাঙালির এর চেয়ে বড় কোনো অর্জন নেই।
আজ শনিবার অমর একুশের ৭৪ বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তাই সমাজের সকল অন্যায় রুখে দিয়ে শহীদদের স্বপ্নের দেশ গড়ার শপথ নেয়ার দিন। আজ সর্বত্রই বাজবে সেই বেদনা সঙ্গীত : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি…। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে শোক। ভাষা শহীদদের স্মরণে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। একই সঙ্গে ওড়ানো হবে কালো পতাকা।
তাইতো বাঙালি জাতির কাছে একুশ শুধু একটি–দিন নয়; একুশ মানে স্মৃতি–রক্ত ফাগুন দিন, একুশ মানে বুকের মাঝে বাংলা রাখার ঋণ। একুশ মানে মাথা নত না করে জাতীয়তাবোধের চেতনায় শির উঁচু করে দাঁড়ানো। শোক ও শ্রদ্ধার মিশেলে তৈরি এক চেতনার নাম একুশ। তাইতো একুশ এলেই বাঙালি জাতি শাণিত করে নিজস্ব চেতনাবোধ। গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের।
গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে একুশের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চট্টগ্রামের সিটি মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের জনগণ পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভাষাশহীদদের প্রতি শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
এদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, এনসিপি, কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে একুশের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বায়ান্নের ভাষা শহীদের বেদী। এ সময় মহান ভাষা আন্দোলনে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ বেদীতে ঢল নামে সর্বসাধরণের।
এই অনন্য ইতিহাসকে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে বাঙালির আত্ম–অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের দিনটি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বেই পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি একদিকে শোক ও বেদনার, অন্যদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল একুশের প্রথম প্রহরে নগরীতে রংতুলি হাতে নিজের ভাষার বর্ণমালার উৎসবে মেতেছেন ছোট–বড় সবাই। কেউ রাস্তায় তুলির আঁচড় দিতে ব্যস্ত, আবার কেউ ব্যস্ত রঙের বিন্যাসের নির্দেশনায়। এভাবে একসময় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা রঙে সড়কজুড়ে ফুটে ওঠে আলপনা।
মহান শহীদ দিবসে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চট্টগ্রামে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, আবৃত্তি সংগঠন বোধনসহ বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়, শিল্পকলা একাডেমি, সিআরবি সাত রাস্তার মোড়, জামালাখান খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে আলপনা এঁকেছেন। এঁকেছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খুদে শিক্ষার্থীসহ নানা পেশার মানুষও।
শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আজ শনিবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হবে বিশেষ ক্রোড়পত্র।










